• মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৩৮ পূর্বাহ্ন
Headline
হরমুজ সংকটে মিত্রদের নীরবতায় কি খাদের কিনারে ন্যাটো? নিরাপত্তাহীনতায় ৬০ লাখ রেমিট্যান্স যোদ্ধা, সরকারি পদক্ষেপে কেবলই ‘পর্যবেক্ষণ’ সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির ৩৬ জনের চূড়ান্ত মনোনয়ন পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে এনে জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা হবে: বগুড়ায় ফ্যামিলি কার্ড বিতরণকালে প্রধানমন্ত্রী বারিশা হকের এক স্ট্যাটাসেই নেটদুনিয়ায় ব্যাপক সাড়া সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় বাতিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট নাহিদের জোড়া আঘাত: মিরপুরে পাওয়ার প্লেতেই কিউইদের চেপে ধরল বাংলাদেশ বগুড়াসহ ৭ জেলায় যুগান্তকারী ‘ই-বেইল বন্ড’ সেবার উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী মেহেরপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে বিএনপি নেতা গুরুতর আহত টাঙ্গাইলে বাস-ট্রাক ভয়াবহ মুখোমুখি সংঘর্ষ: নিহত বাসের দুই কর্মী

নিরাপত্তাহীনতায় ৬০ লাখ রেমিট্যান্স যোদ্ধা, সরকারি পদক্ষেপে কেবলই ‘পর্যবেক্ষণ’

বিশেষ প্রতিবেদক / ১ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬

আটাস ফেব্রুয়ারি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা এক নতুন এবং বিপজ্জনক মোড় নেয়, যখন ইরান ইসরায়েলে লক্ষ্য করে শত শত ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালায়। এই হামলার ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরতো প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশী শ্রমিকের নিরাপত্তা নিয়ে।

সংঘাত শুরুর পর ইরানের প্রতিশোধমূলক মিসাইল এবং ড্রোন হামলায় এখন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সামগ্রিকভাবে ইরানে নিহতের সংখ্যা তেরোশো ছাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশী প্রবাসীদের ক্ষেত্রেও কিছু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, একটি মিসাইল হামলার ধ্বংসাবশেষে তিনজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন, যাদের মধ্যে একজন পাকিস্তানি, একজন নেপালি এবং একজন বাংলাদেশী ছিলেন। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কয়েকটি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইরানের হামলার ঘটনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে দুইজন বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন। যদিও সংখ্যাটি তুলনামূলকভাবে কম, তবুও এটি একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশীদের বড় অংশই নির্মাণ শ্রমিক, পরিচ্ছন্নতা কর্মী বা গৃহকর্মীর মতো নিম্ন আয়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত। যুদ্ধ বা নিরাপত্তা সংকটের সময় এই ধরনের কর্মক্ষেত্র সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।

নিহতদের জন্য কী করছে সরকার?

বাংলাদেশ সরকার এখন পর্যন্ত নিহতদের পরিবারের জন্য আলাদা কোনো ক্ষতিপূরণ বা বিশেষ সহায়তা কর্মসূচির ঘোষণা দেয়নি। তবে সরকার বলছে, তারা সামগ্রিকভাবে প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গাল্ফ অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশীদের নিরাপত্তা সরকার সর্বদা গুরুত্ব দেয়। উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলাদেশীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস নেওয়া হয়েছে।

সরকারি সূত্রে জানা যায়, সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোকে সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য জরুরি হটলাইন চালু করা হয়েছে। ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আটকে পড়া প্রবাসীদের বিষয়েও নজর রাখা হচ্ছে। তবে এসব পদক্ষেপ মূলত কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। নিহতদের পরিবারের জন্য সরাসরি ক্ষতিপূরণ বা দ্রুততর সহয়তার বিষয়ে এখনো কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি:

সরকারি সূত্রে জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশী কাজ করেন। তাদের বড় অংশ কাজ করেন সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান এবং বাহরাইনে। এই শ্রমিকরাই বাংলাদেশের রেমিটেন্স আয়ের প্রধান উৎস। ২০২২-২৩ অর্থবছরের জানুয়ারিতে রেমিটেন্স আসে প্রায় ৩.১৭ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম সর্বোচ্চ মাসিক প্রবাহ। শুধু সৌদি আরব থেকেই বছরে প্রায় ৪.৭ বিলিয়ন ডলার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স আসে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই অর্থ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং আমদানি ব্যয় মেটাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সরকারের অবহেলা এবং উদাসীনতা:

রেমিটেন্স যোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও, প্রবাসীদের নিরাপত্তা এবং কল্যাণের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকটের সময়েও সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং জরুরি হটলাইন চালুর মতো প্রাথমিক ব্যবস্থার বাইরে সরকার কোনো সমন্বিত সহায়তা পরিকল্পনা বা প্রত্যাবাসন কর্মসূচির ঘোষণা দেয়নি। অথচ, ফিলিপাইন, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং ফিলিপাইনের মতো অন্যান্য দেশগুলো তাদের নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

অন্যান্য দেশের পদক্ষেপ:

  • ফিলিপাইন: ফিলিপাইন সরকার মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত তাদের নাগরিকদের জন্য চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে:

    • সংকট সতর্কীকরণ ব্যবস্থা: প্রতিটি দেশের জন্য নির্দিষ্ট সতর্কীকরণ বার্তা জারি করা হয়।

    • উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে প্রত্যাবাসন: উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কর্মরত শ্রমিকদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয় বা নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

    • স্বেচ্ছায় দেশে ফেরা: যেসব শ্রমিক দেশে ফিরতে চান, তাদের জন্য সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সরকার ইতিমধ্যে ১০০০-এর বেশি আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে।

    • জরুরি সহায়তা তহবিল: ফিলিপাইন সংসদ ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসীদের জন্য জরুরি সহায়তা তহবিল অনুমোদন করেছে। রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে।

  • ভারত: ভারতের ডিজিটাল সিস্টেম অনেক উন্নত। তাদের ই-মাইগ্রেট পোর্টালের মাধ্যমে বিদেশে থাকা নাগরিকদের অবস্থান এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করা সহজ। সংকটের সময় ভারতীয় দূতাবাসগুলো সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।

  • পাকিস্তান: পাকিস্তানের ডিজিটাল সিস্টেম ভারতের মতো উন্নত না হলেও, তারা নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সক্রিয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সরকার ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে পাকিস্তানিদের ফিরিয়ে আনার জন্য বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করেছে।

  • শ্রীলঙ্কা: শ্রীলঙ্কা তাদের নাগরিকদের জন্য কেন্দ্রীয় অপারেশন সেন্টার এবং রিয়েল-টাইম ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম তৈরি করেছে। এর ফলে শ্রীলঙ্কান কর্মীদের সঙ্গে তাদের দেশের একটি প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব হয়।

বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ:

রেমিটেন্স দেশের জিডিপির প্রায় ৭ শতাংশের সমান। মধ্যপ্রাচ্যে ঝুঁকির মুখে থাকা ৬০ লাখ প্রবাসীকে নিয়ে সরকারের উদাসীনতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং হটলাইন চালুর মতো প্রাথমিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে সরকারকে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হবে:

  • সমন্বিত সহায়তা পরিকল্পনা: প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি সমন্বিত সহায়তা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এর মধ্যে থাকবে:

    • উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে দ্রুততম সময়ে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা।

    • নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা।

    • খাদ্য, ঔষধ এবং অন্যান্য জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করা।

    • আইনি সহায়তা প্রদান।

  • জরুরি সহায়তা তহবিল: প্রবাসীদের জন্য জরুরি সহায়তা তহবিল গঠন করতে হবে। এই তহবিল থেকে সংকটকালে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।

  • প্রত্যাবাসন কর্মসূচি: যদি সংকট দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে প্রবাসীদের ফিরিয়ে আনার জন্য একটি কার্যকরী প্রত্যাবাসন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।

  • কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার: গাল্ফ অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও জোরদার করতে হবে। বাংলাদেশীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে।

  • ডিজিটাল সিস্টেম উন্নত: প্রবাসীদের অবস্থান এবং নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি উন্নত ডিজিটাল সিস্টেম তৈরি করতে হবে।

প্রবাসীরা বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। তাদের ঝুঁকি এবং বিপদের সময় দেশ তাদের পাশে দাঁড়াবে, এটাই কাম্য। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন সীমিত পর্যায়ে আছে, কিন্তু এটি বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়ার ঝুঁকিও আছে। কাজেই সরকারকে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। অন্যথায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে প্রবাসীদের জন্য মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category