• সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩২ পূর্বাহ্ন

আয়ের বড় অংশই কাড়ছে হাসপাতাল

Reporter Name / ৬০ Time View
Update : শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য অবকাঠামোর উন্নয়ন নিয়ে সরকারি পর্যায়ে নানা আশার বাণী শোনানো হলেও, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। সাধারণ মানুষের পকেট থেকে স্বাস্থ্য খাতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা এখন রীতিমতো আশঙ্কাজনক। সম্প্রতি বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, এদেশের নিম্নবিত্ত মানুষ তাদের মোট আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশই খরচ করছে চিকিৎসার পেছনে। বিপরীতে ধনী পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এই ব্যয়ের হার মাত্র ৫ শতাংশ। এই বিশাল ব্যবধানই বলে দেয় যে, দেশের বর্তমান স্বাস্থ্য অর্থায়ন ব্যবস্থা দরিদ্র মানুষের জন্য কতটা নির্দয় হয়ে উঠেছে।

গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে ‘বাংলাদেশে অপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা চাহিদা ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয়ের পরিবর্তিত বাস্তবতা’ শীর্ষক গবেষণাটি উপস্থাপন করা হয়। ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপের ডাটা বিশ্লেষণ করে জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. আবদুর রাজ্জাক সরকার দেখিয়েছেন, দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশই মানুষকে বহন করতে হচ্ছে নিজের পকেট থেকে। এটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং লাখ লাখ পরিবারের দারিদ্র্যসীমার নিচে তলিয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রতি পাঁচজনের মধ্যে অন্তত একজন মানুষ মাসে একবার হলেও স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন অনুভব করেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে মোট চাহিদার প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষই প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত থাকছেন। জেলাভিত্তিক বৈষম্যের চিত্র আরও ভয়াবহ। নড়াইল ও হবিগঞ্জের মতো জেলাগুলোতে প্রায় ৮০ থেকে ৮১ শতাংশ মানুষ সঠিক চিকিৎসা পান না। অন্যদিকে ফেনীতে এই হারের চিত্র কিছুটা ভালো। চিকিৎসা না পাওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা গেছে চিকিৎসার উচ্চ ব্যয়, সচেতনতার অভাব এবং যাতায়াতের ভোগান্তি। নিরুপায় হয়ে মানুষ হাতুড়ে ডাক্তার বা স্থানীয় ফার্মেসির ওপর নির্ভর করছে, যা অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যের জন্য আরও ঝুঁকি তৈরি করছে।

একজন সাধারণ মানুষকে ঠিক কত টাকা খরচ করতে হচ্ছে চিকিৎসার পেছনে? গবেষণায় দেখা গেছে, একটি পরিবারকে মাসে গড়ে ৩ হাজার ৪৫৪ টাকা স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় করতে হয়। গ্রামীণ পরিবারের ক্ষেত্রে এটি তাদের খাদ্যবহির্ভূত ব্যয়ের চার ভাগের এক ভাগ। ব্যয়ের সিংহভাগই চলে যায় ওষুধ কেনা এবং রোগ নির্ণয় বা ডায়াগনস্টিক পরীক্ষায়। যদি কোনো রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়, তবে সেই খরচ গড়ে ৪২ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যায়। জটিল রোগের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও মারাত্মক। ক্যানসার চিকিৎসায় একেকটি পরিবারের ব্যয় হচ্ছে প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা পর্যন্ত। হৃদরোগ বা কিডনি রোগের মতো দীর্ঘমেয়াদী সমস্যাগুলো একটি পরিবারকে আর্থিকভাবে পুরোপুরি পঙ্গু করে দিচ্ছে।

সেমিনারে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ব্যক্তিগত ব্যয় যত বাড়বে, সামাজিক বৈষম্য তত প্রকট হবে। তাঁর মতে, সরকার যদি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়াতে পারে, তবেই দরিদ্র মানুষের এই হাহাকার কমানো সম্ভব। সরকারের নীতিনির্ধারকদের এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা সীমিত সম্পদ দিয়ে বড় বড় হাসপাতালের আইসিইউ বাড়াবে নাকি সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, সরকার একটি মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে কাজ করছে। বৈষম্য কমাতে ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা এবং জেলা হাসপাতালগুলোতে কার্ডিয়াক ও ডায়ালাইসিস ইউনিট চালুর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে গবেষকদের মতে, শুধুমাত্র নিয়োগ বা ইউনিট চালুই যথেষ্ট নয়; কার্যকর কোনো জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা (National Health Insurance) পদ্ধতি চালু করা না গেলে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

পরিশেষে বলা যায়, চিকিৎসার ব্যয় যখন আয়ের বড় অংশ গ্রাস করে নেয়, তখন শিক্ষা বা খাদ্যের মতো মৌলিক চাহিদাগুলো গৌণ হয়ে পড়ে। স্বাস্থ্য সেবাকে বাণিজ্যের হাত থেকে রক্ষা করে সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য করতে না পারলে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।

তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ, বিআইডিএস গবেষণা প্রতিবেদন ও সেমিনার আলোচনা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category