• সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০১:২৯ অপরাহ্ন
Headline
বারিশা হকের এক স্ট্যাটাসেই নেটদুনিয়ায় ব্যাপক সাড়া সুপ্রিম কোর্টের স্বতন্ত্র সচিবালয় বাতিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট নাহিদের জোড়া আঘাত: মিরপুরে পাওয়ার প্লেতেই কিউইদের চেপে ধরল বাংলাদেশ বগুড়াসহ ৭ জেলায় যুগান্তকারী ‘ই-বেইল বন্ড’ সেবার উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী মেহেরপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে বিএনপি নেতা গুরুতর আহত টাঙ্গাইলে বাস-ট্রাক ভয়াবহ মুখোমুখি সংঘর্ষ: নিহত বাসের দুই কর্মী উন্নয়নের নতুন স্বপ্ন নিয়ে নিজ জেলা বগুড়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বন্ধ টিকাদান: কুকুরের কামড়ে জলাতঙ্কের ফাঁদে রাজধানীবাসী যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি: নেতানিয়াহু যিশুর মূর্তি ভাঙ্গলেন ইসরাইলি সেনারা (ভিডিও)

যিশুর মূর্তি ভাঙ্গলেন ইসরাইলি সেনারা (ভিডিও)

Reporter Name / ৩ Time View
Update : সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬
যিশুর মূর্তি ভেঙে ফেলার ছবিটি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত কেবল আর সীমান্ত বা সামরিক ঘাঁটির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন রূপ নিয়েছে চরম ধর্মীয় অবমাননা ও মনস্তাত্ত্বিক আগ্রাসনে। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞের পর এবার লেবাননের মাটিতে ইসরাইলি বাহিনীর চরম ধৃষ্টতার একটি নতুন চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচিত হয়েছে। দক্ষিণ লেবাননের একটি প্রাচীন খ্রিস্টান অধ্যুষিত গ্রামে ঢুকে স্বয়ং যিশু খ্রিস্টের একটি মূর্তিতে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে তা ভেঙে ফেলছেন এক ইসরাইলি সেনা—এমন একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে।

ছবিটি প্রকাশ্যে আসার পর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী বাধ্য হয়ে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং এটি ইসরাইলি বাহিনীর ভেতরে প্রোথিত চরম উগ্রবাদ ও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার একটি নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

দেবেল গ্রাম: যেখানে শান্তির প্রতীকে আঘাত

স্থানীয় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ এবং সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পবিত্র মূর্তি ভাঙচুরের এই ন্যাক্কাজনক ঘটনাটি ঘটেছে দক্ষিণ লেবাননের দেবেল (Debel) নামক একটি গ্রামে। এই গ্রামটি মূলত ম্যারোনাইট (Maronite) খ্রিস্টান অধ্যুষিত একটি প্রাচীন ও শান্তিপূর্ণ জনপদ। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে এটি লেবাননের আইন এবেল থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এবং ইসরাইল-লেবানন সীমান্তবর্তী এলাকা শতুলা থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

যুদ্ধকবলিত এই অঞ্চলে ম্যারোনাইট খ্রিস্টানরা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সম্প্রীতি বজায় রেখে বসবাস করে আসছেন। তাদের আরাধনার স্থানে ঢুকে যিশু খ্রিস্টের মূর্তির মতো একটি পবিত্র প্রতীকে ইসরাইলি সেনার এমন পৈশাচিক হাতুড়ির ঘা কেবল পাথর বা কাঠকেই ভাঙেনি, বরং আঘাত করেছে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীর বিশ্বাস ও আবেগের ওপর।

আইডিএফের দায় স্বীকার ও ‘তদন্তের’ আশ্বাস

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ার পর এবং বিশ্বব্যাপী তীব্র সমালোচনা শুরু হলে, আজ সোমবার (২০ এপ্রিল) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ওই ছবির সত্যতা নিশ্চিত করে।

বিবৃতিতে আইডিএফের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ঘটনাটি তাদের নজরে এসেছে এবং এটি তাদের সামরিক নীতিমালার পরিপন্থি। আইডিএফ জানায়, এই ন্যাক্কাজনক ঘটনার বিস্তারিত জানতে ইতোমধ্যে একটি সামরিক অনুসন্ধান ও তদন্ত শুরু করা হয়েছে। তদন্ত শেষে জড়িত সেনার বিরুদ্ধে উপযুক্ত ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তারা আশ্বস্ত করেছে। তবে ফিলিস্তিন ও লেবাননের মানবাধিকার কর্মীরা আইডিএফের এই তদন্তের আশ্বাসকে স্রেফ ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ বা লোকদেখানো জনসংযোগ কৌশল হিসেবেই দেখছেন।

রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও কটাক্ষ

যিশু খ্রিস্টের মূর্তি ভাঙার এই ছবি ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে নেসেটের (ইসরাইলি পার্লামেন্ট) আরব ও ফিলিস্তিনি সদস্যরা ইসরাইলি রাষ্ট্রের কাঠামোগত বর্ণবাদ ও উগ্রতার কড়া সমালোচনা করেছেন।

নেসেট সদস্য আয়মান ওদেহ এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি তীক্ষ্ণ ও শ্লেষাত্মক পোস্ট দিয়েছেন। ইসরাইলি বাহিনীর চিরাচরিত ‘আত্মরক্ষার’ অজুহাতকে কটাক্ষ করে তিনি লিখেছেন, “এখন হয়তো ইসরাইলি পুলিশের মুখপাত্র গণমাধ্যমের সামনে এসে নির্লজ্জের মতো বলবে যে, ওই সেনাটি যিশু খ্রিস্টের দিক থেকে নিজের জীবনের ওপর হুমকি অনুভব করেছিল, তাই আত্মরক্ষার্থে সে মূর্তির ওপর হাতুড়ি চালিয়েছে!”

নেসেটের আরেক প্রভাবশালী ফিলিস্তিনি সদস্য আহমদ তিবি ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ ও আবেগঘন স্ট্যাটাসে ইসরাইলি বাহিনীর লাগামহীন বর্বরতার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে লেখেন, “যে সামরিক বাহিনী গাজা উপত্যকায় দিনের পর দিন পবিত্র মসজিদ ও প্রাচীন গির্জাগুলো বোমা মেরে উড়িয়ে দেয় এবং জেরুজালেমের রাস্তায় হেঁটে চলা নিরীহ খ্রিস্টান ধর্মযাজকদের গায়ে থুতু নিক্ষেপ করেও বিনা শাস্তিতে পার পেয়ে যায়, তারা যে লেবাননে ঢুকে যিশু খ্রিস্টের মূর্তি ধ্বংস করতে এবং সেই ছবি দম্ভের সঙ্গে প্রকাশ করতে ভয় পাবে না, এটাই তো স্বাভাবিক।” তার এই মন্তব্য মূলত প্রমাণ করে যে, ইসরাইলি বাহিনীর এই আচরণ কোনো ভুল নয়, বরং দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতির ফসল।

কাঠগড়ায় ইসরাইল: খোদ জেরুজালেমেই নিরাপদ নন খ্রিস্টানরা

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘মিডল ইস্ট আই’-এর এক গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরও এক ভয়াবহ চিত্র। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু লেবানন বা গাজাতেই নয়, খোদ ইসরাইল এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরের খ্রিস্টানরা প্রতিনিয়ত ক্রমবর্ধমান ইসরাইলি হামলার মুখে পড়ছেন। ইসরাইলে বসবাসরত খ্রিস্টান সম্প্রদায় এবং ধর্মযাজকদের দৈনন্দিন জীবন এখন চরম হয়রানি ও শঙ্কার মধ্যে কাটছে।

জেরুজালেমের পবিত্র স্থানগুলোতে দায়িত্বরত একাধিক খ্রিস্টান ধর্মযাজক অভিযোগ করেছেন যে, রাস্তায় চলাচলের সময় উগ্র ইহুদিরা তাদের ওপর থুতু নিক্ষেপ করে এবং অনেক সময় শারীরিক হামলাও চালায়। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাচীন গির্জা, খ্রিস্টানদের কবরস্থান এবং অন্যান্য ধর্মীয় প্রতীক ও স্থাপনাগুলো নিয়মিত ভাঙচুর ও অপবিত্র করার শিকার হচ্ছে।

উগ্রবাদের বিস্তার ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এসব হামলার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে ইসরাইলের অতি-অর্থডক্স ইহুদি গোষ্ঠী, কট্টর ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী দল এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বসতি স্থাপনকারীরা। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সিসিটিভি ফুটেজ বা প্রত্যক্ষদর্শী থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ ঘটনায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

খ্রিস্টান সম্প্রদায় এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে এসব পরিস্থিতিতে ইসরাইলি পুলিশের চরম নিষ্ক্রিয়তা ও পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। খোদ ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গাভিরের মতো উগ্র ডানপন্থি নেতারা যখন এই অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের প্রকাশ্য সমর্থন জোগান, তখন সাধারণ খ্রিস্টান বা ফিলিস্তিনিদের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়া একপ্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

লেবাননের দেবেল গ্রামে যিশু খ্রিস্টের মূর্তি ভাঙার এই দৃশ্য কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মের অবমাননা নয়, এটি গোটা মানবতার জন্য একটি অশনিসংকেত। গাজায় হাজার হাজার নিরীহ শিশু ও নারী হত্যার পর, এখন প্রতিবেশী দেশের ধর্মীয় উপাসনালয় ও প্রতীকের ওপর এই নির্লজ্জ হামলা প্রমাণ করে যে মধ্যপ্রাচ্যে উগ্রবাদের শেকড় কতটা গভীরে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও পশ্চিমা বিশ্ব, যারা বরাবরই মানবাধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলে, তারা যদি ইসরাইলের এই কাঠামোগত অসহিষ্ণুতা ও স্পর্ধার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে ব্যর্থ হয়, তবে এই অঞ্চলে শান্তি ও ধর্মীয় সম্প্রীতি চিরতরে একটি অলীক স্বপ্নে পরিণত হবে। আইডিএফের প্রতিশ্রুত ‘তদন্ত’ আসলেই কোনো বিচার নিশ্চিত করে নাকি অতীতের মতো ফাইলের স্তূপে হারিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category