• বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ১০:৩৯ অপরাহ্ন
Headline
চল্লিশের পর নারীর সৌন্দর্য ও স্বাস্থ্য রক্ষা: ৮টি পরামর্শ ফাহাদ রহমানের মুকুটে যুক্ত হলো দ্বিতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার নর্ম সায়নীর শিরশ্ছেদের জন্য ১ কোটি রুপি পুরস্কার ঘোষণা, বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ রামিসা হত্যা: দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন জমার আশ্বাস স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোরবানির পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ: কৃষিমন্ত্রী গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে বিতরণ কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব সরকার যতদিন চাইবে, মাঠে থেকে কাজ করবে সেনাবাহিনী: সেনাপ্রধান সরকারি বিদ্যালয় সংকট: ঢাকায় স্বল্পব্যয়ে মাদরাসায় ঝুঁকছে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ইবোলার টিকা আসতে ৯ মাস লাগতে পারে: ডব্লিউএইচও আড়াইহাজারে চাঁদা দাবির জেরে বিএনপি নেতাকে কুপিয়ে হত্যা: স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাসহ আটক ৩

গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষে ঢাকার কড়া বার্তা ও ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ

Reporter Name / ৫ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার সময় ঘনিয়ে এসেছে। আর এই পরীক্ষার নাম ‘পানি’। ৫৪টি অভিন্ন নদীর অববাহিকায় অবস্থিত ভাটির দেশ বাংলাদেশ দশকের পর দশক ধরে উজানের দেশ ভারতের ‘পানি আগ্রাসন’ ও একপাক্ষিক নীতির কারণে চরম ক্ষতির শিকার হয়ে আসছে। তবে পরিস্থিতি এবার ভিন্ন। পানি নিয়ে ভারতকে আর একবিন্দু ছাড় দিতে নারাজ বাংলাদেশ। প্রতি ফোঁটা পানির ন্যায্য হিস্যা বুঝে নিতে শুরু থেকেই তৎপর বর্তমান সরকার। আগামী ডিসেম্বরেই শেষ হতে যাচ্ছে ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ। ঠিক এই ক্রান্তিলগ্নে দিল্লিকে তোয়াক্কা না করে নিজস্ব অর্থায়নে ও সিদ্ধান্তে ‘পদ্মা ব্যারাজ’ নির্মাণের যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়ে ঢাকা বুঝিয়ে দিয়েছে—মাথা নত করে থাকার দিন শেষ।

পানি নিয়ে ভারতের দীর্ঘদিনের আধিপত্য ও আগ্রাসন: কী করে ভারত?

আন্তর্জাতিক আইন ও নদী কনভেনশনের তোয়াক্কা না করে ভারত দীর্ঘদিন ধরে অভিন্ন নদীগুলোর ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে রেখেছে। ভারতের এই পানি রাজনীতির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি, কৃষি ও পরিবেশ আজ চরম হুমকির মুখে। পানি নিয়ে ভারত মূলত কী কী কৌশল অবলম্বন করে, তা নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:

  • শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্যতা ও মরুকরণ: ভারতের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো গঙ্গা নদীর ওপর নির্মিত ফারাক্কা ব্যারাজ এবং তিস্তার ওপর নির্মিত গজলডোবা ব্যারাজ। শুষ্ক মৌসুমে যখন বাংলাদেশের কৃষিকাজের জন্য সবচেয়ে বেশি পানির প্রয়োজন হয়, তখন ভারত এই ব্যারাজগুলোর গেট বন্ধ করে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নেয়। এর ফলে বাংলাদেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়। পদ্মা ও তিস্তা অববাহিকায় পানির অভাবে কৃষকের ফসল নষ্ট হয় এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যায়।

  • বর্ষায় হঠাৎ গেট খুলে অকাল বন্যা: ভারতের পানি নীতির আরেকটি নিষ্ঠুর দিক হলো বর্ষাকালের আচরণ। যখন অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে ভারতের বিহার, পশ্চিমবঙ্গ বা আসামে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়, তখন তারা বাংলাদেশকে কোনো আগাম নোটিশ না দিয়েই ফারাক্কা, গজলডোবা ও ডম্বুর বাঁধসহ অন্যান্য সব ব্যারাজের গেট খুলে দেয়। ফলে উজানের ঢলে বাংলাদেশে প্রলয়ংকরী বন্যার সৃষ্টি হয়। ফসলের মাঠ, মাছের ঘের এবং বাড়িঘর তলিয়ে গিয়ে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। অর্থাৎ, যখন পানি দরকার তখন এক ফোঁটাও পাওয়া যায় না, আর যখন পানির প্রয়োজন নেই, তখন ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

  • দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা ও পরিবেশ বিপর্যয়: ফারাক্কা দিয়ে পর্যাপ্ত মিঠা পানি না আসার কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্রের নোনা পানি প্রবেশ করছে। এতে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সুন্দরী গাছ মরে যাচ্ছে এবং উপকূলীয় এলাকার আবাদি জমি লবণাক্ততার কারণে চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

  • তথ্য গোপন ও অসহযোগিতা: আন্তর্জাতিক নিয়মানুসারে উজানের দেশ ভাটির দেশকে পানির প্রবাহ ও বাঁধ খোলার বিষয়ে আগাম তথ্য দিতে বাধ্য। কিন্তু ভারত অনেক ক্ষেত্রেই এই তথ্য প্রদানে চরম অসহযোগিতা করে।

ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ: ঢাকা ও কলকাতার পটপরিবর্তন

আগামী ডিসেম্বরে গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ ফুরিয়ে আসার ঠিক এই সময়ে দুই দেশের রাজনীতি ও শাসন ক্ষমতায় এক অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে, যা পানিবণ্টনের সমীকরণকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দিয়েছে।

বাংলাদেশে এখন রাষ্ট্রক্ষমতার হাল ধরেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতি অত্যন্ত স্পষ্ট—জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে কোনো চুক্তি বা আপস নয়। অন্যদিকে, ভারতের রাজনীতিতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসকে হটিয়ে দীর্ঘদিন পর ক্ষমতা দখল করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসেছেন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। কেন্দ্রেও রয়েছে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার।

অতীতে তিস্তা বা গঙ্গা চুক্তির ক্ষেত্রে দিল্লির প্রধান অজুহাত ছিল “পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তি”। কারণ ভারতের সংবিধান অনুযায়ী নদীর পানি রাজ্যের বিষয়। কিন্তু এখন পাশা উল্টে গেছে। কেন্দ্রে এবং রাজ্যে—দুই জায়গাতেই এখন বিজেপির একক আধিপত্য। ফলে নরেন্দ্র মোদি সরকার আর আগের মতো ‘রাজ্যের আপত্তির’ দোহাই দিয়ে পার পাবে না। এখন সরাসরি দিল্লির নরেন্দ্র মোদি এবং কলকাতার শুভেন্দু অধিকারীকে ঢাকার সাথে টেবিলে বসতে হবে।

বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অত্যন্ত সোজা-সাপ্টা ভাষায় ভারতের দিকে একটি কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তিনি পরিষ্কার করে বলেছেন, “ভারতের সাথে ভালো সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই গঙ্গা চুক্তির ওপর। বাংলাদেশ চায়, একটি স্থায়ী ও ন্যায্য চুক্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত বর্তমান চুক্তিটি যেন চালু থাকে।” এর কারণ অত্যন্ত যৌক্তিক। বাংলাদেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই নদী ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।

ঢাকার মোক্ষম চাল: নিজস্ব অর্থায়নে ‘পদ্মা ব্যারাজ’

পানি কূটনীতিতে ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশ এক বিশাল ও সাহসী কৌশল গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার গড়াই নদীর উৎসমুখের কাছে ‘পদ্মা ব্যারাজ’ নির্মাণের মতো একটি মেগা প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে। ২০২৩ সাল থেকেই এই ব্যারাজ নিয়ে আলোচনা থাকলেও ভারতের অনাগ্রহের কারণে তা থমকে ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে—পদ্মা ব্যারাজ বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থের বিষয়। এটি নির্মাণের ক্ষেত্রে ভারতের সাথে আলোচনা বা অনুমোদনের কোনো প্রয়োজন নেই।

পদ্মা ব্যারাজের মূল উদ্দেশ্য হলো বর্ষাকালের উদ্বৃত্ত পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে তা সেচ ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা। এর ফলে দক্ষিণাঞ্চলের লবণাক্ততা দূর হবে এবং কৃষি খাতে বিশাল বিপ্লব ঘটবে। এটি ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আত্মনির্ভরশীলতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তবে অনেক নদী ও পরিবেশ বিশ্লেষক সতর্ক করে বলেছেন, পদ্মা ব্যারাজের শতভাগ সাফল্য তখনই আসবে, যখন ফারাক্কা থেকে গঙ্গার পানির ন্যূনতম ন্যায্য হিস্যা ঠিকঠাক পাওয়া যাবে।

মোদি ও শুভেন্দুর চরম উভয়সংকট

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় বসার পর গঙ্গা চুক্তিই হতে যাচ্ছে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকারের জন্য প্রথম বড় অগ্নিপরীক্ষা। এর আগে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি যখন স্বাক্ষরের দ্বারপ্রান্তে ছিল, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাগড়া দিয়েছিলেন। কারণ উত্তরবঙ্গ ছিল তৃণমূল ও অন্যান্য দলের ভোটব্যাংক। কিন্তু এখন হিসাব ভিন্ন।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে এখন দুই নৌকায় পা দিয়ে চলতে হবে। একদিকে, তিনি যদি বাংলাদেশকে বেশি পানি দিতে রাজি হন, তবে রাজ্যের কৃষকদের রোষানলে পড়ে ঘরের ভোটব্যাংক হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। অন্যদিকে, বর্তমান বাংলাদেশের কড়া অবস্থান ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক রাখাও দিল্লির জন্য অপরিহার্য। বিশেষ করে, বর্তমানে চীন ও পশ্চিমাদের সাথে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের যুগে ভারতকে সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে কলকাতার নতুন বিজেপি সরকারকে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু রাজনীতিতে মুখের কথা আর কাজের কাজ এক নয়। ভারত সব সময় সীমান্ত নিরাপত্তা ও ট্রানজিট নিয়ে সোচ্চার থাকে। এখন এই ভূ-রাজনৈতিক সুবিধাগুলো পেতে হলে পানি ইস্যুতে তাদের ছাড় দিতেই হবে। জানা গেছে, ভারত আপাতত একটি স্বল্পমেয়াদি ‘অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি’র কথা ভাবছে। কিন্তু বাংলাদেশ চাইছে দীর্ঘমেয়াদি ও ন্যায্য সমাধান।

গঙ্গা চুক্তির ধারা ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা

১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তির একটি সাধারণ নিয়ম ছিল—ফারাক্কায় পানির প্রবাহ যদি ৭০ হাজার কিউসেকের নিচে নেমে যায়, তবে দুই দেশ অর্ধেক (৫০%) করে পানি পাবে। আর যদি প্রবাহ ৫০ হাজার কিউসেকের নিচে নেমে যায়, তবে দুই দেশের মধ্যে জরুরি আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শুষ্ক মৌসুমে অনেক সময়ই ফারাক্কায় পানির প্রবাহ কৃত্রিমভাবে কমিয়ে দেওয়া হয় এবং বাংলাদেশ তার চুক্তির হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়। খাতাকলমের হিসাবের বাইরে গিয়ে ‘বন্ধুত্বের অধিকার’ বলে যে কথাটি ভারত সব সময় বলে এসেছে, তার ছিটেফোঁটাও নদী কূটনীতিতে দেখা যায়নি।

আগামী দিনের প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের সমীকরণ এখন সম্পূর্ণ নির্ভর করছে পানির ওপর। ভারত যদি অতীতের মতো একগুঁয়েমি ও টালবাহানা অব্যাহত রাখে, তবে তা বাংলাদেশের সাথে তাদের সম্পর্ককে তলানিতে নিয়ে যাবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায়। গঙ্গার পানি আগামী শীতে কেবল শুষ্কতা ও শীতলতা আনবে, নাকি দুই দেশের সম্পর্কে সমতাভিত্তিক এক নতুন উষ্ণতা তৈরি করবে—তা দেখার জন্য এখন অপেক্ষা করতে হবে ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে একটি বিষয় এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট, অধিকার আদায়ের প্রশ্নে বাংলাদেশ এখন একবিন্দুও ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ ২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category