অটোমান সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিক আভিজাত্য আর আধুনিক প্রযুক্তির এক অবিশ্বাস্য মেলবন্ধন ঘটিয়েছে তুরস্ক। শব্দের চেয়ে ২৫ গুণ বেশি গতিতে আঘাত হানতে সক্ষম নিজেদের প্রথম আন্তর্মহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (ICBM) প্রকাশ্যে এনেছে দেশটি। গত ৫ মে ইস্তাম্বুলে শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক ‘সাহা এক্সপো’-তে উন্মোচিত এই দানবীয় সমরাস্ত্রের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইয়িলদিরিমহান’ (Yildirimhan)—যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘বজ্রের অধিপতি’।
ইতিহাস ও আধুনিকতার যুগলবন্দি
অস্ত্রটির বাহ্যিক নকশায় তুরস্কের শেকড় এবং আধুনিক রূপকারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে। এর গায়ে যেমন খোদাই করা আছে প্রতাপশালী অটোমান সুলতান প্রথম বায়েজিদের মনোগ্রাম, তেমনি ঠিক উপরের অংশে জায়গা করে নিয়েছে আধুনিক তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের প্রতীক। তুর্কি ভাষায় ‘ইয়িলদিরিম’ মানে বজ্র। সেই হিসেবে এই তরল জ্বালানিচালিত ক্ষেপণাস্ত্র যেন তুরস্কের সামরিক ভাণ্ডারের নতুন ‘বজ্রের অধিপতি’।
কী আছে এই ‘বজ্রের অধিপতি’তে?
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এর পুরো কারিগরি ডেটাবেস এখনো জনসমক্ষে আনেনি। তবে প্রদর্শনী থেকে পাওয়া তথ্যগুলো সামরিক বিশ্লেষকদের চমকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
গতি ও ইঞ্জিন: এতে চারটি শক্তিশালী রকেট ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে। এটি হাইপারসনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া সমৃদ্ধ, যা শব্দের গতির প্রায় ২৫ গুণ বেশি বেগে ছুটে গিয়ে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে পারে।
জ্বালানি ও পাল্লা: তরল নাইট্রোজেন টেট্রঅক্সাইড দিয়ে চালিত এটিই তুরস্কের প্রথম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াসির গুলের নিশ্চিত করেছেন, এটি তাদের তৈরি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দূরপাল্লার অস্ত্র, যার সর্বোচ্চ পাল্লা প্রায় ছয় হাজার কিলোমিটার।
প্রতিরক্ষা শিল্পে তুরস্কের লাফ
গত কয়েক বছর ধরেই সামরিক ড্রোন এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে গোটা বিশ্বের নজর কাড়ছে আঙ্কারা। এর আগে গত বছরের জুলাইয়ে তারা ১০ মিটার দীর্ঘ ও প্রায় ৭ হাজার ২০০ কেজি ওজনের ‘টাইফুন ব্লক-ফোর’ নামের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্মোচন করেছিল, যার সম্ভাব্য পাল্লা ধরা হয়েছিল প্রায় এক হাজার কিলোমিটার। এছাড়া রকেটসানের তৈরি ‘জাংক’ নামের দুই হাজার কিলোমিটার পাল্লার আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্রের কথাও শোনা যায়। তবে ‘ইয়িলদিরিমহান’ সেই সব অতীত রেকর্ড ভেঙে তুরস্কের সামরিক সক্ষমতাকে এক লাফে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক সমীকরণ ও আইসিবিএম এলিট ক্লাব
সাধারণত আন্তর্মহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা আইসিবিএম (ICBM) হলো সেসব বিধ্বংসী অস্ত্র, যা ৫ হাজার ৫০০ থেকে ১০ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্বে আঘাত হানতে পারে। এগুলো একটিমাত্র ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে একাধিক ওয়ারহেড বহন করে ভিন্ন ভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে পারমাণবিক বা প্রচলিত বিস্ফোরক হামলা চালাতে সক্ষম।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো পরাশক্তিগুলোর হাতে এই অস্ত্রের বড় মজুদ রয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ভারত, উত্তর কোরিয়া, ইসরায়েল ও ইরানের হাতেও সীমিত পর্যায়ে এই প্রযুক্তি আছে। ‘ইয়িলদিরিমহান’ তৈরির মাধ্যমে তুরস্ক এখন এই এলিট ক্লাবে নিজেদের নাম লেখাল।
দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও রপ্তানিতে বেশ কিছু আন্তর্জাতিক চুক্তি ও আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, বৈশ্বিক নজরদারি ও নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কৌশল হিসেবে তুরস্ক হয়তো এই ক্ষেপণাস্ত্রের প্রকৃত সক্ষমতা ও পাল্লার চেয়ে কিছুটা কমিয়ে তথ্য প্রকাশ করেছে। বাস্তবে এই ‘বজ্রের অধিপতি’র ধ্বংসক্ষমতা আরও বিশাল হতে পারে।