যুক্তরাষ্ট্রের বুকে ফের বন্দুক হামলার ভয়াল থাবা। এবার দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্য লুইজিয়ানায় এক মর্মান্তিক ও নৃশংস বন্দুক হামলায় প্রাণ হারিয়েছে আটটি নিষ্পাপ শিশু। স্থানীয় পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, ভয়াবহ এই হত্যাযজ্ঞের নেপথ্যে রয়েছে পারিবারিক কলহ বা অস্থিরতা।
স্থানীয় সময় রোববার (১৯ এপ্রিল) ভোরে লুইজিয়ানার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর শ্রীভপোর্টে (Shreveport) এই রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটে। ভয়াবহ এই হামলায় গোটা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে নতুন করে শোক ও ক্ষোভের ছায়া নেমে এসেছে।
হত্যাযজ্ঞের বীভৎস চিত্র ও নিহতদের পরিচয়
শ্রীভপোর্ট পুলিশের কর্পোরাল ক্রিস বোর্ডেলন এক সংবাদ সম্মেলনে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত আট শিশুর বয়স ১ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, নিহত শিশুদের মধ্যে কয়েকজন ওই ঘাতকের নিজেরই আত্মীয়স্বজন।
এই হামলায় আরও দুই ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও, তাৎক্ষণিকভাবে তাদের শারীরিক অবস্থা বা পরিচয় সম্পর্কে পুলিশের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
একাধিক বাড়ি জুড়ে বিস্তৃত ঘটনাস্থল
পুলিশ জানিয়েছে, এই হত্যাযজ্ঞ কোনো নির্দিষ্ট একটি ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। কর্পোরাল ক্রিস বোর্ডেলন ঘটনাস্থলের ভয়াবহতা বর্ণনা করে বলেন, “অপরাধের এই দৃশ্যপটটি বেশ বিস্তৃত, যা মূলত দুটি বাড়ি জুড়ে ছড়িয়ে আছে।” তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, তদন্তকারী কর্মকর্তারা সন্দেহভাজন তৃতীয় আরেকটি বাড়িতেও তল্লাশি চালাচ্ছেন, যা এই ধারাবাহিক হত্যাযজ্ঞের অংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশের বিশ্বাস, এই নারকীয় তাণ্ডবে বন্দুকধারী সম্পূর্ণ একাই অংশ নিয়েছিল এবং প্রতিটি স্থানে সে একাই গুলি চালিয়েছে।
গাড়ি ছিনতাই, পুলিশের ধাওয়া এবং ঘাতকের মৃত্যু
আটটি শিশুকে হত্যার পর বন্দুকধারী ঘটনাস্থল থেকে পালানোর চেষ্টা করে। পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত ওই ব্যক্তি একটি গাড়ি ছিনতাই করে দ্রুতগতিতে পালিয়ে যাওয়ার সময় টহল পুলিশের নজরে পড়ে। এরপর পুলিশ তাকে ধাওয়া করে। পালানোর একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকধারীর সংঘর্ষ হয় এবং পুলিশের গুলিতে ঘটনাস্থলেই ওই ঘাতকের মৃত্যু হয়। তবে তদন্তের স্বার্থে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ওই হামলাকারীর নাম বা বিস্তারিত পরিচয় প্রকাশ করেনি।
শোকাহত নগর প্রশাসন
রোববারের এই শান্ত সকালে এমন বীভৎস হত্যাকাণ্ডের খবরে পুরো শ্রীভপোর্ট শহর স্তব্ধ হয়ে গেছে। শহরের মেয়র টম আর্সেনো সংবাদ সম্মেলনে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করে বলেন, “শ্রীভপোর্টের জন্য এটি একটি অত্যন্ত ভয়াবহ ও বিষাদময় সকাল। আমরা সবাই এই নির্মম ঘটনার ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য গভীরভাবে শোকাহত।”
যুক্তরাষ্ট্রের বন্দুক সংস্কৃতির রূঢ় বাস্তবতা
এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বা ‘গান কন্ট্রোল’ নিয়ে চলমান দীর্ঘ বিতর্ককে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। দেশটিতে নাগরিকদের জন্য আগ্নেয়াস্ত্র কেনা ও বহন করা অত্যন্ত সহজলভ্য হওয়ায়, প্রায়ই এমন নির্বিচার গুলি বা ‘মাস শুটিং’-এর ঘটনা ঘটে। পারিবারিক কলহ, মানসিক অবসাদ কিংবা ব্যক্তিগত আক্রোশের জেরে হাতের কাছে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহারে দেশটিতে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারায়, যার একটি বড় অংশই হলো শিশু ও কিশোর। শ্রীভপোর্টের এই রোমহর্ষক ঘটনা সেই অন্তহীন মৃত্যুর মিছিলেই নতুন করে যুক্ত হলো আটটি শিশুর নাম।