শেয়ারবাজার নামের এই অদ্ভুত মঞ্চটি আমাদের দেশে বহুদিন ধরেই আছে। কিন্তু এর নাট্যকার কে আর কুশীলব বা অভিনেতা কে, সেটা বোঝা প্রায় দায়। প্রায় পাঁচ দশক বয়সী এই বাজারের মুখে যেমন হাসি আছে, তেমনি আছে চোখের জল। বিশেষ করে ১৯৯৬ এবং ২০১০ সালের ধস শেয়ারবাজারের ইতিহাসে কেবল অর্থনৈতিক ঘটনা নয়, এগুলো বহু পরিবারের সংসার ভাঙা আর দীর্ঘশ্বাসের আর্থিক উপাখ্যান। অতিরিক্ত জল্পনাকল্পনার রথ যখন ছুটেছিল, তখন মনে হয়েছিল স্বর্গের সিঁড়ি বোধহয় মতিঝিলই নেমেছে। তারপর হঠাৎ এমন ভয়াবহ দরপতন হলো যে মানুষের পথে বসার উপক্রম হলো। আসলে শেয়ারবাজারের কাজ খুব মহৎ—সঞ্চয়কে বিনিয়োগে পরিণত করা, উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানে অর্থ জোগানো এবং নাগরিককে দীর্ঘমেয়াদে সম্পদ গড়ার সুযোগ দেওয়া। এটি অর্থনীতির অন্যতম সভ্য কাজ। কিন্তু আমাদের দেশের বহু সাধারণ বিনিয়োগকারীর কাছে শেয়ারবাজার মানেই সর্বস্বান্ত হওয়ার কারণ। বাংলাদেশে অতীতের সংকটগুলো নিছক কোনো বাজার চক্র ছিল না। শেয়ারের দাম মৌলিক ভিত্তির অনেক ওপরে উঠে ধসে পড়েছিল, যার সঙ্গে জড়িত ছিল বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং তদারকির চরম ব্যর্থতা।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখন মূলত খুচরা বা ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারী নির্ভর, যা যেকোনো সুস্থ বাজারের প্রাণ—এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সমস্যা হয় তখনই, যখন বাজারে পেনশন ফান্ড, বিমা কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অভাব থাকে। তখন বাজার আর কোম্পানির সঠিক মূল্যায়নে চলে না, চলে কানাঘুষায়। খুচরা বিনিয়োগকারীরা বাজারে ঢোকেন তখন, যখন দাম থাকে আকাশে। আর বেশি তথ্যসমৃদ্ধ বড় খেলোয়াড়েরা ঠিক তখনই মুনাফা তুলে বেরিয়ে যান। পরে দরপতনে কম দামে তারা আবার ফিরে আসেন। অর্থাৎ, একদল লোক ঢোল পিটিয়ে বাজার ফোলান, আর এর ফলে কম জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের সঞ্চয় ধীরে ধীরে বেশি প্রস্তুত মানুষের পকেটে চলে যায়। এটাকে বাজারের ভাষায় বলা হয় লেনদেন, আর সাধারণ মানুষের ভাষায় বলা যায়, ‘আমার টাকাটা গেল কোথায়?’
দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ থেকে বলা যায়, আমাদের বাজারের সব কোম্পানির আয় কত, নগদ প্রবাহ কেমন, সুশাসন আছে কি না বা শিল্পখাতের ভবিষ্যৎ কী—এসব দেখার ধৈর্য বা অভ্যাস অনেকের নেই। অনানুষ্ঠানিক পরামর্শ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন গুজব—এই তিন মহারাজের ইশারাতেই এখানে লেনদেন চলে। অথচ মৌলিক বিশ্লেষণের অভাবেই উন্নত বাজারগুলো পেশাদার মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভর করে। মিউচুয়াল ফান্ড, পেনশন ব্যবস্থাপক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা লাইসেন্সপ্রাপ্ত পরামর্শক—তারা সাধারণ মানুষের সঞ্চয়কে বৈচিত্র্যময় ও পেশাদার বিনিয়োগে চালিত করে। আমাদের বাজারের আরেকটি পুরোনো অসুখ হলো নিম্নমানের তালিকাভুক্ত কোম্পানি। এমন প্রতিষ্ঠান আছে যারা দুর্বল তথ্য প্রকাশ করে, নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করে না, বছরের পর বছর লভ্যাংশ দেয় না এবং যাদের ব্যবসা প্রায় নেই বললেই চলে; তবু দিব্যি তারা তালিকাভুক্ত থাকে। এই ধরনের কোম্পানি যতদিন বাজারে থাকে, ততদিন তারা জল্পনাকল্পনার উর্বর জমি হয়ে থাকে। বিশেষ করে কম মূলধনি আর কম ফ্রি-ফ্লোট শেয়ার হলে তো কথাই নেই। দাম বাড়ানো সহজ, নিয়ন্ত্রণ করা সহজ, আর ‘পাম্প অ্যান্ড ডাম্প’ কারসাজিতে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলা আরও সহজ।
মিউচুয়াল ফান্ড খাতের সুশাসনের ঘাটতিও জনগণের আস্থাকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তবে আশার কথা হলো, নতুন কিছু সম্পদ ব্যবস্থাপক তুলনামূলকভাবে ভালো পেশাদারি, উন্নত কমপ্লায়েন্স এবং তথ্য প্রকাশের দৃষ্টান্ত দেখাচ্ছেন। প্রতিবেশী ভারতে সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান (এসআইপি) এবং মিউচুয়াল ফান্ড দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রিত খুচরা অংশগ্রহণ বাড়াতে সাহায্য করেছে। বাংলাদেশও তা পারে, যদি সক্ষমতা আর সুশাসনকে শখের অলংকার না বানিয়ে কঠোর নিয়মে পরিণত করা যায়। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সর্বপ্রথম তালিকাভুক্ত কোম্পানির মানোন্নয়ন অপরিহার্য। যারা বছরের পর বছর অনিয়ম করে, দুর্বল কার্যক্রম চালায়, শেয়ারধারীদের রিটার্ন দিতে ব্যর্থ হয় এবং তালিকাভুক্তির মূল উদ্দেশ্য পূরণ করে না—তাদের পুনর্গঠন, একীভূতকরণ অথবা ন্যায্য রূপান্তরকাল শেষে বাজার থেকে বের করে দেওয়ার (ডিলিস্টিং) ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি নজরদারি ও আইন প্রয়োগ জোরদার করতে হবে। সাময়িকভাবে বিনিয়োগকারীকে ঠকিয়ে লাভ করা কোনো প্রকৃত ব্যবসা নয়, দীর্ঘমেয়াদে আস্থা অর্জন করাই আসল ব্যবসা। কারণ, যতদিন বিনিয়োগকারী থাকে, ততদিন বাজার থাকে এবং তবেই ব্রোকারেজ হাউসগুলোর ব্যবসাও টিকে থাকে।
মিউচুয়াল ফান্ড খাতেও পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। মাসিক পারফরম্যান্স, পোর্টফোলিও বণ্টন, ফি, ঐতিহাসিক রিটার্ন এবং প্রকৃত সম্পদ মূল্য (এনএভি) নিয়মিতভাবে ওয়েবসাইট ও এক্সচেঞ্জে প্রকাশ করা উচিত। এর পাশাপাশি বিনিয়োগকারীর শেয়ারবাজার জ্ঞান অপরিহার্য। মানুষকে শিখতে হবে কীভাবে পোর্টফোলিওতে বৈচিত্র্য আনতে হয়, শেয়ারের মূল্যায়ন করতে হয়, ঝুঁকি বুঝতে হয় এবং বিনিয়োগ ও জল্পনার পার্থক্য করতে হয়। সচেতন বিনিয়োগকারী ছাড়া সুস্থ বাজার হয় না। এর জন্য একটি নির্ভরযোগ্য শেয়ার বিশ্লেষণ প্ল্যাটফর্ম দরকার, যেখানে কোম্পানির মৌলিক তথ্য, আর্থিক অনুপাত এবং লভ্যাংশের ইতিহাস স্বচ্ছ পদ্ধতিতে থাকবে। এতে গুজবের বাজার ছোট হবে এবং গবেষণার বাজার বড় হবে।
সবশেষে বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। শেয়ারবাজারে ঝুঁকি থাকবেই, তবে বিনিয়োগ মানেই হলো বিশ্লেষণ, শৃঙ্খলা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রত্যাশার ভিত্তিতে মূলধন বরাদ্দ করা। বহু পরিবারের জন্য বাজারে ক্ষতি শুধু স্ক্রিনে ভেসে ওঠা লাল রঙের সংখ্যা নয়, তা বহু বছরের কষ্টার্জিত সঞ্চয় হারিয়ে যাওয়ার হাহাকার। বাংলাদেশের নাগরিকরা এমন একটি বাজারের অধিকার রাখেন, যেখানে ন্যায্যতা থাকবে, স্বচ্ছতা থাকবে এবং পূর্ণ আস্থা থাকবে। আমরা আর একটি গুজবনির্ভর সাময়িক উত্থান চাই না। আমরা চাই এমন একটি বিশ্বাসযোগ্য পুঁজিবাজার, যেখানে ভালো কোম্পানি অর্থ তুলতে আগ্রহী হবে। নইলে যা হয়, তা তো আমরা বহুবার দেখেছি—হাট বসে, ঢাক বাজে, মুনাফার গল্প ছড়ায়; আর শেষে দেখা যায়, গরু বেচে যে টাকা নিয়ে মানুষ বাজারে এসেছিল, সে টাকাই বাজার গিলে খেয়েছে!
তথ্যসূত্র: দ্যা প্রেস ২৪