• সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১১:৪৬ অপরাহ্ন
Headline
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এডিবি প্রেসিডেন্টের সৌজন্য সাক্ষাৎ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে ইরানের সম্মতি, চুক্তির সম্ভাবনা আতাউর রহমান সম্পর্কে আবুল হায়াতের আবেগঘন স্মৃতিচারণ সুস্থ ও প্রাকৃতিকভাবে মোটাতাজা গরু চেনার উপায় চুক্তি না হলে ইরানের সঙ্গে ‘বড় সংঘাতের’ হুঁশিয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের টাঙ্গাইলে রডবাহী ট্রাক খাদে উল্টে নিহত পনেরো যাত্রী টানা তৃতীয় বছরের মতো গাজায় নেই কোরবানির ঈদ চাঁদপুরে আকস্মিক ঝড়ের কবলে যাত্রীবাহী লঞ্চ আহত অর্ধশতাধিক গরু কোরবানির দাবিতে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু খামারিদের বিক্ষোভ শিশু রামিসা হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দাখিল শুনানি জুনে

ডলারের চেয়ে ইয়েন বা ইউয়ানে ঋণ নেওয়া সাশ্রয়ী: ইআরডির গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য

Reporter Name / ২৩ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২৬

বৈদেশিক ঋণের বোঝায় জর্জরিত বাংলাদেশের জন্য এক নতুন আশার আলো দেখিয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সাম্প্রতিক একটি বিশ্লেষণ। ইআরডির নীতিমালায় উঠে এসেছে যে, উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে শুধু মার্কিন ডলারে ঋণ না নিয়ে জাপানি ইয়েন বা চীনা ইউয়ানে (রেনমিনবি) ঋণ নিলে ঋণের দায় পরিশোধের ব্যয় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের চড়া সুদ এবং বিনিময় হারের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এই কৌশলটি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ইআরডির গবেষণায় সাশ্রয়ের চিত্র

ইআরডির ‘পলিসি ব্রিফ’ বা নীতিপত্রে একটি সুনির্দিষ্ট উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের (এআইআইবি) কাছ থেকে নেওয়া ৩৯৯ মিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলার) একটি বাজেট সহায়তা ঋণের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এটি যদি ডলারে নেওয়া হয় তবে সুদে-আসলে মোট পরিশোধ করতে হবে প্রায় ৬৯৪ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু একই পরিমাণ ঋণ যদি জাপানি ইয়েনে নেওয়া হয়, তবে তার মোট পরিশোধের অঙ্ক দাঁড়াবে মাত্র ৪৯২ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, শুধু মুদ্রার ধরণ পরিবর্তনের মাধ্যমেই একটি নির্দিষ্ট ঋণে প্রায় ২০২ মিলিয়ন ডলার বা ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকারও বেশি সাশ্রয় করা সম্ভব।

আবার যদি এই ঋণ চীনা ইউয়ানে নেওয়া হয়, তবে মোট পরিশোধের ব্যয় হবে ৫৬২ মিলিয়ন ডলার। এটি ডলারের তুলনায় প্রায় ১৩২ মিলিয়ন ডলার কম। এই বিশাল পার্থক্যের প্রধান কারণ হলো সুদের হারের ব্যবধান। বর্তমানে ডলারে নেওয়া ঋণের ক্ষেত্রে বেঞ্চমার্ক রেট হিসেবে পরিচিত ‘সোফর’ (SOFR) ৫ শতাংশের উপরে অবস্থান করছে। বিপরীতে জাপানি ইয়েনে সুদের হার মাত্র ১.৫ থেকে ১.৭ শতাংশ এবং ইউয়ানে এটি ২.৫ শতাংশের আশেপাশে। জাপানের দীর্ঘমেয়াদী নমনীয় মুদ্রানীতি এবং চীনের নিয়ন্ত্রিত সুদের হারের কারণেই এমন সাশ্রয় সম্ভব হচ্ছে।

মাল্টি-কারেন্সি বা বহুমাত্রিক মুদ্রা কৌশলের পথে বাংলাদেশ

ইআরডির এই প্রস্তাবনা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ নেই, সরকার ইতিমধ্যে বাস্তব প্রয়োগ শুরু করেছে। গত অর্থবছরে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কালিয়াকৈরের সঞ্চালন অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য ১৬০ মিলিয়ন ডলারের একটি ঋণ চুক্তি সই হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই প্রথম ঋণ যা তিনটি ভিন্ন মুদ্রায় (ডলার, ইউরো এবং ইউয়ান) বিভক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০৯.৭৮ মিলিয়ন ডলার, ২৯.৪২ মিলিয়ন ইউরো এবং ১৩২.৪৯ মিলিয়ন রেনমিনবি রয়েছে।

এছাড়া নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এনডিবি) অধীনে ঢাকা শহরের পানি সরবরাহ প্রকল্পের ৩২০ মিলিয়ন ডলারের ঋণের কাঠামোও একইভাবে ডলার, ইউরো এবং ইউয়ানে সাজানো হচ্ছে। এই ব্যবস্থার একটি বড় সুবিধা হলো, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা প্রতিটি কিস্তি ছাড়ের আগে বাজারের পরিস্থিতি বুঝে মুদ্রার অনুপাত নির্ধারণ করার সুযোগ পাবে। এমনকি এআইআইবি-র ঋণের ক্ষেত্রেও চারবার মুদ্রার ধরণ বা সুদের হার পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে, যা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে আরও সহজ করে তোলে।

কারেন্সি বাস্কেট: একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচ

ইআরডির নীতিপত্রে আইএমএফ এবং গোল্ডম্যান স্যাকস-এর সুপারিশ অনুযায়ী একটি ‘কারেন্সি বাস্কেট’ বা মুদ্রার ঝুড়ি তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মূল দর্শন হলো ‘ন্যাচারাল হেজিং’ বা প্রাকৃতিক সুরক্ষা। যখন কোনো দেশের বৈদেশিক ঋণ কেবল একটি মুদ্রায় (যেমন ডলারে) কেন্দ্রীভূত থাকে, তখন ডলারের দাম বাড়লে পুরো ঋণের বোঝা একবারে বেড়ে যায়। কিন্তু যদি ঋণগুলো ডলার, ইউরো, ইয়েন এবং ইউয়ানে ছড়ানো থাকে, তবে একটি মুদ্রার মান বাড়লে অন্যটির মান কমার ফলে ঋণের সার্বিক চাপে ভারসাম্য বজায় থাকে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট জাহিদ হোসেন এই কৌশলের প্রশংসা করে বলেন, “মুদ্রার বৈচিত্র্যকরণ একটি ভালো কৌশল। যদি বড় ঋণগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন মুদ্রায় ভাগ করা যায়, তবে কোনো একটি মুদ্রার অস্থিরতা পুরো ঋণ ব্যবস্থাকে সংকটে ফেলবে না।”

সতর্কতা ও ভিন্নমত

তবে এই সাশ্রয়ী কৌশলের পথে কিছু চ্যালেঞ্জ ও ভিন্নমতও রয়েছে। ডক্টর জাহিদ হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, “আপনার ঋণের মুদ্রা সেই মুদ্রার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত যে মুদ্রায় আপনি আয় করেন।” বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্সের সিংহভাগই আসে ডলারে, কিছু ইউরোতে। ইয়েন বা ইউয়ানে বাংলাদেশের আয় অত্যন্ত সীমিত। ফলে ঋণ পরিশোধের সময় বাজার থেকে ইয়েন বা ইউয়ান কিনতে গিয়ে বিনিময় হারের ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা থাকে, যা সম্ভাব্য সাশ্রয়কে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।

ইআরডির অভ্যন্তরীণ কিছু কর্মকর্তাও ইয়েনে অতিরিক্ত ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের প্রায় ১৯.৬ শতাংশই ইয়েনে। গত তিন দশকে ইয়েনের মান ডলারের বিপরীতে ব্যাপক ওঠানামা করেছে। ১৯৯৫ সালে যেখানে এক ডলারে ৯৬ ইয়েন পাওয়া যেত, ২০২৫ সালের শেষে তা ১৫৫ ইয়েন ছাড়িয়ে গেছে। জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি হঠাৎ তাদের মুদ্রানীতি পরিবর্তন করে সুদের হার বাড়িয়ে দেয়, তবে ইয়েন শক্তিশালী হয়ে উঠবে এবং বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের ব্যয় একলাফে অনেক বেড়ে যাবে। এই কর্মকর্তারা তাই ইয়েনের চেয়ে ইউরোতে বৈচিত্র্যকরণের ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও এম মাসরুর রিয়াজও একই সুরে কথা বলেছেন। তিনি মনে করেন, পর্যাপ্ত ক্যাশ ফ্লো বা মুদ্রার জোগান না থাকলে এই কৌশল হিতে বিপরীত হতে পারে। তিনি রিজার্ভের সক্ষমতা এবং লেনদেনের খরচ সতর্কভাবে পর্যালোচনার পরামর্শ দেন।

ভবিষ্যৎ পথরেখা

ইআরডি তাদের প্রতিবেদনে স্বীকার করেছে যে, এই বহুমাত্রিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা পরিচালনার জন্য অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি। বিশেষ করে মুদ্রার মানের সংবেদনশীলতা বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য আধুনিক ‘সিনেরিও মডেলিং’ প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইউয়ানের ব্যবহার সহজতর করার পদক্ষেপ নিয়েছে, যা ডলারের ওপর চাপ কমাতে সহায়ক হবে।

পরিশেষে বলা যায়, ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য এবং উচ্চ সুদের হার থেকে বাঁচতে মুদ্রার বৈচিত্র্যকরণ একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। সাশ্রয়ের সম্ভাবনা যেমন বিশাল, তেমনি বিনিময় হারের ঝুঁকিও উপেক্ষা করার মতো নয়। দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং বিচক্ষণ নীতিনির্ধারণের মাধ্যমেই কেবল এই নতুন কৌশলের সুফল ভোগ করতে পারবে বাংলাদেশ।

উৎস: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (TBS) অনুসরণে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category