রাজধানীর বুকে গভীর রাতে খালি সড়ক যেন পরিণত হয়েছে এক ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদে। দিনের বেলার যানজট পেরিয়ে রাতে যখন রাস্তা ফাঁকা হয়, তখন বেপরোয়া গতির প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে কিছু ঘাতক যান। আর সেই গতির শিকার হয়ে এবার প্রাণ হারালেন মো. নুর আলম (৩২) নামের এক অদম্য পোশাকশ্রমিক। সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে ঘরে ফেরার পথে রাজধানীর উত্তরায় দ্রুতগামী একটি গাড়ির ধাক্কায় মর্মান্তিকভাবে নিহত হয়েছেন তিনি।
শনিবার (৯ মে) দিবাগত রাতে এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনাটি ঘটে, যা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এই মেহনতি মানুষদের জীবনের চরম নিরাপত্তাহীনতাকেই আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, শনিবার দিবাগত রাত আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে দুর্ঘটনাটি ঘটে রাজধানীর উত্তরার আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) হেডকোয়ার্টার্সের সামনের মূল সড়কে। নিহত নুর আলম একটি সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন। রাতের শিফটে ডিউটি শেষ করে ক্লান্ত শরীরে নিজের বাসায় ফিরছিলেন তিনি। এপিবিএন হেডকোয়ার্টার্সের সামনের রাস্তা পার হওয়ার সময় হঠাৎ অন্ধকার ফুঁড়ে আসা একটি দ্রুতগামী অজ্ঞাত গাড়ি তাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।
গুরুতর আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় নুর আলমকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকলে উন্নত চিকিৎসার আশায় রাতেই তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে আনার পর রবিবার (১০ মে) ভোর ৪টার দিকে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নুর আলমের এই আকস্মিক মৃত্যুতে তার পরিবারে চলছে শোকের মাতম। যে মানুষটি পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে দিনরাত মেশিনের শব্দে জীবন পার করতেন, তার এমন রক্তাক্ত বিদায়ে বাকরুদ্ধ স্বজনেরা।
নিহতের ভাই মো. কাসিম মিয়া কাঁদতে কাঁদতে জানান, “আমার ভাইটা সোয়েটার ফ্যাক্টরিতে কাজ করত। সারাদিন কাজ শেষে রাতে একটু বিশ্রামের জন্য বাসায় ফিরছিল। রাস্তা পার হওয়ার সময় ওই রাক্ষুসে গাড়িটা আমার ভাইকে ধাক্কা দিয়ে চলে গেল। খবর পেয়ে আমরা ছুটে গিয়েছিলাম। ভাইকে বাঁচাতে অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু ঢাকা মেডিকেলে আনার পর ডাক্তার বললেন ভাই আর নেই।”
তিনি আরও জানান:
গ্রামের বাড়ি: মাদারীপুর জেলার শিবচর থানাধীন মোল্লাকান্দি এলাকায় তাদের পৈতৃক নিবাস।
বর্তমান ঠিকানা: জীবিকার তাগিদে নুর আলম বর্তমানে উত্তরার একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (পরিদর্শক) মো. ফারুক এই মর্মান্তিক মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান:
নুর আলমের মৃতদেহ বর্তমানে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে।
আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য বিষয়টি এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে (উত্তরা থানা) আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত করা হয়েছে।
ঘাতক গাড়ি ও এর চালককে শনাক্ত করতে পুলিশ আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে।
বিশ্লেষক ও সচেতন নাগরিকদের মতে, এই দুর্ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাজধানীর সড়কগুলোতে রাতের বেলায় ট্রাফিক পুলিশের নজরদারি কম থাকার সুযোগে ভারী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান এবং প্রাইভেটকারগুলো চরম বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে। বিশেষ করে পোশাকশ্রমিক, নৈশপ্রহরী বা খেটে খাওয়া মানুষেরা যারা গভীর রাতে বা ভোরে কর্মস্থল থেকে ফেরেন, তারাই সবচেয়ে বেশি এই গতির শিকার হন।
দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত এই মেহনতি মানুষদের জন্য নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। ঘাতক চালককে দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন নিহতের পরিবার ও সহকর্মীরা।