আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় অর্জিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে না হতেই মধ্যপ্রাচ্যে ফের বাজতে শুরু করেছে যুদ্ধের দামামা। একদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দম্ভভরে ঘোষণা করেছেন যে ইরানের সঙ্গে তাদের যুদ্ধ এখনো ‘শেষ হয়নি’, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন চুক্তি সই না করলে ইরানের প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতু গুঁড়িয়ে দেওয়ার। দুই পরাশক্তির এমন আগ্রাসী ও সমন্বিত হুমকির মুখে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনা কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
নেতানিয়াহুর হুঙ্কার: ‘যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি’
রোববার (১৯ এপ্রিল) জেরুজালেমে সফররত আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সেখানেই তিনি ইরান ইস্যুতে ইসরাইলের ভবিষ্যৎ সামরিক ও রাজনৈতিক পরিকল্পনার একটি স্পষ্ট ও কঠোর বার্তা দেন।
নেতানিয়াহু দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, “ইরানের সঙ্গে আমাদের যে লড়াই, তা এখনো শেষ হয়নি। যেকোনো মুহূর্তে সম্পূর্ণ নতুন এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।”
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক পদক্ষেপের যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি এই সংঘাতকে একটি আদর্শিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। নেতানিয়াহু বলেন, “ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইরানের চরম স্বৈরাচারী ও কট্টরপন্থি শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লিপ্ত রয়েছে। মূলত আমাদের এই দুটি দেশ সমগ্র সভ্যতার পক্ষে দাঁড়িয়ে বর্বরতার বিরুদ্ধে লড়াই করছে।”
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানে চালানো সামরিক অভিযানের ফলাফল নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ইরানের মাটিতে আমরা ইতোমধ্যে বিশাল সামরিক ও কৌশলগত সাফল্য অর্জন করেছি। তবে আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা থামব না। আমরা আমাদের লক্ষ্য ঠিকই অর্জন করব এবং বিশ্বের স্বাধীনতাকামী মানুষের জন্য আরও আশা ও আলোকবর্তিকা বয়ে আনব।”
ভেস্তে যাচ্ছে ইসলামাবাদের শান্তি আলোচনা
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই চরম আগ্রাসী মনোভাবের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ওয়াশিংটন-তেহরান শান্তি আলোচনার ওপর। চলমান এই আঞ্চলিক সংঘাত নিরসনে এবং পারমাণবিক চুক্তির জট খুলতে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফার ম্যারাথন বৈঠকের প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মাঝে ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা এই প্রহসনের শান্তি আলোচনায় আর অংশ নেবে না।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘ইরনা’ (IRNA) তেহরানের এই অনড় অবস্থানের পেছনের কারণগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছে। সংবাদ সংস্থাটির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক দ্বিচারিতাই এই আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার মূল কারণ। ইরনা জানায়:
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বারবার অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক দাবি-দাওয়া চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আলোচনার টেবিলে ওয়াশিংটন ক্রমাগত নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করছে।
মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পরস্পরবিরোধী ও হুমকিমূলক বিবৃতি এই আলোচনার পরিবেশকে সম্পূর্ণ বিষাক্ত করে তুলেছে। মূলত এসব কারণেই একটি অর্থবহ চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে বলে তেহরান মনে করে।
ট্রাম্পের চরম আল্টিমেটাম: ‘পুরো দেশ গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে’
শান্তি আলোচনার এই অচলাবস্থার মাঝেই আগুনে ঘি ঢেলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামরিক ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের তোয়াক্কা না করে তিনি ইরানকে সরাসরি ধ্বংসের হুমকি দিয়েছেন।
রোববার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক অত্যন্ত কড়া ও আক্রমণাত্মক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, “ওয়াশিংটন সম্পূর্ণ ন্যায্য, যৌক্তিক এবং ছাড় দেওয়া একটি চুক্তির প্রস্তাব তেহরানের টেবিলে রেখেছে। এই প্রস্তাব যদি ইরান গ্রহণ না করে, তবে তাদের প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, গুরুত্বপূর্ণ সেতু এবং পুরো দেশ সামরিক হামলার মাধ্যমে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।”
এর পাশাপাশি ট্রাম্প অভিযোগ করেন যে, ইরান তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির চরম লঙ্ঘন করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্র আর কোনোভাবেই বরদাশত করবে না।
বিশ্লেষকদের শঙ্কা
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নেতানিয়াহু এবং ট্রাম্পের এই যুগপৎ হুমকি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি মূলত আলোচনার টেবিলে বসার আগে তেহরানের ওপর সর্বোচ্চ মনস্তাত্ত্বিক ও সামরিক চাপ প্রয়োগের একটি সুপরিকল্পিত ছক। কিন্তু ইরান যেভাবে মার্কিন শর্ত প্রত্যাখ্যান করে আলোচনা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে, তাতে এই চাপ হিতে বিপরীত হতে পারে।
যুদ্ধবিরতির এই নাজুক মুহূর্তে যেকোনো একটি ভুল পদক্ষেপ বা হঠকারী সিদ্ধান্ত গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে এমন এক সর্বাত্মক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যার প্রভাব কেবল ওই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা বিশ্ব অর্থনীতি ও বৈশ্বিক নিরাপত্তাকে চরম খাদের কিনারে নিয়ে দাঁড় করাবে।