রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং যানজট নিরসনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। এখন থেকে গভীর রাতে ফাঁকা রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশ না থাকলেও সংকেত অমান্য করলে বা আইন ভাঙলে নিস্তার মিলবে না। স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ির মালিকের মোবাইলে পৌঁছে যাবে মামলার বার্তা।
গত ১ মে থেকে রাজধানীর শাহবাগ, বিজয় সরণি, কারওয়ান বাজারসহ ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ‘এআই বেজড রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্ট ভায়োলেশন ডিটেকশন সিস্টেম’ চালু হয়েছে। গত বুধবার রাত থেকে এসব ক্যামেরার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা দেওয়া শুরু হয়েছে।
শনাক্তকরণ: মোড়ে মোড়ে বসানো এআই ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী গাড়ির নম্বরপ্লেট শনাক্ত করে। বিআরটিএ-এর ডেটাবেইস থেকে গাড়ির মেয়াদোত্তীর্ণ কাগজপত্রের তথ্যও যাচাই করা হয়।
ভিডিও রেকর্ডিং: স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরাও আইন ভঙ্গকারী বা অবৈধ পার্কিং করা গাড়ির ভিডিও ধারণ করছেন।
মামলা ও বার্তা প্রেরণ: ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ‘ই-ট্রাফিক প্রসিকিউশন সফটওয়্যার’-এর মাধ্যমে মামলা তৈরি করা হচ্ছে। তাৎক্ষণিকভাবে জরিমানার বার্তা গাড়ির মালিকের মোবাইলে চলে যায় এবং কয়েক দিনের মধ্যে মামলার মূল কাগজ নিবন্ধিত ঠিকানায় পৌঁছে যায়।
শাস্তি ও জরিমানা: এসব মামলায় সর্বনিম্ন ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হতে পারে। নির্ধারিত সময়ে জরিমানা পরিশোধ না করলে পরোয়ানাসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সড়কে চলাচলকালে নিচের নিয়মগুলো ভাঙলে এআই ক্যামেরা ও ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে মামলা করা হবে:
ট্রাফিক সংকেত (লাল বাতি) অমান্য করা।
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বা অন্যান্য সড়কে নির্ধারিত সর্বোচ্চ গতিসীমার চেয়ে বেশি গতিতে গাড়ি চালানো।
যেখানে-সেখানে বা অবৈধভাবে পার্কিং করা।
উল্টো পথে (রং রুটে) গাড়ি চালানো।
হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো এবং অতিরিক্ত যাত্রী বহন।
গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার।
সিটবেল্ট ছাড়া গাড়ি চালানো।
জেব্রা ক্রসিং দখল এবং অনুমতি ছাড়া ভিআইপি লাইট ব্যবহার।
প্রযুক্তিনির্ভর এই নজরদারির ফলে সড়কে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের মতে:
২৪ সাল পর্যন্ত রাজধানীতে যানবাহনের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ৫ কিলোমিটার, যা বর্তমানে বেড়ে প্রায় ১০ কিলোমিটারে উন্নীত হয়েছে।
গত তিন মাসে শুধু ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রায় ১২ হাজার মামলা করা হয়েছে।
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে শুরুতে প্রতিদিন অতিরিক্ত গতির জন্য ৩০০টির বেশি মামলা হলেও, চালকরা সচেতন হওয়ায় তা এখন দিনে ৩০টির মতোতে নেমে এসেছে।
শিগগিরই ৩০০ ফিট এক্সপ্রেসওয়ে এবং বনানী-টঙ্গী সড়কেও গতি পরিমাপক ক্যামেরা বসানোর প্রস্তুতি চলছে।
প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে কিছু প্রতারক চক্র ট্রাফিক মামলার নামে ফোন করে টাকা দাবি করছে। এ বিষয়ে ডিএমপি সতর্ক করে জানিয়েছে, ট্রাফিক মামলার কোনো জরিমানা ব্যক্তিগতভাবে কাউকে দেওয়া যাবে না। নির্ধারিত সরকারি পদ্ধতিতেই জরিমানার অর্থ পরিশোধ করতে হবে।
আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির জানিয়েছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই ব্যবহারের ফলে দ্রুত অপরাধী শনাক্ত করা সম্ভব হবে, যা সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দুর্ঘটনা কমাতেও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
সূত্র: আজকের কাগজ