কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির জাদুতে এখন নিমিষেই তৈরি হচ্ছে আস্ত গান। প্রম্পট লিখে দিলেই সুর, কথা ও কণ্ঠসহ গান তৈরি হওয়ার এই অভিনব বাস্তবতায় বিশ্বজুড়ে সংগীতশিল্পীদের মনে উঁকি দিচ্ছে একটি বড় প্রশ্ন—এআই কি তবে মানুষের সৃজনশীলতা ও শিল্পীর বিকল্প হয়ে উঠবে? এই বহুল আলোচিত বিতর্কে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন হলিউড ও বলিউডের শীর্ষ সংগীত ব্যক্তিত্বরা।
বলিউডের দৃষ্টিভঙ্গি: প্রযুক্তির ভিড়ে আবেগের খোঁজ
বলিউডের শীর্ষস্থানীয় শিল্পীরা প্রযুক্তির সুবিধাকে স্বীকার করলেও মানুষের আবেগের জায়গাটিতে বেশি জোর দিয়েছেন।
সমীর আনজান (গীতিকার): এই বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা এই বর্ষীয়ান গীতিকার মনে করেন, যন্ত্র সুর বাঁধতে পারে, কিন্তু অনুভূতি তৈরি করতে পারে না। বর্তমান প্রজন্মের (জেন-জি) ‘রিল-ফ্রেন্ডলি’ বা বিট-সর্বস্ব গানের সমালোচনা করে তিনি বলেন, দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার দৌড়ে গানের মূল সুর ও আবেগের গভীরতা হারিয়ে যাচ্ছে, যা সংগীতাঙ্গনের জন্য চিন্তার বিষয়।
এ আর রহমান (সংগীত পরিচালক): অস্কারজয়ী এই সুরকার জানান, এআই সাউন্ড ডিজাইন ও প্রোডাকশনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুললেও গানের আসল ‘প্রাণ’ হলো মানুষের অনুভূতি। কোনো মেশিনের পক্ষেই পুরোপুরি মানবিক অনুভূতি অনুকরণ করা সম্ভব নয়।
বিশাল দাদলানি (সংগীত পরিচালক ও গায়ক): তার মতে, প্রযুক্তি সংগীত তৈরির কাজকে অনেক সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু একটি গানকে শ্রোতার হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো করে তোলার ক্ষমতা কেবল মানুষের সৃজনশীলতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে।
হলিউড ও পশ্চিমা বিশ্বের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
পশ্চিমা সংগীতাঙ্গনে এআই নিয়ে স্পষ্ট মতভেদ রয়েছে। কেউ একে সতর্কতার চোখে দেখছেন, আবার কেউ স্বাগত জানিয়েছেন।
হ্যান্স জিমার (কিংবদন্তি সুরকার): তিনি মনে করেন, এআই নতুন আইডিয়া তৈরিতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু একটি গানের পেছনের গল্প ও আবেগের জন্য মানুষের অভিজ্ঞতাই অপরিহার্য। প্রযুক্তি সহায়ক হতে পারে, তবে গানের ‘আত্মা’ থাকে মানুষের কাছেই।
স্টিং (ব্রিটিশ সংগীতশিল্পী): তিনি সতর্ক করে জানিয়েছেন, এআই দিয়ে বানানো গান কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে নিখুঁত হলেও অনেক সময়ই তা একেবারে প্রাণহীন ও আবেগশূন্য হয়ে পড়ে।
গ্রাইমস ও টিম্বাল্যান্ড: কানাডিয়ান শিল্পী গ্রাইমস এআই ব্যবহারের পক্ষে কিছুটা ইতিবাচক। তার মতে এটি একটি চমৎকার ‘সহকারী টুল’, তবে শিল্পীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকাটা জরুরি। অন্যদিকে মার্কিন প্রযোজক টিম্বাল্যান্ড এআইকে ভবিষ্যতের একটি শক্তিশালী প্রোডাকশন হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন, যা বিট বা প্রাথমিক ডেমো তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
প্রযুক্তির বর্তমান দাপট ও বাস্তব উদাহরণ
সুনো এআই (Suno AI) বা ইউডিও (Udio)-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো এখন কেবল টেক্সট কমান্ড বা প্রম্পট পেয়েই সম্পূর্ণ ভোকালসহ গান তৈরি করে দিচ্ছে। একসময় যা কেবল মানুষের স্টুডিও প্রোডাকশনে সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয়।
এর একটি বড় উদাহরণ হলো ২০২৩ সালে ভাইরাল হওয়া ‘হার্ট অন মাই স্লিভ’ (Heart on My Sleeve) গানটি। সম্পূর্ণ এআই ভোকাল ব্যবহার করে তৈরি করা এই গানটি বিভিন্ন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে লাখ লাখ শ্রোতার মনোযোগ কেড়েছিল। যদিও পরবর্তীতে কপিরাইট জটিলতায় সেটি সরিয়ে নেওয়া হয়, তবে এটি এআইয়ের ক্ষমতার একটি বড় প্রমাণ রেখে গেছে।
এআই নিশ্চিতভাবেই মিউজিক প্রোডাকশনের গতি ও ধরনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। তবে হলিউড থেকে বলিউড—সব অঙ্গনের শিল্পীদের মতেই একটি বিষয়ে ঐক্যমত রয়েছে; সংগীতের আবেগ ও অনুভূতির যে বিশাল জগৎ, সেখানে মানবিক সৃজনশীলতা এখনো অজেয় এবং এআইয়ের পক্ষে আপাতত শিল্পীর বিকল্প হয়ে ওঠা সম্ভব নয়।