• রবিবার, ২৪ মে ২০২৬, ১১:৫১ অপরাহ্ন

পানিবণ্টন চুক্তির অপেক্ষা ছেড়ে তিস্তা ব্যারেজে চীনের এন্ট্রি

Reporter Name / ২ Time View
Update : রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬

দীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির আশায় বসে থাকার পর অবশেষে নিজস্ব পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছেন যে, বর্তমান সরকারই তিস্তা ব্যারেজ মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু করবে। এই ঘোষণার বাস্তব রূপ দিতে এরই মধ্যে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। গত ৬ মে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বেইজিংয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন। সেখানে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীনের সহযোগিতা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। দীর্ঘদিন ধরে ভারত উজানে একের পর এক ব্যারেজ নির্মাণ করে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানি আটকে রাখছে, যার ফলে উত্তরাঞ্চলের ফসলের মাঠ ফেটে চৌচির হয়ে যায়। আবার বর্ষা মৌসুমে হঠাৎ পানি ছেড়ে দেওয়ায় বন্যায় ভেসে যায় বিস্তীর্ণ জনপদ। এই অবর্ণনীয় দুর্দশা ও খামখেয়ালিপনা থেকে চিরতরে মুক্তি পেতেই বাংলাদেশ এখন চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যাচ্ছে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের এই সম্ভাব্য প্রবেশ দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে, বিশেষ করে ভারতের জন্য এক নতুন ও গভীর উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। এই উত্তেজনার একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভারতের অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডোর। প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্প এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান এই করিডোরের একেবারে সন্নিকটে। মাত্র ২২ কিলোমিটার চওড়া এই সরু করিডোরটি ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যকে যুক্ত করেছে। কৌশলগত ও সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে চীনের যেকোনো ধরনের উপস্থিতি বা অর্থনৈতিক তৎপরতা ভারত নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। একারণেই ভারত শুরু থেকেই তিস্তা প্রকল্পে চীনের যুক্ত হওয়ার তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। অন্যদিকে, চীন তাদের বহুল আলোচিত ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা বিআরআই-এর আওতায় তিস্তাকে অন্তর্ভুক্ত করতে প্রবলভাবে আগ্রহী। এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের প্রভাব আরও সুসংহত করতে চায় বেইজিং। কিন্তু বাংলাদেশ এবার অত্যন্ত পরিষ্কার ও জোরালো কূটনৈতিক বার্তা দিয়েছে যে, নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় এবং দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে অন্য কোনো দেশের মর্জির ওপর অনন্তকাল অপেক্ষা করা সম্ভব নয়।

অনেকেই হয়তো ভুলবশত মনে করেন যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা চীনের নিজস্ব কোনো প্রকল্প। কিন্তু বাস্তবে এটি সম্পূর্ণ রূপে বাংলাদেশের নিজস্ব একটি পরিকল্পনা। তবে এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য যে বিপুল পরিমাণ কারিগরি জ্ঞান এবং প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার বিশাল বিনিয়োগ প্রয়োজন, তার জন্যই বাংলাদেশ চীনের দিকে হাত বাড়িয়েছে। চীনের সংশ্লিষ্টতা এখানে একেবারেই নতুন কিছু নয়। ২০১৬ সাল থেকে শুরু করে টানা তিন বছর চীনের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ার চায়না কনস্ট্রাকশন’ এই মহাপরিকল্পনার ওপর ব্যাপক ও সুনিপুণ সমীক্ষা এবং মূল্যায়ন সম্পন্ন করেছে। এর অর্থ হলো, এই প্রকল্পের ভূতাত্ত্বিক গঠন, নদীর গতিপ্রকৃতি এবং যাবতীয় প্রযুক্তিগত জটিলতা সম্পর্কে চীন আগে থেকেই সম্পূর্ণ রূপে অবগত। চীনের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ইতিমধ্যে সরেজমিনে তিস্তা অববাহিকা এলাকা পরিদর্শন করেছে এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করে প্রকল্পের বাস্তব রূপরেখা সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিয়েছে।

এই তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধু একটি সাধারণ সেচ প্রকল্প নয়, এটি মূলত পুরো উত্তরাঞ্চলের আর্থসামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তনের এক যুগান্তকারী নীলনকশা। তিস্তা অববাহিকায় বসবাসকারী প্রায় দুই কোটির বেশি মানুষের জীবন ও জীবিকা এই নদীর ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। বর্তমানে বিদ্যমান তিস্তা সেচ প্রকল্প মাত্র ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দিতে সক্ষম। কিন্তু মহাপরিকল্পনাটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের এক বিশাল অংশ সরাসরি সেচের আওতায় আসবে। কৃষি ও অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে প্রতি বছর প্রায় এক লাখ কোটি টাকার ফসলি জমি মারাত্মক খরা ও আকস্মিক বন্যার হাত থেকে সুরক্ষিত হবে। শুধু সেচ নয়, সুনির্দিষ্ট পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বর্ষা মৌসুমে নদীভাঙনের ফলে হাজার হাজার মানুষের বাস্তুহারা হওয়ার যে মানবিক ট্র্যাজেডি প্রতি বছর ঘটে, তা চিরতরে বন্ধ করা সম্ভব হবে। এছাড়া সারাবছর নদীর জমানো পানি ব্যবহার করা গেলে সেচের জন্য মাটির নিচ থেকে অতিরিক্ত পানি উত্তোলন উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সুরক্ষিত থাকবে এবং দীর্ঘমেয়াদে ভূমিধসের মতো মারাত্মক পরিবেশগত ঝুঁকি হ্রাস পাবে।

এই প্রকল্পের আরেকটি চমকপ্রদ এবং অত্যন্ত দূরদর্শী দিক হলো বিপুল পরিমাণ ভূমি পুনরুদ্ধার। বিজ্ঞানভিত্তিক আধুনিক নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তিস্তার বুকে জেগে থাকা প্রায় ১৭২ বর্গকিলোমিটার নতুন জমি উদ্ধার করা সম্ভব হবে, যা আয়তনের দিক থেকে পুরো চট্টগ্রাম শহরের সমান। এই বিশাল উদ্ধারকৃত ভূমিতে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক শহর, টেকসই অর্থনৈতিক জোন এবং আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে। চীনা কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যে এই অঞ্চলকে ঘিরে বাংলাদেশে প্রায় ১০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা অন্তত ১০ হাজার বেকার মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। এখন অনেকের মনেই একটি যৌক্তিক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে যে, ব্যারেজ নির্মাণের পর ভারত যদি একেবারেই পানি দেওয়া বন্ধ করে দেয়, তাহলে এই বিপুল বিনিয়োগের কী হবে? বিশেষজ্ঞদের অত্যন্ত সুস্পষ্ট উত্তর হলো, বর্তমানে তিস্তার যে করুণ দশা, তার চেয়ে পরিস্থিতি আর কোনোভাবেই খারাপ হওয়া সম্ভব নয়। বরং ব্যারেজ নির্মিত হলে বর্ষাকালে উজান থেকে ধেয়ে আসা উদ্বৃত্ত বিপুল জলরাশি বিশাল জলাধারে ধরে রাখা সম্ভব হবে। সেই সঞ্চিত পানি দিয়েই পুরো শুষ্ক মৌসুমে উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে সেচ কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে চালানো যাবে।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফরটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক হতে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষের ধারণা, এই ঐতিহাসিক সফরেই তিস্তা মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত হওয়া এবং এর বাস্তবায়ন শুরুর সুনির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। এই মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে শুধু উত্তর বাংলার কোটি মানুষের ভাগ্যই বদলাবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার জটিল ভূরাজনীতিতে একটি স্বাধীন, আত্মমর্যাদাশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতার এক নতুন ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা হবে।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ ২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category