মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার কারণে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালিতে তৈরি হয়েছে এক নজিরবিহীন অচলাবস্থা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংঘাত ও নিরাপত্তাজনিত অনিশ্চয়তায় বর্তমানে প্রণালির কাছাকাছি অন্তত ১ হাজার ৬০০ বাণিজ্যিক জাহাজ আটকা পড়ে আছে। এই অচলাবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের ওপরও। আটকে পড়া এই বিশাল বহরে রয়েছে বাংলাদেশের নিজস্ব পতাকাবাহী একটি জাহাজ এবং দেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি জ্বালানিবাহী আরও দুটি ট্যাংকার।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জাহাজগুলোর বিস্তারিত তথ্য জানিয়ে কূটনৈতিক চিঠি পাঠানো হলেও, এখন পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের কোনো অনুমতি মেলেনি। আটকা পড়া গুরুত্বপূর্ণ জাহাজগুলো হলো:
এমটি লিব্রেথা: লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী এই ট্যাংকারটি ৬২ হাজার টন তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) নিয়ে কাতারের রাস লাফান বন্দর থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে আসার কথা ছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই এটি কাতারের বহির্নোঙরে ভাসছে।
এমটি নরডিক পলুকস: এক লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল নিয়ে সৌদি আরবের রাস তানুরা টার্মিনাল থেকে বাংলাদেশের পথে রওনা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল এই ট্যাংকারটি। অনুমতির অভাবে এটিও বর্তমানে সৌদি উপকূলের বহির্নোঙরে অপেক্ষায় আছে।
এমভি বাংলার জয়যাত্রা: এটি বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) নিজস্ব পতাকাবাহী জাহাজ, যার ভেতরে রয়েছেন ৩১ জন বাংলাদেশি নাবিক।
গত ২ ফেব্রুয়ারি থেকে ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’ পারস্য উপসাগরে পণ্য পরিবহনের কাজ করছিল। সংঘাত শুরু হলে ১১ মার্চ এটিকে দেশে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয় বিএসসি। পরবর্তীতে ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলে জাহাজটি সৌদি আরবের রাস আল খায়ের বন্দর থেকে দেশের পথে রওনা দেয়।
বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক জানান, অনুমতি চাওয়ার পর কোনো নেতিবাচক বার্তা না আসায় তারা ভেবেছিলেন প্রণালি উন্মুক্ত। জাহাজটি ১০ এপ্রিল ভোর ৩টার দিকে হরমুজ অতিক্রম করার কথা ছিল। কিন্তু রাত সাড়ে ১২টার দিকে ইরানিয়ান নেভি ও আইআরজিসি রেডিও বার্তার মাধ্যমে সব জাহাজকে থামার নির্দেশ দেয়। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, আইআরজিসির অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি পার হওয়া যাবে না। নিরুপায় হয়ে জাহাজটিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ বন্দরে ফিরে যেতে হয়।
মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী পরিস্থিতি নিশ্চিত করে জানান, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পারস্য উপসাগর হয়ে কোনো জাহাজই বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেনি।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখলেও আটকে থাকা জাহাজগুলোর জন্য সীমিত সেবার প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। দেশটির বন্দর ও সামুদ্রিক সংস্থা (পিএমও) জানিয়েছে, তারা এই জাহাজগুলোকে সীমিত পরিসরে জ্বালানি, চিকিৎসাসেবা ও মেরামতের সরঞ্জাম দিতে প্রস্তুত। গত তিনদিন ধরে ভিএইচএফ মেরিন রেডিওর মাধ্যমে জাহাজগুলোকে নিকটস্থ ইরানি বন্দরের সঙ্গে চ্যানেল-১৬ ব্যবহার করে যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হচ্ছে। ইরান এটিকে তাদের ‘সার্বভৌম দায়িত্ব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
যুদ্ধবিরতির গুঞ্জনে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে কিছুটা স্বস্তি দেখা গেলেও উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ১১ ডলারে ওঠার পর তা কিছুটা কমে ৯৮ ডলারে নেমেছে। তেলের দাম ১০০ ডলারের নিচে নামলেও এটি যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি।
এই পরিস্থিতিতে ডেল্টা এলপিজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, বাংলাদেশমুখী দুটি জ্বালানিবাহী ট্যাংকার আটকে থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, “মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি খুব দ্রুত বদলায়। এই যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তেলের উচ্চমূল্য ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার শঙ্কা এখনো কাটেনি।”
হরমুজ প্রণালির এই জট দ্রুত না খুললে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।