দেশে জ্বালানি তেলের বিকল্প হিসেবে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে অটোগ্যাস বা এলপিজি। সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব হওয়ায় বিপুলসংখ্যক যানবাহন এই গ্যাসে রূপান্তরিত হচ্ছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাময় খাতের প্রসার যতটা দ্রুত হচ্ছে, এর কাঠামোগত দুর্বলতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তার চেয়েও বেশি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। একটি নিরাপদ অটোগ্যাস স্টেশনে গ্যাস ডিটেকশন সিস্টেম বা গ্যাস শনাক্তকরণ যন্ত্র থাকা বাধ্যতামূলক হলেও, অনেক স্থাপনায় এর কোনো অস্তিত্ব নেই। শুধু প্রাথমিক অনুমোদন নিয়েই বছরের পর বছর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে স্টেশনগুলো।
এমন চরম অব্যবস্থাপনা ও অনুমোদনহীন পরিচালনার কারণে অটোগ্যাস খাতে মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অটোগ্যাস স্টেশনে বড় ধরনের বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনাও ঘটেছে। এ অবস্থায় দ্রুত সময়ের মধ্যে এসব স্টেশনের বৈধ কাগজপত্র নিশ্চিত করা, চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান, বর্তমান নীতিমালা ও বিধিমালা বাস্তবসম্মতভাবে সংশোধন করা এবং উদ্যোক্তাদের জন্য হয়রানিমুক্ত ‘ওয়ানস্টপ সার্ভিস’ চালু করা জরুরি হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।
বিষয়টির গভীরতা ও গুরুত্ব অনুধাবন করে সম্প্রতি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ভবনে একটি তাৎপর্যপূর্ণ গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করা হয়। ‘এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার’ পত্রিকা এবং ‘এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (লোয়াব) যৌথভাবে এই বৈঠকের উদ্যোগ নেয়। ‘রাউন্ডটেবিল অন বাংলাদেশ এলপিজি সেক্টর ফেসিং গ্রোয়িং সেফটি অ্যান্ড রেগুলেটরি চ্যালেঞ্জেস’ শীর্ষক এই আয়োজনে শিল্পের সাথে জড়িত সরকারি-বেসরকারি শীর্ষ কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাত খান। তিনি তার গবেষণালব্ধ পরিসংখ্যানে খাতের এক ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, সারা দেশে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ১০০টির মতো অটোগ্যাস স্টেশন রয়েছে। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এর মধ্যে ৯০ শতাংশ স্টেশনেরই ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র ও চূড়ান্ত সনদ নেই।
অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাত বলেন, “যত্রতত্রভাবে শুধু প্রাথমিক অনুমোদন নিয়েই এসব অটোগ্যাস স্টেশন স্থাপন করা হচ্ছে। ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ কমপ্লায়েন্স বা নিরাপত্তাজনিত নিয়মনীতি মোটেও মানা হচ্ছে না। এর সরাসরি ফল হিসেবে স্টেশনগুলোতে দুর্ঘটনা বাড়ছে।”
তিনি আরও পরামর্শ দেন যে, স্টেশনের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে (রেগুলেটরি অথরিটি) একটি পরিপূর্ণ সমীক্ষা (স্টাডি) চালিয়ে দ্রুত সমাধানে আসতে হবে। সারা দেশের অটোগ্যাস স্টেশনগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট ও শৃঙ্খল সিস্টেমের আওতায় নিয়ে আসার জন্য বিইআরসিতে আরও লোকবল নিয়োগ দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। এককভাবে রেগুলেটরি বডির পক্ষে এই বিশাল কার্যক্রম তদারকি করা কঠিন, তাই সহায়ক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব স্টেশনের নজরদারি বাড়াতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও বড় ও ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে যাবে।
এই বিশাল সংখ্যক স্টেশনের সনদহীন থাকার পেছনে উদ্যোক্তাদের অবহেলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও ব্যাপকভাবে দায়ী। বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ সিরাজুল মাওলা এ বিষয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করেন।
তিনি জানান, বর্তমানে প্রায় ৭০০ অটোগ্যাস স্টেশন বিস্ফোরক পরিদপ্তর এবং বিইআরসির লাইসেন্সবিহীন অবস্থায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। বর্তমান নীতিমালা ও বিধিমালার যে কঠিন শর্তাবলি রয়েছে, তা পুরোপুরি মেনে স্টেশন স্থাপন ও পরিচালনা করা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব একটি কাজ।
তার মতে, সঠিক তদন্ত করলে দেখা যাবে—অতীতের কোনো এলপিজি, সিএনজি বা পেট্রল পাম্পই নীতিমালার শতভাগ আলোকে স্থাপিত হয়নি; সবাই কোনো না কোনোভাবে বিষয়গুলো ‘ম্যানেজ’ করে ব্যবসা দাঁড় করিয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “বর্তমানে একটি স্টেশনের কেবল প্রাথমিক নকশার অনুমোদন পেতেই বছরের পর বছর ধরে বিস্ফোরক পরিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, ডিসি অফিস, ফায়ার সার্ভিস এবং পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হয়। এতে উদ্যোক্তাদের মূল্যবান সময় নষ্ট হয় এবং বিনিয়োগের একটি বড় অংশই বিবিধ খরচ বা আনঅফিশিয়াল খাতে ব্যয় হয়ে যায়, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।”
এলপিজি খাতের প্রসারকে বাধাগ্রস্ত করছে শুল্ক বৈষম্য। ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল মাওলা জানান, সিএনজি স্টেশনের মতো এলপিজি স্টেশন স্থাপন ও গাড়ি কনভার্সনের জন্য আমদানীকৃত যন্ত্রপাতিতে শুল্কছাড় দেওয়ার সুস্পষ্ট সুপারিশ রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন দপ্তর থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার জটিলতার কারণে উদ্যোক্তারা এই সুবিধা গ্রহণ করতে পারছেন না। বিভিন্ন দপ্তরে দফায় দফায় মিটিং করেও কোনো সুফল মেলেনি।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, বর্তমানে প্রায় এক হাজার স্টেশন স্থাপনে এই খাতে উদ্যোক্তাদের প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে। এখানকার প্রায় সব উদ্যোক্তাই ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) পর্যায়ের এবং এই বিপুল বিনিয়োগের অধিকাংশই এসেছে ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে। পাশাপাশি, বর্তমানে প্রায় দুই লাখ যানবাহন রয়েছে, যেগুলো জ্বালানি সাশ্রয়ের আশায় এলপিজিতে কনভার্ট হয়েছে। কিন্তু লাইসেন্স জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা ও শুল্ক সুবিধার অভাবে এই খাতের উদ্যোক্তা ও গ্রাহক—সবাই এখন চরম বিনিয়োগ ঝুঁকি ও গুরুতর সমস্যায় জর্জরিত।
গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর ভাষায় খাতের বর্তমান মানসিকতার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “আমরা যতটা না নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন, তার চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগী কেবল মুনাফা অর্জনের দিকে। দেশে জ্বালানি সংকট থাকায় এলপিজি খাতটি ইদানীং অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ঠিকই, তবে এর নিরাপত্তা ইস্যুটি আমাদের সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তুলেছে। মুনাফার চেয়ে নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।”
এলপিজি খাতের নিরাপত্তা নিয়ে যে সমালোচনা চলছে, তা স্বীকার করে নেন লোয়াব প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আমিরুল হক। তিনি বলেন, “নিরাপত্তার ত্রুটির বিষয়টি অস্বীকার করার বা এর দায় না নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সামনের দিনে এই খাতকে এগিয়ে নিতে হলে বিস্ফোরক পরিদপ্তর, বিইআরসি ও লোয়াব মিলে একটি কার্যকর ও আধুনিক সিস্টেম দাঁড় করাতে হবে। নীতিমালায় জটিলতা ও কমপ্লায়েন্সগত ইস্যু আছে, তবে দিনশেষে আমাদের কমপ্লায়েন্স মেনেই ব্যবসা করতে হবে।”
ফ্রেশ এলপি গ্যাসের চিফ মার্কেটিং অফিসার (সিএমও) আবু সাঈদ রাজা এই খাতের আরেকটি বিপজ্জনক ও বেআইনি দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এলপিজি খাতের প্রসারে অটোগ্যাসের ব্যবহার বৃদ্ধি একটি বড় সম্ভাবনার দিক। কিন্তু সবচেয়ে বড় শঙ্কার জায়গা হলো ৯০ শতাংশ অটোগ্যাস স্টেশনের চূড়ান্ত অনুমোদন না থাকা।
তিনি অভিযোগ করেন, “নানা ধরনের ঝুঁকির পাশাপাশি বিভিন্ন অটোগ্যাস স্টেশনে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ‘ক্রস ফিলিং’ করা হচ্ছে। যেখানে-সেখানে অটোগ্যাস পাম্প বসিয়ে যথেচ্ছভাবে ব্যবসা করা হচ্ছে। এই নৈরাজ্য অবিলম্বে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। যেহেতু এখানে মানুষের জানমালের সরাসরি নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত, তাই রেগুলেটরি বডি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে এই কমপ্লায়েন্স বা নিয়মনীতি পরিপালনের বিষয়টি কঠোরভাবে জোর দিয়ে দেখতে হবে।”
উক্ত সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ারের সম্পাদক মোল্লা আমজাদ হোসেন। এছাড়া আলোচনায় বিইআরসির সদস্য (পেট্রোলিয়াম) ড. সাঈদা সুলতানা রাজিয়া, সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান, রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট ড. আলি আফজাল, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব একেএম ফজলুল হক, ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ ইকবাল বাহার বুলবুল এবং বিস্ফোরক পরিদপ্তরের সহকারী পরিদর্শক মোহাম্মদ মেহেদী ইসলাম খান তাদের মূল্যবান মতামত তুলে ধরেন। সবার আলোচনাতেই একটি বিষয় পরিষ্কার—অটোগ্যাস খাতের অপার সম্ভাবনাকে টেকসই করতে হলে নিরাপত্তা ও কাঠামোগত শৃঙ্খলার কোনো বিকল্প নেই।
তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা