• সোমবার, ১১ মে ২০২৬, ০৫:১৯ অপরাহ্ন
Headline
মেধাবীদের ১০টি সিক্রেট নেপথ্যের অনুচ্চারিত নায়িকারা… বিশ্ব মানবাধিকার সম্মেলনে যোগ দিতে দক্ষিণ কোরিয়া গেলেন এনসিপি মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বাংলাদেশ কেন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলেনি: কারণ খতিয়ে দেখতে মন্ত্রণালয়ের কমিটি গঠন তরুণীর গোপন গেমিং জীবন ও স্বপ্ন পূরণের গল্প নিয়ে মাইক্রো ড্রামা ‘সিলভার সাদিয়া’ গর্ভের সন্তান ছেলে না মেয়ে, তা প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি: হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ প্রতিটি মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়তে রাষ্ট্র হবে সহায়ক শক্তি: ডা. জুবাইদা রহমান সরকার বা পদ কোনোটিই চিরস্থায়ী নয়: পুলিশ সপ্তাহে পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার কড়া বার্তা প্রধানমন্ত্রীর পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশের সক্ষমতা বাড়ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব: আক্রান্ত ছাড়াল ৫০ হাজার, মৃত্যু ৪১৫

রাজনীতিতে মমতার প্রত্যাবর্তন কি আদৌ সম্ভব?

Reporter Name / ২ Time View
Update : সোমবার, ১১ মে, ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন দিন খুব কমই এসেছে, যেখানে নাটকীয়তা আর মহাকাব্যিক পরিহাস একই বিন্দুতে এসে মিলেছে। যেদিন কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উপস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছিলেন একসময়ের তৃণমূল নেতা শুভেন্দু অধিকারী, ঠিক সেদিন বিকেলেই সেখান থেকে মাত্র দু-তিন মাইল দূরে হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের বাসভবনে দাঁড়িয়ে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এমন এক বিবৃতি দিলেন, যা রাজ্য রাজনীতির সমীকরণকে সম্পূর্ণ নতুন আলোয় দাঁড় করিয়েছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি দেশের ‘বাম, অতিবাম ও জাতীয় শক্তিগুলোকে’ তাঁর সঙ্গে একজোট হওয়ার আহ্বান জানালেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বললেন, বিজেপির বিরুদ্ধে এখন সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং ‘শত্রুর শত্রুকেই বন্ধু’ হিসেবে গ্রহণ করতে তিনি প্রস্তুত। এমনকি, আলোচনার পথ খোলা রেখে তাঁর বাড়িতে কখন সাক্ষাৎ করা যাবে, সেই সময়সূচিও তিনি জানিয়ে দিলেন। এই ঘটনাকে শেক্সপিয়রের কোনো বিয়োগান্তক নাটক বা ট্র্যাজেডির সঙ্গে তুলনা করা অমূলক হবে না। কারণ, যে নেত্রী একসময় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রায় পুরোটাই ব্যয় করেছেন বামপন্থীদের বিরোধিতায়, আজ অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে তিনিই সেই বামপন্থীদের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন! বামপন্থী দলগুলো সেই প্রস্তাব তাৎক্ষণিকভাবে খারিজ করে দিলেও, এই ঘটনা স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, নির্বাচনী বিপর্যয়ের তীব্র ধাক্কা সামলে উঠে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিন্তু একাত্তর বছর বয়সে, বিজেপির এই প্রবল দাপটের মুখে তাঁর এই ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা কতটা বাস্তবসম্মত, নাকি মমতা এবং তাঁর নিজের হাতে গড়া তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক সমাপ্তি বা ‘পলিটিক্যাল অবিচুয়ারি’ লেখার সময় উপস্থিত—তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে গভীর বিশ্লেষণ।


বৃত্তের সমাপ্তি: পরিবর্তনের রূপকার থেকে ক্ষমতার বাইরে

২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের একনাগাড়ে চৌত্রিশ বছরের লৌহকঠিন শাসনের অবসান ঘটিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস যখন প্রথমবারের মতো রাজ্যের শাসনক্ষমতা দখল করে, তখন তা গোটা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল। সিপিআইএম-এর নেতৃত্বাধীন সেই বামফ্রন্ট সরকারের আমলে শাসক দলের একচ্ছত্র প্রভাব রাজ্যের সমাজ, রাজনীতি, প্রশাসন থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি রন্ধ্রে এমনভাবে প্রবেশ করেছিল যে, তাদের ক্ষমতাচ্যুত করা কার্যত অসম্ভব বলে মনে করা হতো। কিন্তু মাত্র দশ-বারো বছরের পুরোনো একটি রাজনৈতিক দল নিয়ে, প্রায় একক প্রচেষ্টায় এবং অদম্য জেদের ওপর ভর করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেই অসাধ্য সাধন করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ থেকে বামপন্থীদের হঠাতে পারাটাই তাঁর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন হিসেবে গণ্য হয়।

অথচ ইতিহাসের কী অদ্ভুত পুনরাবৃত্তি! সেই ঘটনার ঠিক পনেরো বছরের মাথায় আজ তাঁকে নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সেই ‘লেফট’ বা ‘আলট্রা লেফট’-দের কাছেই ধরনা দিতে হচ্ছে। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের পরিক্রমা যেন একটি সম্পূর্ণ বৃত্ত রচনা করে আবার সেই শুরুর বিন্দুতেই ফিরে এসেছে।


লড়াকু উত্থান: সংসদীয় রাজনীতির দীর্ঘ ও কণ্টককীর্ণ পথ

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক উল্কাপিণ্ড নন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন পঞ্চাশ বছরেরও বেশি পুরোনো। কলকাতার যোগমায়া দেবী কলেজের সাধারণ ছাত্রী সংগঠন থেকে শুরু করে কংগ্রেসের রাজনীতির মাধ্যমে তাঁর হাতেখড়ি। পার্লামেন্ট এবং বিধানসভা মিলিয়ে সংসদীয় রাজনীতিতে তাঁর বিচরণ প্রায় বিয়াল্লিশ বছরের।

১৯৭৬ সালে, মাত্র একুশ বছর বয়সে তিনি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মহিলা কংগ্রেস (আই)-এর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এর কয়েক বছর পরই তিনি নিখিল ভারত যুব কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব লাভ করেন। তাঁর রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক ছিল তাঁর প্রচণ্ড লড়াকু মানসিকতা এবং অক্লান্ত পরিশ্রম করার ক্ষমতা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতার যাত্রাপথ কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। ২০০১ সালের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর তৃণমূল কংগ্রেস যখন প্রায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, তখন অনেকেই তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু তিনি ফিনিক্স পাখির মতো আবার ভস্ম থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন, দলকে একেবারে তৃণমূল স্তর থেকে পুনর্গঠিত করেছিলেন।

তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে জাতীয় স্তরের রাজনীতিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচন। সেবার কলকাতার যাদবপুর আসনে ভারতের প্রবীণ ও দুঁদে কমিউনিস্ট নেতা সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হারিয়ে তিনি চমকে দিয়েছিলেন গোটা দেশকে। ভারতের কনিষ্ঠতম পার্লামেন্ট সদস্যদের একজন হিসেবে তিনি জায়গা করে নিয়েছিলেন লোকসভায়। ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর কংগ্রেস দেশজুড়ে বিপুল সহানুভূতি ভোট পেলেও, যাদবপুরের মতো দুর্ভেদ্য বাম ঘাঁটিতে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েট নেতার একজন আনকোরা তরুণীর কাছে পরাজয় ছিল পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী ঘটনা।

সেই শুরু, এরপর আর তাঁকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৮৯ সালে কংগ্রেস-বিরোধী হাওয়ায় যাদবপুর আসনে হারলেও, ১৯৯১ সালে কলকাতা দক্ষিণ আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে তিনি আবারও লোকসভায় ফিরে আসেন এবং এরপর আরও পাঁচবার লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে পি ভি নরসিমা রাওয়ের মন্ত্রিসভায় প্রথম কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রমন্ত্রী হন তিনি। এরপর ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে গঠন করেন তৃণমূল কংগ্রেস এবং ১৯৯৯ সালে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের অংশ হয়ে রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। লোকসভার সদস্য থাকাকালীন তাঁর লড়াকু এবং প্রতিবাদী সত্তার বারবার প্রকাশ ঘটেছে—কখনো নিজের দলের বিরুদ্ধে সিপিআইএমকে সহায়তার অভিযোগ এনে, কখনো পেট্রোলিয়াম মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে পার্লামেন্ট চত্বরে অবস্থান নিয়ে, আবার কখনো পশ্চিমবঙ্গের প্রতি কেন্দ্রের বঞ্চনার প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে তৎকালীন রেলমন্ত্রীর দিকে শাল ছুঁড়ে মেরে।


সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম: রাজপথের আন্দোলন এবং ক্ষমতার মসনদ

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল ২০০৫-পরবর্তী সময়ের জমি আন্দোলন। বামফ্রন্ট সরকারের আমলে শিল্পায়নের জন্য কৃষিজমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত রাজ্যে ব্যাপক গণঅসন্তোষের জন্ম দেয়। বিশেষ করে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে কৃষিজমি রক্ষার দাবিতে গড়ে ওঠা স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে রাজ্যের প্রধান বিরোধী মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। নন্দীগ্রামে আন্দোলনরত কৃষকদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে অন্তত ১৪ জনের প্রাণহানির ঘটনা বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে জনরোষকে চরমে পৌঁছে দেয়।

নন্দীগ্রাম এবং সিঙ্গুরের এই আন্দোলনই তাঁকে শহুরে রাজনীতির গণ্ডি পার করে গ্রামীণ বাংলার খেটে খাওয়া মানুষের একেবারে কাছে পৌঁছে দিয়েছিল। শুরুতে তাঁর স্লোগান ছিল শুধু ‘বামফ্রন্ট হটাও’, কিন্তু জমি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তিনি সাধারণ কৃষক ও খেটে খাওয়া মানুষের মনের ভেতরে একটি দৃঢ় রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হন। এর ফলস্বরূপ ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বামফ্রন্টকে পেছনে ফেলে তৃণমূল কংগ্রেস অভাবনীয় সাফল্য লাভ করে এবং অবশেষে ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শপথ নেন পশ্চিমবঙ্গের প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এবং এরপর ২০১৬ ও ২০২১ সালেও নিরবচ্ছিন্ন বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তিনি শাসনভার পরিচালনা করেন।


শাসক মমতা বনাম বিরোধী নেত্রী মমতা

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনকে খুব স্পষ্ট দুটি পর্বে ভাগ করা যায়। প্রথম পর্বটি হলো শুরু থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত, যেখানে তিনি একজন আপসহীন ও প্রবল বিরোধী নেত্রীর ভূমিকায় অবতীর্ণ ছিলেন। আর দ্বিতীয় পর্বটি হলো ২০১১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত, যেখানে তিনি ছিলেন প্রশাসনের শীর্ষতম পদে আসীন এক সর্বময় ক্ষমতাসম্পন্ন মুখ্যমন্ত্রী।

দুঃখজনকভাবে, এই পনেরো বছরের শাসনামল তাঁকে এবং তাঁর দলকে চরম দুর্নীতি ও ব্যর্থতার অভিযোগে জর্জরিত করেছে। একসময় তাঁর সাদামাটা জীবনযাপন, সুতির শাড়ি আর নীল-সাদা হাওয়াই চটি ছিল সততার সমার্থক। মানুষের মনে তাঁর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ছিল। কিন্তু ক্ষমতার অলিন্দে বসার পর সেই ভাবমূর্তিতে কালিমালিপ্ত হয়েছে। দুর্নীতির দায়ে দলের একের পর এক শীর্ষ নেতা গ্রেপ্তার হওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রীকে প্রকাশ্য জনসভায় অভিমান আর উৎকণ্ঠার সুরে বলতে শোনা গেছে, “ভুল করলে আমায় চড় মারবেন, কিছু মনে করব না। বললে বাড়িতে গিয়ে বাসনও মেজে দিয়ে আসব। কিন্তু দয়া করে চোর বলবেন না, মিথ্যে বদনাম দেবেন না!”

তবে শুধু দুর্নীতি নয়, প্রশাসনিক স্তরেও চরম ব্যর্থতার অভিযোগ তুলেছেন বিরোধীরা। বিজেপি ও সিপিআইএম সমস্বরে দাবি করেছে যে, গত পনেরো বছরে রাজ্যে কোনো বড় শিল্প বা বিনিয়োগ আসেনি, কর্মসংস্থান তলানিতে ঠেকেছে এবং মেধাবী তরুণরা কাজের সন্ধানে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিতে বাধ্য হয়েছে। বিরোধীদের কটাক্ষ, মুখ্যমন্ত্রী শিল্পায়নের বদলে কেবল ‘ধূপকাঠি’ বা ‘তেলেভাজা’ শিল্পকে উৎসাহ দিয়েছেন।

প্রবীণ ও প্রয়াত বামপন্থী নেতা শ্যামল চক্রবর্তী একবার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি মন্তব্য করেছিলেন। সাহিত্যিক সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিখ্যাত উক্তি “বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে”—এর সূত্র ধরে তিনি বলেছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী দলেই সবচেয়ে বেশি মানানসই। রাজপথে সফল আন্দোলনের যে ট্র্যাডিশন তাঁকে বিরোধী নেত্রী হিসেবে সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছিল, প্রশাসকের চেয়ারে বসার পর সেই দক্ষতার অভাবই তাঁকে ধীরে ধীরে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে।


কেন্দ্রীয়করণ ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় ভাটা

পশ্চিমবঙ্গের একটি বড় অংশের মানুষের দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ছিল, তৃণমূল কংগ্রেসের নিচুতলার নেতা-কর্মীরা যতই দুর্নীতিতে যুক্ত থাকুক না কেন, দলের সর্বোচ্চ নেত্রীর গায়ে কোনো দুর্নীতির আঁচ লাগেনি। তাঁর সঙ্গে সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে সমাজের দরিদ্রতম অংশের যে আত্মিক যোগাযোগ বা ‘কানেক্ট’ ছিল, তা সত্যিই বিরল। তিনি তাদের উঠোনে বসে, তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলে তাদের আপন করে নিতে পারতেন।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দলের ভেতরে চরম স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের অভিযোগ উঠতে শুরু করে। দলের সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেন তিনি একাই। একসময় রাজনীতিতে তাঁর অনুগামীরাও স্বীকার করতে বাধ্য হন যে, সংসদীয় গণতন্ত্রের গরিমা তিনি রক্ষা করতে পারেননি। তিনি এমন বার্তাই দিতেন যে, রাজ্যের প্রতিটি কেন্দ্রে তিনিই যেন প্রার্থী, বাকিরা তাঁর ছায়ামাত্র। এর ফলে দলে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র বলে আর কিছু অবশিষ্ট ছিল না। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল অকাট্যভাবে প্রমাণ করে দিয়েছে যে, শুধুমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা বা ভাবমূর্তি দিয়ে দলের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং ব্যর্থতার পাহাড় ঢেকে রাখা আর সম্ভব নয়।


প্রত্যাবর্তনের পথে তিন কঠিন কাঁটা

রাজনৈতিক মহলে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই বিপুল পরাজয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন? তৃণমূল-ঘেঁষা অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, তাঁকে এখনই অপ্রাসঙ্গিক ভেবে বাতিল করে দেওয়া চরম বোকামি হবে। তাঁদের যুক্তি, তৃণমূলের ঝুলিতে এখনও ৪০ শতাংশের বেশি ভোট রয়েছে, আছে ৮০ জন বিধায়ক এবং লোকসভা ও রাজ্যসভা মিলিয়ে ৪২ জন সংসদ সদস্য। রাজনীতি একটি দীর্ঘ ম্যারাথন দৌড়, এখানে প্রণব মুখোপাধ্যায় বা অটলবিহারী বাজপেয়ীর মতো নেতাদের ফিরে আসার ইতিহাস মনে রাখা প্রয়োজন।

তবে অধিকাংশ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক বিশ্বাস করেন, মমতার ঘুরে দাঁড়ানোর পথটি শুধু কঠিন নয়, বরং প্রায় অসম্ভব। তাঁর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে মূলত তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর:

১. দলকে ভাঙন থেকে রক্ষা করা:

পরাজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসের মতো দল, যা মূলত ক্ষমতার আঠায় যুক্ত ছিল, তা টিকিয়ে রাখাই মমতার জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ইতিমধ্যেই দলে ভাঙনের সুর বাজতে শুরু করেছে। অনেকেই মনে করছেন, বিরোধী দল থেকে নেতা ভাঙিয়ে এনে নিজের দলকে শক্তিশালী করার যে অনৈতিক সংস্কৃতি মমতা নিজে শুরু করেছিলেন, এখন ক্ষমতার পালাবদলে তাঁকেই সেই একই বিষের স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। বিজয়ীদের শিবিরে যোগদানের যে ঢল নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা ঠেকাতে তিনি কতটা সফল হবেন, সেটাই দেখার বিষয়।

২. অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ফ্যাক্টর:

মমতার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হিসেবে পরিচিত তাঁর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি দলের ভেতরেই ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। অভিষেকের কর্পোরেট স্টাইলে দল পরিচালনা করা, পেশাদার রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থার হাতে কর্তৃত্ব তুলে দেওয়া এবং সর্বোপরি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ—দলের তৃণমূল স্তরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে চরম দূরত্বের সৃষ্টি করেছে। মমতার জনপ্রিয়তার ধারেকাছেও যে অভিষেক নেই, তা ভোটের ফলেই প্রমাণিত। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর কেন্দ্রীয় ও রাজ্য তদন্তকারী সংস্থাগুলো অভিষেকের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেয় এবং মমতা কীভাবে সেই চাপ সামলান, তা তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের একটি বড় নির্ধারক হবে।

৩. রাজপথের রাজনীতিতে ফেরা ও বয়সের বাধা:

সফল বিরোধী নেত্রী হিসেবে মমতার যে ঈর্ষণীয় ট্র্যাক রেকর্ড রয়েছে, তাঁকে আবার সেই পুরনো পরিচয়েই ফিরে যেতে হবে। নতুন বিজেপি সরকারের কোনো ভুল বা জনবিরোধী পদক্ষেপের জন্য তাঁকে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে এবং সেই ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজপথে শক্তিশালী গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু এখানে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে তাঁর নিজের শরীর ও বয়স। সত্তরোর্ধ্ব এই নেত্রীর পক্ষে আগের মতো কিলোমিটারের পর কিলোমিটার পদযাত্রা করা বা দিনের পর দিন রাস্তায় বসে আন্দোলন করা আর শারীরিক দিক থেকে কতটা সম্ভব, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তাঁর পরিশ্রম করার অসীম ক্ষমতাতেও বয়সের স্বাভাবিক ছাপ পড়তে শুরু করেছে।


পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস বড়ই নির্মম। এখানকার সাধারণ মানুষ কোনো রাজনৈতিক দলকে একবার ক্ষমতা থেকে ছুঁড়ে ফেললে, তাদের আর দ্বিতীয়বার ফিরে আসার সুযোগ দেয় না। কংগ্রেস বা বামফ্রন্টের পরিণতি তার জ্বলন্ত প্রমাণ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি এই ঐতিহাসিক রীতির বিরল ব্যতিক্রম ঘটাতে পারবেন? নাকি এক লড়াকু নেত্রীর রাজনৈতিক অধ্যায়ের এখানেই চিরস্থায়ী যবনিকা পতন ঘটবে?

শত্রুর শত্রু বামপন্থীদের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে তিনি যে মরিয়া চেষ্টা শুরু করেছেন, তা থেকে অন্তত এটুকু স্পষ্ট যে তিনি বিনা যুদ্ধে সহজে জমি ছাড়বেন না। তবে বঙ্গ রাজনীতির এই নতুন ও জটিল সমীকরণে তাঁর ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণভাবে তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, ধৈর্য এবং দলের অভ্যন্তরীণ সংকট মোকাবিলার দক্ষতার ওপরই নির্ভর করছে। আগামী দিনগুলোই বলে দেবে, তিনি কি পুনরায় ফিনিক্স হয়ে উড়বেন, নাকি ইতিহাসের পাতায় কেবল একজন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবেই রয়ে যাবেন।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category