• মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০২ পূর্বাহ্ন
Headline
হরমুজ সংকটে মিত্রদের নীরবতায় কি খাদের কিনারে ন্যাটো? নিরাপত্তাহীনতায় ৬০ লাখ রেমিট্যান্স যোদ্ধা, সরকারি পদক্ষেপে কেবলই ‘পর্যবেক্ষণ’ সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির ৩৬ জনের চূড়ান্ত মনোনয়ন পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে এনে জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা হবে: বগুড়ায় ফ্যামিলি কার্ড বিতরণকালে প্রধানমন্ত্রী বারিশা হকের এক স্ট্যাটাসেই নেটদুনিয়ায় ব্যাপক সাড়া সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় বাতিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট নাহিদের জোড়া আঘাত: মিরপুরে পাওয়ার প্লেতেই কিউইদের চেপে ধরল বাংলাদেশ বগুড়াসহ ৭ জেলায় যুগান্তকারী ‘ই-বেইল বন্ড’ সেবার উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী মেহেরপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে বিএনপি নেতা গুরুতর আহত টাঙ্গাইলে বাস-ট্রাক ভয়াবহ মুখোমুখি সংঘর্ষ: নিহত বাসের দুই কর্মী

হরমুজ সংকটে মিত্রদের নীরবতায় কি খাদের কিনারে ন্যাটো?

Reporter Name / ৩ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬

আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষমতার খেলায় একটি পুরনো প্রবাদ আছে—এক বিচক্ষণ গৃহস্থ তার নিজের আঙিনায় একটি পাহারাদার কুকুর পোষেন। উদ্দেশ্য হলো, সে চোর তাড়াবে, বাড়ি পাহারা দেবে এবং দরকারে শত্রুর দিকে দাঁত বের করে গর্জে উঠবে। কুকুরটিকে গৃহস্থ কেবল বেঁধে রেখেই দায়িত্ব শেষ করেন না; বরং বছরের পর বছর ধরে তাকে সবচেয়ে ভালো খাবার দেন, যত্ন নেন, কখনো কখনো রুপোর থালায় খাবার তুলে দেন। এর ফলে কুকুরটি শুধু হৃষ্টপুষ্টই হয় না, বরং মালিকের ইশারায় লেজ নেড়ে ঠিক সময়ে নিজের শক্তির জানান দেয়। কিন্তু দুনিয়ার নিয়ম বড়ই নিষ্ঠুর। যে কুকুরটি দিনের পর দিন রাত জেগে পাহারা দিত, ভোরের আলো ফুটলে মালিকের পায়ের কাছে বসে থাকত—সেই কুকুর যদি হঠাৎ কোনো গভীর রাতে ঘুমিয়ে পড়ে, চোর এলে ডাকতে ভুলে যায় এবং বিপদের দিনে মালিককে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে, তখন সেই গৃহস্থের মনেও গভীর সন্দেহের জন্ম হয়।

বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে খোদ যুক্তরাষ্ট্র যেন সেই হতাশ গৃহস্থ, যার চোখে তার নিজেরই লালন-পালন করা আট দশক বয়সী সামরিক জোট ‘ন্যাটো’ (NATO) আজ আর আগের মতো কাজে লাগছে না। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে মানুষ যেমন পুরনো আসবাবপত্র উঠোনে ফেলে দেয়, ঠিক তেমনি আজকের মার্কিন প্রশাসন হিসাব কষতে শুরু করেছে—এই দীর্ঘদিনের অকর্মণ্য সঙ্গীকে আর কতদিন টেনে নিয়ে যাওয়া যায়?

ইতিহাসের অদৃশ্য হিসাবের খাতা

প্রায় আট দশক আগে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে একটি সামরিক জোট তৈরি হয়েছিল। ভিত্তি ছিল একটি সাধারণ বিশ্বাস—‘তোমার ওপর আঘাত মানে আমার ওপর আঘাত’। এই জোটের নাম দেওয়া হয় ‘ন্যাটো’ বা নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন। ১৯৪৯ সালের ৪ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে যখন এই চুক্তিতে স্বাক্ষর হয়, তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের লাল ছায়া পশ্চিম ইউরোপের ওপর ধীরে ধীরে নেমে আসছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত ও আতঙ্কিত ইউরোপকে সেদিন যুক্তরাষ্ট্র অভয় দিয়ে বলেছিল—‘ভয় পেয়ো না, আমি আছি।’

কিন্তু ইতিহাসের প্রতিটি ‘আমি আছি’ বাক্যের পেছনে একটি অদৃশ্য হিসাবের খাতা থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ছিল না। ইউরোপকে সামরিক সুরক্ষা দেওয়া যেমন তাদের একটি উদ্দেশ্য ছিল, তেমনি সমাজতন্ত্রের বিস্তার ঠেকিয়ে বিশ্বে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাও ছিল তাদের সমান গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। শুরুতে মাত্র ১২টি দেশ নিয়ে যাত্রা করা এই জোট সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কলেবরে বেড়ে আজ ৩২টি দেশের বিশাল সংগঠনে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ সুইডেনের মতো শতবর্ষী নিরপেক্ষ দেশও এই জোটে যোগ দিয়েছে। কিন্তু জোটের আকার যত বেড়েছে, খরচের বোঝাও তত বেড়েছে। আর এই বিশাল ক্লাবের সবচেয়ে বড় বিলটি যদি কেবল একজন সদস্যকেই মেটাতে হয়, আর বাকিরা শুধু সুবিধা ভোগ করে, তবে একদিন না একদিন ঝগড়া বাঁধবেই। ঠিক সেই জায়গাতেই ইতিহাসের মঞ্চে হাজির হয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

‘কাগুজে বাঘ’ এবং ট্রাম্পের সন্দেহ

২০১৭ সালে ক্ষমতায় আসার আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছিলেন যে, ন্যাটো একটি ‘সেকেলে’ (Obsolete) জোট। তার প্রধান অভিযোগ ছিল, ইউরোপ নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ ব্যয় করে না; তারা যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের টাকায় নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে চলেছে। ট্রাম্পের ভাষায়, ন্যাটো ধীরে ধীরে একটি ‘কাগুজে বাঘে’ পরিণত হয়েছে।

এরপর সময় গড়িয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের চাপে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যয় কিছুটা বাড়ালেও ট্রাম্পের সন্দেহ ও ক্ষোভ কমেনি। তিনি বারবার জোরালো কণ্ঠে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এই জোটের সিংহভাগ টাকার জোগান দেয়, তবে যেকোনো বৈশ্বিক সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকেই সবার আগে দেখতে হবে। এখানে ইতিহাস বা ন্যাটোর আদি চুক্তির চেয়েও ট্রাম্পের কাছে অর্থের হিসাব ও আনুগত্যটাই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।

হরমুজ প্রণালির সংকট: বন্ধুত্বের চরম পরীক্ষা

কিন্তু ন্যাটোর আসল ফাটলটি দৃশ্যমান হয় মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংকটে। ২০২৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যে নতুন সংঘাতের সূচনা হয়, তা পুরো বিশ্বকে এক গভীর খাদের কিনারে দাঁড় করিয়ে দেয়। এই যুদ্ধ ও সামরিক আগ্রাসনের সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ প্রায় বন্ধ করে দেয়।

হরমুজ প্রণালি কেবল একটি সামুদ্রিক পথ নয়; এটি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান ধমনী। এই পথ বন্ধ হওয়ার অর্থ হলো পুরো বিশ্বের অর্থনীতিতে ধস নামা। ঠিক এই সংকটময় মুহূর্তটিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যা করলেন, তা ন্যাটোর মিত্রদের জন্য এক চরম পরীক্ষার মুহূর্ত হয়ে দাঁড়াল। তিনি সরাসরি ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বললেন—‘যুদ্ধজাহাজ পাঠাও, আমাদের পাশে দাঁড়াও এবং বৈশ্বিক জ্বালানি পথ খোলা রাখতে সাহায্য করো।’

কিন্তু আটলান্টিকের ওপার থেকে যে উত্তরটি এল, তা ওয়াশিংটনের জন্য ছিল চরম হতাশাজনক। ইউরোপ এই আহ্বানে সম্পূর্ণ নীরবতা পালন করল। ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য স্পেন, ইতালি এবং ফ্রান্স সরাসরি জানিয়ে দিল—তাদের সামরিক ঘাঁটি এই যুদ্ধের জন্য ব্যবহার করা যাবে না। কেউ কোনো যুদ্ধজাহাজ পাঠাল না, কেউ ন্যূনতম সামরিক সহায়তাও দিল না।

বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে এক অদ্ভুত ও নজিরবিহীন দৃশ্য তৈরি হলো। যে জোটের সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র দশকের পর দশক ধরে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার অর্থ ঢেলেছে, সেই জোট ঠিক যুদ্ধের সময় মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল—‘এই যুদ্ধ আমাদের নয়।’

আইনের বই বনাম মনস্তাত্ত্বিক ফাটল

বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক আইনের দিক থেকে ইউরোপীয় দেশগুলো হয়তো ভুল বলেনি। ন্যাটোর ‘আর্টিকেল ৫’ অনুযায়ী, এই জোটের পারস্পরিক সুরক্ষার বিষয়টি মূলত ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মধ্যপ্রাচ্য এই সীমানার বাইরে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতি কখনো কেবল আইনের শুষ্ক বই পড়ে চলে না। রাজনীতি চলে অনুভূতি, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর ভিত্তি করে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মার্কিন প্রশাসনের কাছে ইউরোপের এই আইনি অজুহাত ছিল সরাসরি ‘বিশ্বাসঘাতকতা’। ট্রাম্প প্রকাশ্যে আক্ষেপ করে বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধে যখন ইউরোপের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্র বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ও অর্থ নিয়ে ইউরোপের পাশে দাঁড়িয়েছে। অথচ আমেরিকার ডাকে আজ ইউরোপ সাড়া দিচ্ছে না!

এই একটি কথাই ন্যাটোর বর্তমান অস্তিত্ব সংকটের মূল কারণ। ন্যাটো আসলে যতটা সামরিক জোট, তার চেয়েও অনেক বেশি মনস্তাত্ত্বিক জোট। সবাই বিশ্বাস করে যে এই জোটে আমেরিকা আছে, তাই জোটটি শক্তিশালী। কিন্তু যদি আমেরিকাই তার মিত্রদের সন্দেহ করতে শুরু করে, তখন পুরো জোটের কাঠামোই তাসের ঘরের মতো কেঁপে ওঠে।

ইউক্রেন যুদ্ধের সাময়িক ঐক্যের আড়ালে গভীর বিভক্তি

এর আগেও ন্যাটোর ভেতরে সংকট এসেছিল। ডেনমার্কসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ সামরিক বাহিনী পাঠানোর বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছিল। ন্যাটো ভেতর থেকেই বিভক্ত হয়ে পড়ছিল। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সাময়িকভাবে ন্যাটোকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। রুশ আতঙ্কে সদস্য দেশগুলো তাদের জিডিপির ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

কিন্তু ট্রাম্পের প্রশ্ন হলো—শুধু অর্থ বাড়ালেই কি বিশ্বাস বাড়ে? তার চোখে এর উত্তর হলো, ‘না’। কারণ, তার দৃষ্টিতে ন্যাটো ইউরোপের স্বার্থ রক্ষায় যত দ্রুত সাড়া দেয়, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় ততটাই নিশ্চল হয়ে থাকে।

ছাতাহীন ইউরোপের ভবিষ্যৎ এবং একটি জোটের মৃত্যু

আইনগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই রাতারাতি ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে না। এর জন্য মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন লাগবে, যা এক জটিল আইনি প্রক্রিয়া। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাস্তবতা আইনের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। আমেরিকা যদি আনুষ্ঠানিকভাবে ন্যাটো থেকে না বেরিয়েও তাদের সামরিক অঙ্গীকার কমিয়ে দেয়, অর্থায়ন বন্ধ করে দেয় এবং নেতৃত্ব দেওয়া থেকে সরে দাঁড়ায়, তবে ন্যাটোর আর কোনো অস্তিত্বই থাকবে না।

সোজা কথায়, ন্যাটো মানেই হলো আমেরিকার সামরিক ছাতা। সেই ছাতা সরিয়ে নিলে তুমুল বৃষ্টির মধ্যে ইউরোপকে একাই দাঁড়াতে হবে। এখানেই ইউরোপের সবচেয়ে বড় ভয়। তারা বুঝতে পারছে যে, আমেরিকার ধৈর্য আজ শেষ সীমায় এসে পৌঁছেছে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বকে এই বার্তাই দিতে চাইছে যে—বন্ধুত্ব কেবল একমুখী হলে তাকে আর জোট বলা যায় না, তা শুধুই একটি বোঝা।

আজ ন্যাটো এক অদ্ভুত ও বিপজ্জনক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। এই জোটের বাইরে শত্রুর অভাব নেই, কিন্তু তার চেয়েও বড় শঙ্কার বিষয় হলো—জোটের ভেতরে আজ বিশ্বাসীর চেয়ে সন্দেহবাদীর সংখ্যাই বেশি। ইতিহাসে বহু বড় বড় সাম্রাজ্য ও সামরিক জোট কখনোই বাইরের শত্রুর আঘাতে ভাঙে নি, বরং ভেঙেছে ভেতরের অবিশ্বাসে।

যুক্তরাষ্ট্র যদি আজ সত্যি সত্যিই বিশ্বাস করে যে তার দুর্দিনে মিত্ররা সাড়া দেয় না, তবে ‘ন্যাটো’ নামটা হয়তো মানচিত্রে আরও কিছুদিন টিকে থাকবে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় একদিন ঠিকই লেখা হবে—ন্যাটো কোনো শত্রুর হাতে ভাঙেনি; ন্যাটো ভেঙেছিল ঠিক সেই দিন, যেদিন চরম বিপদের মুহূর্তে তাদের সবচেয়ে বড় মিত্রের ডাকে অন্য মিত্ররা নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category