• শনিবার, ০৯ মে ২০২৬, ১১:০৩ পূর্বাহ্ন
Headline
জন্মদিনে দারুণ ফিফটি: মিরপুরে মুশফিকের স্মরণীয় উদ্‌যাপন রাতের আঁধারে অরক্ষিত রাজধানী: সশস্ত্র ছিনতাই, হত্যার মহোৎসব ও পুলিশের নির্বিকার ভূমিকায় চরম আতঙ্কে নগরবাসী গাজীপুরে প্রবাসীর স্ত্রী-সন্তানসহ পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যা বিনিয়োগে পালাবদল: ব্যাংকের এফডিআর ছেড়ে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে ঝুঁকছেন সাধারণ মানুষ তহবিল শূন্য: অর্থ সংকটে উপজেলা পর্যায়ে ব্যাহত বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ জনবল ও বাজেট সংকটে ধুঁকছে নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল: পড়ে আছে ৫০০ শয্যার নতুন ভবন আব্দুল গনি রোড থেকে শেরেবাংলা নগর: যানজট ও স্থান সংকট এড়াতে পুরো সচিবালয় স্থানান্তরের নতুন ছক এসএসসির খাতা দেখছে শিক্ষার্থীরা: মূল্যায়নে চরম অব্যবস্থাপনা ও আইনি লঙ্ঘন উত্তেজনার মাঝেই ওয়াশিংটনে ইসরাইল-লেবানন শান্তি আলোচনা: একদিকে হামলা, অন্যদিকে কূটনীতি হরমুজের ‘অদৃশ্য ঘাতক’ ও ভূরাজনৈতিক দাবার চাল: কেন পিছপা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?

হরমুজের ‘অদৃশ্য ঘাতক’ ও ভূরাজনৈতিক দাবার চাল: কেন পিছপা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?

Reporter Name / ৫ Time View
Update : শনিবার, ৯ মে, ২০২৬

‘শান্ত পানির নিচেই থাকে গভীর স্রোত’—এই প্রবাদটি বর্তমানে পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের সংযোগস্থল হরমুজ প্রণালির ক্ষেত্রে যেন অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায়। আকাশ থেকে দেখলে এটি একটি সাধারণ ও ব্যস্ত জলপথ মনে হলেও, বর্তমানে এটি ইরানের হাতে পারমাণবিক বোমার চেয়েও এক শক্তিশালী ‘কৌশলগত অস্ত্র’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই প্রণালিকে ঘিরে তেহরান এমন এক অভেদ্য সুরক্ষা বলয় তৈরি করেছে যে, খোদ আমেরিকার নবনিযুক্ত যুদ্ধমন্ত্রী পিটার হেগসেথ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, মার্কিন বাহিনী কোনোভাবেই হরমুজে প্রবেশ করবে না।

কিন্তু কী এমন আছে হরমুজের তলদেশে ও এর চারপাশে? কেন পরাক্রমশালী মার্কিন বাহিনীও এই সংকীর্ণ জলপথে ঢুকতে ভয় পাচ্ছে?

সমুদ্র-মাইন: হরমুজের ‘অদৃশ্য ঘাতক’

হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হলো সমুদ্র-মাইন। এই অস্ত্র খালি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই বিশাল যুদ্ধজাহাজ বা বাণিজ্যিক ট্যাংকারকে সমুদ্রের অতলে তলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় এই অঞ্চলে মাইনের ধ্বংসাত্মক ব্যবহার বিশ্ববাসী দেখেছে। বর্তমানে ইরান হরমুজের তলদেশ এবং উপরিভাগে স্থাপনের উপযোগী নৌ-মাইনের এক বিশাল ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে এবং এরই মধ্যে প্রণালির কিছু অংশে মাইন স্থাপন করেছে বলেও দাবি করা হচ্ছে। এই অদৃশ্য ঘাতকের ভয়েই হরমুজ এখন পশ্চিমাদের জন্য এক ‘মৃত্যুফাঁদ’।

কেন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আক্রমণ করতে পারবে না?

তাত্ত্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা দিয়ে হরমুজে হামলা চালানো সম্ভব হলেও, বাস্তবে এটি অত্যন্ত কঠিন, ঝুঁকিপূর্ণ এবং আত্মঘাতী।

  • ভৌগোলিক দুর্বলতা: হরমুজ প্রণালি খুবই সংকীর্ণ। বিশাল মার্কিন যুদ্ধজাহাজ বা এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার এই পথে ঢুকলেই তা ইরানের জন্য ‘সহজ লক্ষ্যবস্তুতে’ পরিণত হবে।

  • ‘এ২/এডি’ জোন: ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (IRGC) এই অঞ্চলে শক্তিশালী ‘অ্যান্টি-অ্যাকসেস/এরিয়া ডিনায়াল’ (A2/AD) জোন তৈরি করেছে। উপকূলভিত্তিক মিসাইল, স্পিডবোট, ড্রোন এবং রাডার নজরদারির এমন এক সমন্বয় তারা গড়ে তুলেছে, যা ভেদ করা প্রায় অসম্ভব।

  • বৈশ্বিক বাণিজ্যের চোকপয়েন্ট: এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়। যুদ্ধ বাঁধলে ইরান মাইন বিছিয়ে পুরো পথ অচল করে দিতে পারে। এতে শুধু সামরিক অভিযানই মুখ থুবড়ে পড়বে না, তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে বিশ্ব অর্থনীতি ধসে পড়বে।

  • আন্তর্জাতিক চাপ: এটি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ। এখানে সামরিক আগ্রাসন চালালে যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক মহলের তীব্র রোষানলে পড়তে হবে। এসব কারণেই যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হরমুজে নৌ-হামলার বদলে আকাশপথ বা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ওপরই ভরসা করে।

ইরানের নতুন নৌ-রুট: নিরাপত্তার মোড়কে শক্তির বার্তা

সম্ভাব্য মাইন ঝুঁকি এড়ানোর কথা বলে আইআরজিসি সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের জন্য নতুন নির্দিষ্ট রুট ঘোষণা করেছে।

  • প্রবেশ পথ: ওমান সাগর থেকে লারাক দ্বীপের উত্তর দিক দিয়ে।

  • বহির্গমন পথ: পারস্য উপসাগর থেকে লারাক দ্বীপের দক্ষিণ দিক দিয়ে।

জাহাজগুলোকে অবশ্যই আইআরজিসির নৌবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে বলা হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও, ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এটি মূলত ইরানের কৌশলগত বার্তা। এর মাধ্যমে তেহরান বুঝিয়ে দিল—হরমুজের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে এবং যেকোনো সংঘাতের সময় তারা এটিকে ‘তুরুপের তাস’ বা ‘লিভারেজ’ হিসেবে ব্যবহার করতে প্রস্তুত।

বিশ্ববাজারে ও রাজনীতিতে এর প্রভাব

ইরানের এই নতুন নির্দেশনার সরাসরি প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রাজনীতিতে।

  • বীমা ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি: নতুন রুট এবং আইআরজিসির সঙ্গে সমন্বয়ের বাধ্যবাধকতায় নৌ চলাচলের স্বাধীনতা খর্ব হবে। ঝুঁকি বাড়ায় জাহাজের বীমা খরচ ও পরিবহন ব্যয় হু হু করে বাড়বে।

  • তেলের দামে অস্থিরতা: সাপ্লাই চেইনে ধীরগতি ও অনিশ্চয়তার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম চরম অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।

  • ইতিবাচক দিক: তবে সত্যিই যদি মাইন স্থাপন করা হয়ে থাকে, তাহলে নির্ধারিত এই নিরাপদ রুট বড় ধরনের নৌ-দুর্ঘটনা এড়াতে সাহায্য করতে পারে।

ভবিষ্যতের সমীকরণ কী?

হরমুজের বর্তমান পরিস্থিতি তিন দিকে মোড় নিতে পারে। প্রথমত, যদি বিশ্ব সম্প্রদায় ইরানের নির্ধারিত রুট মেনে নেয়, তবে পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকবে। দ্বিতীয়ত, পশ্চিমারা যদি একে চ্যালেঞ্জ করে, তবে কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করবে। তৃতীয়ত, নিরাপত্তা শঙ্কার অজুহাতে এই অঞ্চলে বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়লে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি সামরিকীকরণ হতে পারে।

হরমুজ প্রণালির এই নতুন রুট ঘোষণা নিছক কোনো নৌ-নির্দেশনা নয়। এটি বিশ্ব শক্তির রাজনীতির এক স্পষ্ট চাল। সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়ানোর যুক্তির আড়ালে ইরান মূলত গোটা বিশ্বকে নিজেদের সামরিক সক্ষমতার বার্তা দিয়েছে। হরমুজ এখন আর শুধু একটি জলপথ নয়, এটি হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর ‘চোকপয়েন্ট’।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category