যশোর জেলা আইনজীবী সমিতির এক মতবিনিময় সভায় বর্তমান সরকারের আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান দেশের ভবিষ্যৎ, বিচার বিভাগের সংস্কার এবং চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, বর্তমান সরকার যদি দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়, তবে বাংলাদেশ এক গভীর অন্ধকারের দিকে তলিয়ে যাবে। একই সঙ্গে তিনি বিচার বিভাগে ‘ইন্টেলেকচুয়াল দুর্নীতি’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতির কড়া সমালোচনা করে ন্যায়ভিত্তিক বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছেন।
আগামী প্রজন্মের জন্য শঙ্কার বার্তা
শুক্রবার দুপুরে যশোরের এই মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী দেশের রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আমরা সব সময় দেশের মানুষের পাশে আছি। কিন্তু কোনো কারণে আমরা যদি আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হই, তবে এই দেশ গভীর অন্ধকারের দিকে তলিয়ে যাবে। রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি যদি আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তবে আমাদের আগামী প্রজন্মের সামনে এক ভয়াবহ অন্ধকার ভবিষ্যৎ হাতছানি দেবে।”
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত
সরকারের সামনে থাকা নানামুখী চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ছাত্র-জনতার সফল গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের অর্থনীতি চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। এর মাঝে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং নাজুক অর্থনীতির মধ্যেও সরকার এতদিন তেলের দাম স্থিতিশীল রেখেছে, যা সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার একটি চেষ্টা।
দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি বহুল আলোচিত তনু হত্যা মামলার কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, দীর্ঘ ১০ বছর পর সরকার তনু হত্যা মামলার প্রথম আসামিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে, যা একটি বৈষম্যহীন ও স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার পথে অত্যন্ত ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ।
বিএনপি, ‘জুলাই সনদ’ এবং ইতিহাসের তিন অধ্যায়
সমসাময়িক রাজনীতি এবং বিএনপিকে নিয়ে চলা মিথ্যা প্রচারণারও জবাব দেন আইনমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করেন যে, বিএনপি বর্তমান ‘জুলাই সনদ’কে ধারণ করে এবং দলটির কাছে এটি তাদের দীর্ঘ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেরই একটি ধারাবাহিকতা।
দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের তিনটি বড় মাইলফলককে এক সুতোয় গেঁথে মন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের ‘জুলাই বিপ্লব’—এই তিনটি অধ্যায়ই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কোনোটিকে খাটো করে দেখার বা বিভাজনের কোনো সুযোগ নেই।”
বিচারিক অবক্ষয়: খায়রুল হকের কড়া সমালোচনা
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে আইনমন্ত্রী বিচার বিভাগের অতীত অবক্ষয় নিয়ে কড়া ভাষায় কথা বলেন। (নোট: মূল টেক্সটে উল্লিখিত ‘অনৈতিকতায় ভরপুর আইনজীবী-বিচারক চান’ বাক্যটি আক্ষরিক অর্থে ভুল বা টাইপো; তিনি মূলত ‘নৈতিকতায় ভরপুর’ বা ‘অনৈতিকতামুক্ত’ বিচার ব্যবস্থার কথা বুঝিয়েছেন)। দুর্নীতির ধরন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, দুর্নীতির বহুরূপ রয়েছে; এর একটি হলো সরাসরি অর্থনৈতিক দুর্নীতি, আর অন্যটি হলো সবচেয়ে ভয়ংকর—‘ইন্টেলেকচুয়াল’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি।
সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বিচারক খায়রুল হকের ইন্টেলেকচুয়াল দুর্নীতির কারণেই গত ১৭ বছরে দেশে হাজার হাজার মানুষ ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছেন, শত শত মানুষ গুম হয়েছেন। ঠিক একইভাবে দেশের ৬০ লক্ষের বেশি বিএনপি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে গায়েবি ও মিথ্যা মামলা দায়ের করা সম্ভব হয়েছে।” তিনি বিচার ব্যবস্থা থেকে এই বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি সমূলে উৎপাটন করে দেশে পুনরায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।