• মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ০২:৪০ অপরাহ্ন
Headline
মার্কিন মুলুকে ‘রক্তস্নানের’ হুঁশিয়ারি কিউবার বিদ্বেষের আগুনে রক্তাক্ত স্যান ডিয়েগো: মসজিদে বন্দুক হামলায় নিহত ৫ নিভৃতে ছড়াচ্ছে এইচআইভি: অবিবাহিত ও সমকামীদের মধ্যে সংক্রমণের উদ্বেগজনক উল্লম্ফন মায়ের দুধের ঘাটতিতেই হামের থাবা: অরক্ষিত শৈশবের চরম মূল্য মানবাধিকার কমিশনের ডানা ছাঁটছে নতুন খসড়া আইন ঠিক এক বছর পর দেশে আর কখনো আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না: হাসনাত আব্দুল্লাহ জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদৎবার্ষিকী: ৭ দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করল বিএনপি ‘নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গালিতে আমরা অভ্যস্ত, এটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য’: সিইসি আমদানি-রফতানি সচল রাখতে ঈদের ছুটিতেও খোলা থাকবে সব কাস্টম হাউস ও শুল্ক স্টেশন

ট্রাম্পের চীন সফর: লাল গালিচার আড়ালে পৃথিবীর দুই বৃহৎ পরাশক্তির স্নায়ুযুদ্ধ

Reporter Name / ৬ Time View
Update : সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬

বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এর সামনে সারি করে দাঁড়িয়ে আছে সামরিক গার্ড। বাতাসে উড়ছে আমেরিকা আর চীনের পতাকা। লাল কার্পেটের ওপর দিয়ে হাঁটছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তাকে উষ্ণ স্বাগত জানাচ্ছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বাইরে থেকে দৃশ্যটা জাঁকজমকপূর্ণ মনে হলেও, এর আড়ালে চলছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দুই ক্ষমতার লড়াই। এই লড়াইয়ের মধ্যে রয়েছে ইরান যুদ্ধের ছায়া, চীনের বিরুদ্ধে মার্কিন শুল্কযুদ্ধ, তাইওয়ান নিয়ে সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং রাশিয়া-চীন ঘনিষ্ঠতার স্নায়ুযুদ্ধ।

মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও চীনের জ্বালানি অর্থনীতি

এখানকার নাটকীয়তার কথা বলার আগে পেছনের একটি বিষয় বলে নেওয়া ভালো। ট্রাম্পের এই বেইজিং সফর হওয়ার কথা ছিল আরও আগে, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে তা পিছিয়ে যায়। আমরা জানি, এই যুদ্ধের অন্যতম পক্ষ হলো ইরান। আর সেই ইরানের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অংশীদার হলো চীন। চীনের বিশাল অর্থনীতি সচল রাখতে যে বিপুল জ্বালানির প্রয়োজন হয়, তার প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগই আসে ইরান থেকে। অন্যদিকে, ইরানের তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই যায় চীনে। কাজেই আমেরিকা যখন ইরানের ওপর সামরিক বা অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে, তখন তা পরোক্ষভাবে চীনের ওপরও বিশাল চাপ সৃষ্টি করে।

মুখে বন্ধু, পেছনে কূটচাল: ট্রাম্পের পরিচিত কৌশল

ট্রাম্পের একটি পরিচিত স্বভাব হলো প্রতিপক্ষকে প্রশংসা করে ঘায়েল করা। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি কিংবা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্পর্কে যেমন প্রশংসা করেন, ঠিক তেমনি তার একসময়ের চরম শত্রু উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনকেও বহুবার ‘স্মার্ট গাই’ বলেছেন। সবাই জানেন, ট্রাম্প মুখে মুখে যতই বন্ধুত্বের কথা বলুন না কেন, সুযোগ বুঝে পেছন থেকে আঘাত করতে তিনি ওস্তাদ।

একটি পুরোনো ঘটনা মনে করিয়ে দিলে বিষয়টি বুঝতে সুবিধা হবে। ২০১৭ সালে ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের প্রথম দেখা হয় ট্রাম্পের ব্যক্তিগত রিসোর্ট মার-এ-লাগোতে। ট্রাম্প পরবর্তীতে স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, “আমরা তখন পৃথিবীর সবচেয়ে সুস্বাদু চকোলেট কেক খাচ্ছিলাম।” সেই কেক খাওয়ার মাঝখানেই ট্রাম্প সিরিয়ায় মিসাইল হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন! এর মাধ্যমে তিনি শি-কে মূলত বোঝাতে চেয়েছিলেন যে আমেরিকাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তি। মজার বিষয় হলো, শি জিনপিং তখন ট্রাম্পের সাথে অত্যন্ত শান্ত আচরণ করেছিলেন এবং কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াই দেখাননি। এর কয়েক মাস পর ট্রাম্প যখন বেইজিংয়ে যান, তখন ছিল চীনের পাল্টা জবাব দেওয়ার পালা। চীন আতিথেয়তার মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছিল, তারা শুধু অর্থনৈতিক পরাশক্তিই নয়, বরং হাজার বছরের সভ্যতার উত্তরাধিকারী—যে সভ্যতা ট্রাম্প যতই চেষ্টা করুন না কেন, কখনো অর্জন করতে পারবেন না।

হরমুজ প্রণালির উত্তেজনা ও বাণিজ্য যুদ্ধ

এবার সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় আসা যাক। কয়েক সপ্তাহ আগে হরমুজ প্রণালিতে একটি জাহাজের ঘটনা নিয়ে মার্কিন মন্তব্যের পর আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ট্রাম্প স্পষ্টভাবে বলেননি ওই জাহাজে কী ছিল, সেটি সামরিক সরঞ্জাম ছিল কি না, বা সত্যিই চীন সরকার এর সাথে সরাসরি জড়িত ছিল কি না। ইসরায়েলি গণমাধ্যমগুলো মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে খবর প্রকাশ করলেও, চীন যথারীতি এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করে।

এই ঘটনাগুলো থেকেই প্রমাণ হয়, ট্রাম্প ও শি জিনপিং প্রকাশ্যে যতই বন্ধুত্বের কথা বলুন না কেন, বাস্তবে দুই দেশ একে অপরের চূড়ান্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মূল কারণ আসলে অর্থনীতি ও বিশ্ববাণিজ্য। ট্রাম্প বারবার অভিযোগ করেছেন— চীন মুদ্রা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আমেরিকার অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলছে, মার্কিন প্রযুক্তি চুরি করে আমেরিকান মেধাস্বত্বকে (Intellectual Property) ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং সস্তা পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে আমেরিকান শিল্পকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

তাইওয়ান ইস্যু: সম্পর্কের মাঝখানে ‘চীনের প্রাচীর’

যদিও এই রাষ্ট্রীয় সফরে এসব বিষয়ে সরাসরি কোনো আলোচনা হচ্ছে না, কিন্তু দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কে এই বিষয়গুলো এখন বিশাল ‘চীনের প্রাচীর’ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চীন তাইওয়ানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ মনে করে, অন্যদিকে আমেরিকা তাইওয়ানকে ক্রমাগত সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা করেই যাচ্ছে। চীনের কাছে এটি তাদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন, আর আমেরিকার কাছে এটি ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার কৌশল। এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক যথার্থই বলেছিলেন, “ট্রাম্প খুব চান শি জিনপিং তাকে পছন্দ করুন, কিন্তু শি-এর এ ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।”

রিফ্লেক্টিং পুল ও বলরুমের খোঁচার রাজনীতি

এবার ট্রাম্পের সেই বিখ্যাত ‘পুল’ আর ‘বলরুম’ নিয়ে খোঁচার কথায় আসা যাক। যারা জানেন না তাদের জন্য বলছি, এই পুলটি হলো আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির একটি কৃত্রিম জলাধার (রিফ্লেক্টিং পুল), যার এক পাশে লিংকন মেমোরিয়াল আর অন্য পাশে ওয়াশিংটন মনুমেন্ট অবস্থিত। ট্রাম্প শি জিনপিংকে সেই পুলে জর্জ ওয়াশিংটনের স্মৃতিস্তম্ভের ছায়া দেখার কথা বলেছিলেন। তবে ট্রাম্প আসল মজাটা করেছিলেন এর পরের লাইনে। তিনি বলেছিলেন, হোয়াইট হাউজের নতুন বলরুমটিতেও তিনি শি জিনপিংকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ‘নির্মাণকাজের ধীরগতির’ জন্য সেটি আর দেখানো যাচ্ছে না। এটি ছিল খুবই ইঙ্গিতপূর্ণ ও তীক্ষ্ণ একটি কথা। শি জিনপিং হোয়াইট হাউজে যাবেন ঠিকই, কিন্তু অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ে ট্রাম্পের এই প্রচ্ছন্ন খোঁচার কথা নিশ্চয়ই তার মনে থাকবে।

সবশেষে বলতে চাই, ট্রাম্পের এই সফরকে শুধু একটি সাধারণ রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে দেখলে ভুল হবে। আমেরিকা আর চীন সরাসরি একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরছে না ঠিকই, কিন্তু এই প্রচ্ছন্ন লড়াইয়ের মধ্যেই তারা একসাথে কেক খাচ্ছেন, লাল গালিচায় হাঁটছেন, আবার একই সঙ্গে পাল্টাপাল্টি শুল্ক (ট্যাক্স) বাড়াচ্ছেন এবং পরস্পরের প্রতিপক্ষকে শক্তিশালী করছেন। কাজেই ট্রাম্পের এই চীন সফর ছিল মূলত নিখুঁত ও অত্যন্ত জটিল একটি কূটনৈতিক চাল।

তথ্যসূত্র: দ্যা প্রেস


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category