• সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ০৫:৫২ অপরাহ্ন
Headline
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান: বাংলাদেশের জন্য সুযোগ নাকি বিপদ? হাওরের বুক চিরে কৃষকের বোবাকান্না: অসময়ের ঢলে তলিয়ে গেল হাজার কোটি টাকার সোনালি স্বপ্ন ক্যাপাসিটি চার্জের ফাঁদে দেশের অর্থনীতি: ভুল নীতি ও অস্বচ্ছ চুক্তির দায় কার? বিশ্বকাপের ক্ষণগণনা শুরু: কবে চূড়ান্ত দল ঘোষণা করবে ৪৮ দেশ? ড. ইউনূস সরকারের সব কর্মকাণ্ডের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট ফের বিয়ের পিঁড়িতে ইমরান খানের সাবেক স্ত্রী জেমিমা রোগী বাড়ছে, চিকিৎসক নেই: জনবল ও ওষুধ সংকটে ধুঁকছে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট রুগ্‌ণ শিল্পে প্রাণ ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মেগা পরিকল্পনা চ্যানেল ওয়ানের প্রত্যাবর্তন ও প্রাসঙ্গিকতার সংকট: দর্শক কি আর লোগোয় বিশ্বাস করে? কোরবানির ঈদ সামনে রেখে মসলার বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা: পর্যাপ্ত সরবরাহ সত্ত্বেও হু হু করে বাড়ছে দাম

কোরবানির ঈদ সামনে রেখে মসলার বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা: পর্যাপ্ত সরবরাহ সত্ত্বেও হু হু করে বাড়ছে দাম

Reporter Name / ৫ Time View
Update : সোমবার, ৪ মে, ২০২৬

পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ আসতে এখনো প্রায় মাসখানেক বাকি। কোরবানির ঈদ মানেই ঘরে ঘরে মাংসের নানা পদ রান্নার আয়োজন, আর এই আয়োজনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হলো বিভিন্ন ধরনের মসলা। কিন্তু উৎসবের এই আনন্দকে পুঁজি করে এখনই অসাধু সিন্ডিকেট মসলার বাজারে কারসাজি শুরু করেছে। বাজারে মসলা জাতীয় পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও অতিমুনাফার লোভে দাম বাড়িয়ে ক্রেতাদের দিশেহারা করে তুলছে অসাধু চক্র। ধাপে ধাপে দাম বাড়িয়ে পাইকারি ও খুচরা বাজারকে একপ্রকার বেসামাল করে তোলা হয়েছে।

বাজার বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক বছর ধরে বাজার কারসাজির ধরনে একটি বড় পরিবর্তন এসেছে। সিন্ডিকেটগুলো এখন আর ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে দাম বাড়ায় না। বরং ঈদের দেড় থেকে দুই মাস আগেই পরিকল্পিতভাবে সব পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, যাতে ঈদের সময় কেউ অভিযোগ করতে না পারে যে নতুন করে দাম বেড়েছে। পাশাপাশি, ঈদের আগে যদি মন্ত্রণালয়ের চাপে মূল্য কিছুটা কমাতেও হয়, তবুও যাতে অতিরিক্ত মুনাফা পকেটে ঢোকে, সেই লক্ষ্যেই সিন্ডিকেটগুলো আগেভাগেই এই নতুন এবং চড়া মূল্য নির্ধারণ করে রাখছে। আর বাজার তদারকি সংস্থাগুলো যেন ‘টিনের চশমা’ পরে বসে আছে, যার সম্পূর্ণ খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের।

মসলার বাজারে আগুন: লাফিয়ে বাড়ছে দাম

খুচরা বাজারের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতিটি মসলার দামই ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে সুগন্ধি মসলা এলাচের দাম কেজিতে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। রাজধানীর খুচরা বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি এলাচ বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ৬০০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ৪ হাজার ৩০০ টাকা।

লবঙ্গের দামও লাফিয়ে বেড়েছে। প্রতি কেজি লবঙ্গে ২০০ টাকা বাড়িয়ে বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৪৫০ টাকায়। অথচ এক সপ্তাহ আগেও এই লবঙ্গ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

তবে সবচেয়ে বড় উল্লম্ফন দেখা গেছে মাংসের স্বাদ বাড়াতে ব্যবহৃত আলুবোখারার দামে। খুচরা বাজারে আলুবোখারার দাম কেজিতে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আগে যে আলুবোখারা ৯০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতো, তা বর্তমানে ১ হাজার ৫০০ টাকায় ঠেকেছে।

অন্যান্য মসলার চিত্রও একই রকম। প্রতি কেজি কিশমিশ বিক্রি হচ্ছে ৮৩০ থেকে ৮৫০ টাকায়, যা আগে ছিল ৭৬০ টাকা। রান্নার অতি প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ দেশি পেঁয়াজের দাম কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে এখন ৮০ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দারুচিনির দাম কেজিপ্রতি ৪০০-৫০০ টাকা থেকে বেড়ে বর্তমানে ৫০০-৬০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এছাড়া, জিরার দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়ে ৬৫০ টাকায়, ধনেগুঁড়া ২০ টাকা বেড়ে ২০০-২৮০ টাকায় এবং তেজপাতা ৪০ টাকা বেড়ে ১৮০-২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এমনকি কাঁচামরিচের দামও গত ৭ দিনের ব্যবধানে ৬০-১২০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০-১৩০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।

বাদামের বাজারেও উত্তাপ

ঈদ উপলক্ষে মিষ্টান্নসহ বিভিন্ন খাবার তৈরিতে ব্যবহৃত বাদামের বাজারেও উত্তাপ ছড়িয়েছে সিন্ডিকেট। কয়েক ধাপে দাম বাড়িয়ে বর্তমানে প্রতি কেজি পেস্তা বাদাম বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ১০০ থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকায়। এই পেস্তা আগে বিক্রি হতো ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকায়, অর্থাৎ কেজিতে দাম বেড়েছে প্রায় ৮০০ টাকা। অন্যদিকে কাজু বাদাম প্রতি কেজি ১ হাজার ১৫০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ক্রেতা ও খুচরা বিক্রেতাদের অসহায়ত্ব

রাজধানীর নয়াবাজারে মসলা কিনতে আসা মো. শরিফুল ইসলাম নামের এক ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ঈদের এখনো এক মাস বাকি, কিন্তু বিক্রেতারা এখনই সব ধরনের মসলার দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। গত কয়েক বছর ধরেই এই একই চিত্র দেখছি। উৎসব এলেই বিক্রেতারা অতিমুনাফা করতে চায় এবং সরাসরি ভোক্তার পকেট কাটে। এবারও বাজারের একই অবস্থা, কিন্তু তদারকি সংস্থার সেদিকে কোনো নজর নেই।”

খুচরা বিক্রেতারাও পাইকারি বাজারের দিকে আঙুল তুলছেন। একই বাজারের মুদি বিক্রেতা মো. তুহিন জানান, “বাজারে মসলা সরবরাহে কোনো ধরনের ঘাটতি নেই। এরপরও দাম অনেক চড়া। পাইকারি বাজারে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করা হচ্ছে বলে আমাদেরও বেশি দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।”

পাইকারি ব্যবসায়ীদের অজুহাত

মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে পাইকারি ব্যবসায়ীরা আন্তর্জাতিক বাজার ও যুদ্ধ পরিস্থিতির অজুহাত দিচ্ছেন। বাংলাদেশ পাইকারি গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. এনায়েত উল্লাহ জানান, “মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম থেকে আমদানি ব্যাহত হওয়ার কারণে আলুবোখারা, কিশমিশ, পেস্তা ও কাজুসহ বিভিন্ন মসলার দাম বাড়তি।” তিনি আরও বলেন, ভারত, গুয়াতেমালা ও ইন্দোনেশিয়া থেকে যেসব পণ্য আসছে সেগুলোর আমদানি স্বাভাবিক থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেশি। এর সঙ্গে দেশে জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে পরিবহন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে মসলার দামের ওপর।

ভোক্তা অধিকার ও ক্যাবের অবস্থান

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন এই মূল্যবৃদ্ধিকে অযৌক্তিক বলে মনে করছেন। তিনি বলেন, “বিশ্ববাজারের অজুহাতে দেশের বাজারে ব্যবসায়ীরা আদৌ যৌক্তিক দামে পণ্য বিক্রি করছে কি না—তা খতিয়ে দেখতে হবে। কারণ, উৎসব এলেই পণ্যের দাম বাড়িয়ে অসাধু চক্র ভোক্তাকে ভোগান্তিতে ফেলে। রোজার আগেও আমরা ঠিক একই চিত্র দেখেছি এবং এবার কোরবানির ঈদকে ঘিরেও একই কারসাজি শুরু হয়েছে।”

এদিকে বাজার নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, ঈদকে সামনে রেখে বাজার তদারকি ব্যবস্থা নতুন করে ঢেলে সাজানো হয়েছে। এরই মধ্যে কর্মকর্তারা বাজারে তদারকির কাজ শুরু করেছেন এবং কোনো ধরনের অনিয়ম বা কারসাজির প্রমাণ পেলে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে। সংস্থাটি আরও জানিয়েছে যে, আমদানিকারকরা ঠিক কী দামে পণ্য আমদানি করেছেন এবং তা হাতবদল হয়ে পাইকার ও খুচরা বাজারে কী দামে বিক্রি হচ্ছে, তা কঠোরভাবে খতিয়ে দেখা হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category