ইরানের ধ্বংসপ্রাপ্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো থেকে ইউরেনিয়াম বা ‘নিউক্লিয়ার ডাস্ট’ উদ্ধার করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি অত্যন্ত দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া হতে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ নামের ভয়াবহ সামরিক অভিযানের কারণেই মূলত এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ওই হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো মাটির সঙ্গে মিশে যায়। ফলে এখন সেই ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে বিপুল পরিমাণ ইউরেনিয়াম উদ্ধার করা সামরিক ও কারিগরি দিক থেকে মার্কিন বাহিনীর জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সংকটের সূত্রপাত হয় ২০২৫ সালের ৬ জুন, যখন জাতিসংঘের পরমাণু তদারকি সংস্থা আইএইএ (IAEA) একটি উদ্বেগজনক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে জানানো হয়, ইরানের হাতে প্রায় ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে যা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পরিশোধিত। এই ইউরেনিয়ামকে যদি ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধতায় উন্নীত করা যায়, তবে তা দিয়ে অনায়াসেই একাধিক শক্তিশালী পরমাণু বোমা তৈরি করা সম্ভব। এই খবরের পরপরই নড়েচড়ে বসে পশ্চিমা বিশ্ব। আইএইএ-এর ওই বিবৃতির মাত্র ছয় দিন পর ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ইসরায়েল শুরু করে ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’। এর কয়েক দিনের মাথায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের বি-২ স্পিরিট (B-2 Spirit) স্টিলথ বোমারু বিমান এবং জিবিইউ-৫৭ বাঙ্কার-বাস্টারের (GBU-57 MOP) মতো অত্যাধুনিক ও বিধ্বংসী সমরাস্ত্র ব্যবহার করে ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ নামে স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ বিমান হামলা চালায়।
টানা ১২ দিন ধরে চলা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এই যৌথ তাণ্ডবে ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানের মতো ইরানের অত্যন্ত সুরক্ষিত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, বোমাবর্ষণে স্থাপনাগুলোর বাহ্যিক ও ভূগর্ভস্থ কাঠামো গুঁড়িয়ে গেলেও, আসল বিপত্তি বাঁধে অন্য জায়গায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই মজুতকৃত ইউরেনিয়ামের নাগাল পেতে বা তা পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করতে ব্যর্থ হয়। মাটির অনেক গভীরে আটকা পড়া এই পারমাণবিক উপাদানগুলো এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা বিশ্বের জন্য এক ‘টিকিং টাইম বোম্ব’ বা সুপ্ত বিপদে পরিণত হয়েছে।
এই অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে নতুন করে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। পেন্টাগন ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সূত্রমতে, এই নতুন অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যই হলো যেকোনো মূল্যে ইরানের সেই হারিয়ে যাওয়া ইউরেনিয়ামের মজুত খুঁজে বের করে তা নিজেদের হস্তগত করা। তবে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট যে, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া এই পারমাণবিক উপাদান সম্পূর্ণ সুরক্ষিত অবস্থায় উদ্ধার করাটা মার্কিন প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর ধারণার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন ও সময়সাপেক্ষ হতে চলেছে।