যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হতে বাকি আর মাত্র ৪৮ ঘণ্টা। ঘড়ির কাঁটা যত এগোচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে স্নায়ুচাপ ততই তীব্র হচ্ছে। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার জন্য পাকিস্তানে প্রতিনিধি দল পাঠানোর কথা বলছেন, অন্যদিকে সুর চড়িয়ে ইরানকে প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু ধ্বংস করে দেওয়ার প্রকাশ্য হুমকি দিচ্ছেন।
তবে এই দ্বিমুখী নীতির বিপরীতে ইরানও তাদের অনড় অবস্থানের কথা স্পষ্ট করে দিয়েছে। তেহরান সরাসরি জানিয়ে দিয়েছে, যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের সমুদ্রবন্দরগুলো থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার না করা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তারা দ্বিতীয় দফার কোনো সংলাপে অংশ নেবে না। এমন এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে পারমাণবিক কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের মরিয়া কূটনৈতিক তৎপরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও কৌতূহলোদ্দীপক করে তুলেছে।
যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ আক্রমণাত্মক এবং দ্বিমুখী কূটনীতির আশ্রয় নিয়েছেন। গত রোববার রাতে তিনি ঘোষণা করেন, ইরানের সঙ্গে দ্বিতীয় দফার চুক্তির জন্য সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে পৌঁছাবে।
কিন্তু এই কূটনৈতিক বার্তার রেশ কাটতে না কাটতেই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। ট্রাম্প লেখেন, “আর কোনো ভদ্রতা নয়। তারা যদি একটি যুক্তিসংগত চুক্তিতে না আসে, তবে আমরা তাদের প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু ধ্বংস করে দেব।” মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই হুমকির সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়কে সতর্ক করে বলেছেন, “ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই এখনও শেষ হয়নি। যেকোনো মুহূর্তে সম্পূর্ণ নতুন ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।” বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর এই যুগপৎ হুমকি মূলত আলোচনার টেবিলে বসার আগে তেহরানকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল করার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল।
যুক্তরাষ্ট্রের এই আলোচনার দাবিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। দেশটির সরকারি বার্তা সংস্থা আইআরএনএ (IRNA) জানিয়েছে, দ্বিতীয় দফার সংলাপে অংশ নেওয়ার বিষয়ে তেহরান এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সম্মতি দেয়নি। মার্কিন প্রশাসনের এই দাবিকে তারা স্রেফ ‘মিডিয়া গেম’ বা গণমাধ্যম নিয়ে খেলা বলে আখ্যায়িত করেছে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ বার্তা সংস্থা তাসনিম আরও একধাপ এগিয়ে স্পষ্ট শর্ত জুড়ে দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের ‘অতিরিক্ত দাবি, প্রতিনিয়ত অবস্থান পরিবর্তন এবং বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ’ সরাসরি যুদ্ধবিরতির চরম লঙ্ঘন। যতক্ষণ পর্যন্ত ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই নৌ অবরোধ বহাল থাকবে, ততক্ষণ তেহরান ইসলামাবাদে কোনো প্রতিনিধি দল পাঠাবে না।
এর আগে, গত ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে টানা ২১ ঘণ্টার এক ম্যারাথন সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু সেই দীর্ঘ আলোচনা কোনো ইতিবাচক সিদ্ধান্ত ছাড়াই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
প্রথম দফার সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে ওয়াশিংটন দাবি করেছিল, তেহরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে রাজি হয়নি। এই দাবির কড়া জবাব দিয়েছেন ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। গতকাল তিনি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেছেন, “ট্রাম্প আসলে কে যে তিনি ইরানের স্বাধীন পারমাণবিক অধিকার কেড়ে নেবেন?”
মূলত দুটি প্রধান ইস্যুতে আলোচনা আটকে আছে:
পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ: যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান সম্পূর্ণভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করুক।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ: বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান এই নৌপথের ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যা মানতে নারাজ ইরান।
সর্বশেষ সংলাপের অন্যতম শীর্ষ ইরানি আলোচক এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ গত শনিবার রাতে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, “একটি চূড়ান্ত ও ফলপ্রসূ চুক্তির জন্য উভয় পক্ষের মধ্যে এখনো যোজন যোজন দূরত্ব রয়ে গেছে।”
গত শুক্রবার ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি চাঞ্চল্যকর দাবি করে বলেছিলেন, ইরান তাদের মজুত করা প্রায় ৪৪০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে রাজি হয়েছে।
কিন্তু ট্রাম্পের এই দাবিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে কোথাও স্থানান্তর করা হবে না এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তরের মতো কোনো অদ্ভুত বিষয় কখনো আলোচনার টেবিলেই ওঠেনি।
দ্বিতীয় দফার এই সম্ভাব্য সংলাপে মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব কে দেবেন, তা নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই চরম বিভ্রান্তি দেখা গেছে।
ট্রাম্পের বক্তব্য: এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, চরম নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবার পাকিস্তানে যাচ্ছেন না।
হোয়াইট হাউসের তথ্য: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হোয়াইট হাউসের এক শীর্ষ কর্মকর্তা ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন, জেডি ভ্যান্সই এই প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন। তার সঙ্গে বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারও অংশ নেবেন, যারা প্রথম দফার সংলাপেও উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন দূত মাইক ওয়াল্টজ এবং জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইটও ভ্যান্সের পাকিস্তানে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে যুদ্ধ এড়াতে এবং উভয় পক্ষকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে পাকিস্তান। গতকাল রাতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে প্রায় ৪৫ মিনিট দীর্ঘ ফোনালাপে অংশ নেন। এ সময় তিনি আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন এবং সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্কের সঙ্গে ইসলামাবাদের নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগের বিষয়টিও তুলে ধরেন।
এদিকে, সম্ভাব্য এই মেগা সংলাপকে কেন্দ্র করে ইসলামাবাদে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পুরো শহর এবং পার্শ্ববর্তী রাওয়ালপিন্ডিতে রাস্তা বন্ধ করে যান চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। রাজধানীর সবচেয়ে সুরক্ষিত দুই হোটেল ‘ম্যারিয়ট’ এবং ‘সেরেনা’-এর আশপাশে ভারী অস্ত্রে সজ্জিত সশস্ত্র রক্ষী এবং অসংখ্য চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।
আলজাজিরার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও বিশ্লেষক তৌহিদ আসাদি এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত নাজুক বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, আলোচনার ঠিক আগে ইরানের পক্ষ থেকে অত্যন্ত সুকৌশলে ইতিবাচক ও নেতিবাচক—উভয় ধরনের বার্তাই দেওয়া হচ্ছে।
একদিকে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান ট্রাম্পের কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে যুক্তরাষ্ট্রের ইগোতে আঘাত করছেন, অন্যদিকে তেহরান এ-ও বার্তা দিচ্ছে যে তারা কোনো সর্বাত্মক যুদ্ধ চায় না। আসাদির মতে, এই ইচ্ছাকৃত অনিশ্চয়তা ও ধোঁয়াশাকে তেহরান মূলত দরকষাকষির একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে, যাতে চুক্তির টেবিলে তারা নিজেদের শর্তগুলো আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারে।
আগামী ৪৮ ঘণ্টা মধ্যপ্রাচ্য তথা পুরো বিশ্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্পের ‘ধ্বংসের হুমকি’ এবং ইরানের ‘নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের শর্ত’—এই দুই বিপরীতমুখী অবস্থানের মাঝে দাঁড়িয়ে ইসলামাবাদ শেষ পর্যন্ত কোনো জাদুকরি সমাধান বের করতে পারে কি না, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে গোটা বিশ্ব।