• সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১০:৪৯ পূর্বাহ্ন

পোশাক আর শরিয়া আইনের বিতর্কে হারিয়ে যাচ্ছে রামিসা

Reporter Name / ৩ Time View
Update : সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬

রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের অবুঝ শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার পর তার বাবার একটি আক্ষেপভরা উচ্চারণ পুরো দেশের বিবেককে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। সন্তানহারা এক অভাগা পিতা যখন চরম হতাশা ও ক্ষোভ থেকে বলেন, “আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না,” তখন সেটি কেবল একটি নির্দিষ্ট পরিবারের ব্যক্তিগত যন্ত্রণা বা শোকের প্রকাশ থাকে না। এটি হয়ে ওঠে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক নীরব অথচ শক্তিশালী অভিশাপ। একটি সভ্য সমাজে যখন কোনো নাগরিক রাষ্ট্রের কাছে বিচার চাওয়ার ন্যূনতম আস্থাটুকুও হারিয়ে ফেলেন, তখন বুঝতে হবে সেই সমাজের পচন কতটা গভীরে পৌঁছেছে। রামিসার মতো কোনো মর্মান্তিক ও পৈশাচিক ঘটনা ঘটলেই আমাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো সাময়িকভাবে সরব হয়ে ওঠে। প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, কিন্তু এই প্রতিবাদের ভাষা ও ধরন খুব দ্রুতই মূল বিষয় থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। কেউ এই জঘন্য অপরাধের দায় চাপান নারীর পোশাকের ওপর, কেউ দোষারোপ করেন পশ্চিমা সংস্কৃতিকে, আবার কেউ জোরালো দাবি তোলেন দেশে কঠোর শরিয়া আইন চালুর। কিন্তু এতসব বিতর্কের ডামাডোলে আসল প্রশ্নটি এবং মূল সংকটটি সবসময়ই আড়ালে থেকে যায়—সমাধান আসলে কোথায়?

পোশাকের খোঁড়া যুক্তি ও সিস্টেমের দায়

ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের আলোচনা উঠলেই আমাদের সমাজের একটি বড় অংশ খুব অবলীলায় নারীর পোশাকের প্রসঙ্গটি টেনে আনেন। তারা যুক্তি দেন যে, শালীন পোশাক না পরার কারণেই নারীরা যৌন নিপীড়নের শিকার হন। কিন্তু এই যুক্তিটি শিশু রামিসার ক্ষেত্রে কতটা অসার, তা কি আমরা একবারও ভেবে দেখেছি? রামিসার বয়স ছিল মাত্র সাত বছর। এই বয়সের একটি অবুঝ শিশুর পোশাক কীভাবে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের কামনাবাসনা বা ধর্ষণের কারণ হতে পারে? পোশাক যদি সত্যিই ধর্ষণের প্রধান কারণ হতো, তবে সমাজে অসংখ্য ছেলে শিশু বা পুরুষ কেন প্রতিনিয়ত বিকৃত যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে? মূলত, পোশাককে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ধর্ষককে একধরনের পরোক্ষ দায়মুক্তি দেওয়ার যে সিস্টেম বা মানসিকতা আমাদের সমাজে তৈরি হয়েছে, সবার আগে সেই সিস্টেমকে ভাঙতে হবে।

পর্নোগ্রাফি বনাম ক্ষমতার অপব্যবহার

অনেকে আবার ধর্ষণের কারণ হিসেবে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা, পর্নোগ্রাফি, অবাধ যৌনাচার, নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন এবং বিনোদনের নামে যৌন উসকানিকে দায়ী করে থাকেন। তাদের যুক্তি হলো, পর্নোগ্রাফি দেখে মানুষ মানসিকভাবে বিকৃত হয়ে পড়ে। এই যুক্তির কিছুটা ভিত্তি থাকলেও এটি সম্পূর্ণ নয়। কারণ মানসিক বিকৃতি এবং সুযোগ ও ক্ষমতার অপব্যবহার—এই দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। আমাদের সমাজকাঠামোতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা মাদ্রাসার মতো পবিত্র জায়গাগুলোতেও যখন প্রতিনিয়ত যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে, তখন তার সবটাকে কেবল পর্নোগ্রাফির প্রভাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এখানে মূলত কাজ করে ক্ষমতার দাপট এবং দুর্বলকে শোষণ করার হীন মানসিকতা।

শরিয়া আইন চালুর বিতর্ক ও বাস্তব জটিলতা

রামিসা হত্যাকাণ্ডের পর অনেকেই দাবি তুলছেন, দেশে প্রচলিত আইনের বদলে শরিয়া আইন চালু হলে এ ধরনের সমস্যার রাতারাতি সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু বিষয়টি কি সত্যিই এতটা সরল? বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যেখানে প্রায় ৯০ ভাগ মানুষ মুসলমান এবং পাড়ায় পাড়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও মাদ্রাসা রয়েছে। তা সত্ত্বেও ধর্ষণের মহামারি তো থামছে না।

বিশ্লেষকরা এই জায়গায় কিছু যৌক্তিক প্রশ্ন তুলেছেন। ইসলামি আইন বা শরিয়া আইনে ধর্ষণের বিচার ও ধর্ষককে শাস্তি দেওয়ার জন্য সাধারণত চারজন প্রত্যক্ষ চাক্ষুষ সাক্ষীর প্রয়োজন হয়। কিন্তু রামিসার মতো ঘটনাগুলো, যেখানে ঘটনাস্থলে কেবল অপরাধী এবং ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউ উপস্থিত ছিল না, সেখানে এই চারজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী জোগাড় করা কীভাবে সম্ভব? প্রচলিত শরিয়া বিচারপদ্ধতির এই নির্ধারিত মানদণ্ড প্রয়োগ করতে গেলে অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধী প্রমাণের অভাবে পার পেয়ে যেতে পারে। কলামিস্ট ও গবেষকরা এ প্রসঙ্গে সৌদি আরবের মতো দেশের উদাহরণ টেনে এনেছেন। সেখানে অনেক ক্ষেত্রে অভিবাসী নারী শ্রমিক বা দাসীদের ওপর চালানো যৌন নিপীড়নকে আইনিভাবে ‘ধর্ষণ’ হিসেবে স্বীকৃতিই দেওয়া হয় না। বরং নির্দিষ্ট কিছু উগ্র মতাদর্শের অধীনে তথাকথিত শরিয়তের অপব্যাখ্যা দিয়ে অপরাধকে লঘু করে দেখার প্রবণতাও লক্ষ করা যায়। একশ্রেণির সুবিধাভোগী মানুষ আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে ভুক্তভোগী নারী বা শিশুকে ‘দাসী’ বা অধীনস্থ ক্যাটাগরিতে ফেলে তাদের ওপর চালানো নির্যাতনকে জায়েজ করার চেষ্টা করতে পারে। তখন ভুক্তভোগীর বয়স সাত নাকি সতেরো, সেটি আর বিবেচ্য বিষয় থাকে না।

প্রচলিত আইনের দুর্বলতা ও প্রয়োগের সংকট

নেত্র নিউজের সম্পাদক নাজমুল আহসান এ বিষয়ে একটি পরিষ্কার বিশ্লেষণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমাদের দেশে যে অপরাধের বিচার হয় না, তা চরম সত্য। কিন্তু এই বিচারহীনতার মূল কারণ আইনের স্বল্পতা বা অভাব নয়; বরং আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের অভাব। আমাদের প্রচলিত আইনি ব্যবস্থায় পদে পদে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখানো হয়, রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক প্রভাব খাটিয়ে মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। এখানেই প্রচলিত আইনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। আবার অন্যদিকে, দ্রুত বিচারের দাবিতে জনরোষ প্রশমিত করতে গিয়ে অনেক সময় নিরীহ মানুষ শাস্তির শিকার হয় এবং প্রকৃত অপরাধী বেঁচে যায়। ২০১৮ সালে সংঘটিত আলোচিত বিউটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি এর বড় প্রমাণ, যেখানে দ্রুত বিচারের চাপে তদন্তের দিকভ্রান্তি ঘটেছিল।

নিরাপত্তাহীনতায় বিপন্ন মাতৃত্ব ও আমাদের প্রত্যাশা

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এই বিচারহীনতা ও নিরাপত্তাহীনতার সংস্কৃতি প্রতিটি ঘরে এক চরম আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। সাংবাদিক শাহনাজ শারমিন তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, আজকের দিনে একজন মাকে তার চার বছর বয়সী কন্যাসন্তানকে শেখাতে হচ্ছে ‘গুড টাচ’ এবং ‘ব্যাড টাচ’ বা ভালো ও খারাপ স্পর্শের পার্থক্য। নিজের বাড়িতে থেকেও মেয়েকে একা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে দিতে ভয় পান তিনি। পাখির ছানার মতো ডানা দিয়ে সবসময় ঢেকে রাখতে হয় সন্তানকে। কর্মজীবী মা হিসেবে সারাক্ষণ আতঙ্কে থাকতে হয়, বাসায় সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়ে রাখতে হয়।

তিনি আক্ষেপ করে প্রশ্ন করেছেন, “আর কী করব আমি?” এই প্রশ্নটি শুধু তার একার নয়; দেশের প্রতিটি মায়ের। এ দেশের নারীরা কি রাষ্ট্রের কাছে খুব বেশি কিছু চেয়েছিলেন? তারা শুধু নিরাপদে বেঁচে থাকার এবং নির্বিঘ্নে পথ চলার অধিকারটুকু চেয়েছিলেন। ধর্ষণকে কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় এজেন্ডা হিসেবে ব্যবহার না করে, সবার আগে রাষ্ট্রকে তার নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নে দায়বদ্ধ করাই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। তা না হলে, প্রতিদিন নতুন নতুন রামিসা হারিয়ে যাবে আর আমরা মেতে থাকব অন্তহীন বিতর্কে।

তথ্যসূত্র: দ্যা পোস্ট


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category