জীবিকার সন্ধানে দূর প্রবাসে পাড়ি জমানো আরও এক বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধার রক্তে রঞ্জিত হলো দক্ষিণ আফ্রিকার মাটি। দেশটির নিউক্যাসল শহরে দিনের আলোতে প্রকাশ্যে গাড়ির ভেতর সুমন (৩৫) নামের এক বাংলাদেশি যুবককে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করেছে অজ্ঞাত সন্ত্রাসীরা। শনিবার (৯ মে) বিকেলের এই মর্মান্তিক ঘটনায় নিহতের নিজ এলাকা টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে নেমে এসেছে শোকের গভীর ছায়া। স্ত্রী ও দুই বছরের অবুঝ সন্তানকে দেশে রেখে যাওয়া এই যুবকের মৃত্যুতে প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় প্রবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, শনিবার বিকেলে সুমন দক্ষিণ আফ্রিকার নিউক্যাসল শহরে নিজের গাড়িতে অবস্থান করছিলেন। এ সময় হঠাৎ একদল অজ্ঞাত সশস্ত্র দুর্বৃত্ত তার গাড়িটি লক্ষ্য করে অতর্কিত গুলি চালাতে শুরু করে। গাড়ির ভেতরে থাকা অবস্থায় সুমন একাধিক গুলিবিদ্ধ হন এবং আত্মরক্ষার কোনো সুযোগ না পেয়ে ঘটনাস্থলেই তার মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। দুর্বৃত্তরা গুলি চালানোর পরপরই দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
নিহত সুমন টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার বাঁশতৈল ইউনিয়নের অভিরামপুর গ্রামের মো. মইজ উদ্দিনের ছেলে। পরিবারে সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় দীর্ঘ সময় ধরে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থান করছিলেন এবং সেখানে একটি নিজস্ব ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মাত্র তিন বছর আগে তিনি দেশে ফিরে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তার দুই বছর বয়সী ফুটফুটে একটি সন্তান রয়েছে। স্ত্রী ও সন্তানকে দেশে রেখে তিনি পুনরায় দক্ষিণ আফ্রিকায় ফিরে যান নিজের ব্যবসা সামলাতে। শনিবার রাতে মৃত্যুর দুঃসংবাদটি গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে পরিবারের সদস্যদের কান্নায় এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। স্বামী হারিয়ে স্ত্রী এবং সন্তান হারানো পিতা-মাতার আহাজারিতে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
কী কারণে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটল, তা এখনো সম্পূর্ণ অজানা। সুমনের সাথে স্থানীয় কারও ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ছিল কি না, নাকি এটি নিছকই ছিনতাই বা ডাকাতির উদ্দেশ্য সংঘটিত কোনো ঘটনা—তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইতোমধ্যে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শুরু করেছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়নি।
ঘটনার খবর পাওয়ার পর দেশ থেকেও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের খবরটি জানার পর পরই তারা নিহতের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। পরিবার যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনি প্রক্রিয়া শেষে সুমনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশি প্রবাসীদের ওপর হামলা, খুন ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে লুটপাটের ঘটনা নতুন নয়। গত কয়েক বছরে বহু বাংলাদেশি সেখানে সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। সুমনের এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত হাজারো বাংলাদেশি প্রবাসীর মধ্যে আবারও চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রবাসীদের দাবি, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থানরত রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।