• সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ০৯:৩৫ অপরাহ্ন
Headline
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এডিবি প্রেসিডেন্টের সৌজন্য সাক্ষাৎ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে ইরানের সম্মতি, চুক্তির সম্ভাবনা আতাউর রহমান সম্পর্কে আবুল হায়াতের আবেগঘন স্মৃতিচারণ সুস্থ ও প্রাকৃতিকভাবে মোটাতাজা গরু চেনার উপায় চুক্তি না হলে ইরানের সঙ্গে ‘বড় সংঘাতের’ হুঁশিয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের টাঙ্গাইলে রডবাহী ট্রাক খাদে উল্টে নিহত পনেরো যাত্রী টানা তৃতীয় বছরের মতো গাজায় নেই কোরবানির ঈদ চাঁদপুরে আকস্মিক ঝড়ের কবলে যাত্রীবাহী লঞ্চ আহত অর্ধশতাধিক গরু কোরবানির দাবিতে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু খামারিদের বিক্ষোভ শিশু রামিসা হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দাখিল শুনানি জুনে

ঈদযাত্রায় দেশজুড়ে হাম বিস্তারের শঙ্কা এবং নেই সরকারি নির্দেশনা

Reporter Name / ৩ Time View
Update : সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬

পবিত্র ঈদুল আজহা উদ্‌যাপন করতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরগুলো থেকে লাখ লাখ মানুষ নাড়ির টানে গ্রামের বাড়ি ছুটছেন। বিপুলসংখ্যক এই ঘরমুখো মানুষের ভিড়ে রয়েছে অসংখ্য ছোট শিশু। আনন্দমুখর এই ঈদযাত্রার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, গণহারে মানুষের এই সাময়িক ‘স্থানান্তর’ দেশব্যাপী হামের সংক্রমণকে একটি বিপজ্জনক মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে। পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করার আশঙ্কা থাকলেও, এখন পর্যন্ত জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশিকা বা সতর্কবার্তা জারি করা হয়নি, যা চিকিৎসাবিদ ও সচেতন মহলকে চরম হতাশ করেছে।

হামের বর্তমান পরিস্থিতি এবং টিকাদান কর্মসূচির ফলাফল বিশ্লেষণ করলে একটি ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। দেশব্যাপী হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শেষ হয়েছে প্রায় দেড় মাস আগে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউনিসেফের বৈজ্ঞানিক তথ্যমতে, সাধারণত হামের টিকা নেওয়ার দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এক ভিন্ন ও হতাশাজনক বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। টিকাদানের দেড় মাস পার হয়ে যাওয়ার পরও দেশে হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কাঙ্ক্ষিত হারে কমছে না, বরং এই হার একটি উদ্বেগজনক অবস্থায় স্থির হয়ে আছে।

বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবনের জন্য দেশে হামের অতীত ইতিহাস ও সাম্প্রতিক ঘটনাবলির দিকে ফিরে তাকানো জরুরি। একসময় বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল এই হাম। পরবর্তীতে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) অভাবনীয় সাফল্যের কারণে হামের প্রাদুর্ভাব অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছিল। কিন্তু সম্প্রতি টিকার সংকট এবং টিকাদানে ধারাবাহিকতার অভাবে পরিস্থিতি আবারও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সংবাদমাধ্যমের বিগত দিনের তথ্য ঘাঁটলে দেখা যায়, হাম ও এর উপসর্গে দেশে ইতোমধ্যে ৫৪৫ জন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। টিকার তীব্র সংকটের বিষয়ে সতর্ক করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে এর আগে পাঁচ থেকে ছয়টি চিঠি দেওয়া হয়েছিল। এমনকি হামের টিকার বিষয়ে ইউনিসেফ অন্তত সাতবার রিমাইন্ডার বা তাগিদপত্র পাঠিয়েছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক ছিল যে, চট্টগ্রামের হাসপাতালগুলোতে হাই ফ্লো ক্যানুলা ও পিআইসিইউ (পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) সংকটের কারণে এক শয্যায় তিন শিশুকে পর্যন্ত চিকিৎসা দিতে হয়েছে। হামে শিশুমৃত্যুর এই ভয়াবহতা তদন্তে উচ্চ আদালত থেকে কমিশন গঠনের রুল পর্যন্ত জারি করা হয়েছিল। অতীতের এই অবহেলার মাশুলই হয়তো এখন দিতে হচ্ছে পুরো জাতিকে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম ভাইরাসের বিস্তারের বৈজ্ঞানিক ধরনটিই ঈদযাত্রাকে একটি ‘টাইম বোমায়’ পরিণত করেছে। সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ জানান, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি রোগ। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, কোনো শিশুর শরীরে হামের র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি ওঠার অন্তত চার দিন আগে থেকেই সে নীরবে অন্যকে সংক্রমিত করতে শুরু করে। অর্থাৎ, একজন অভিভাবক হয়তো জানেনই না যে তার শিশুটি হামে আক্রান্ত, অথচ সেই অসুস্থ শিশুকে নিয়ে যখন তিনি ভিড়ভাট্টার মধ্যে বাস, ট্রেন বা লঞ্চে ভ্রমণ করছেন, তখন ওই শিশুটি অসংখ্য সুস্থ শিশুর মাঝে ভাইরাস ছড়িয়ে দিচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, হামে আক্রান্ত একজন শিশু তার সংস্পর্শে আসা সর্বোচ্চ ১৮ জনকে সংক্রমিত করার ক্ষমতা রাখে। ফলে ঈদকে কেন্দ্র করে যাতায়াতের এই বিশাল ভিড়ে শিশুদের আইসোলেশন বা আলাদা রাখার প্রাথমিক স্বাস্থ্যবিধি পুরোপুরি ভেঙে পড়ার তীব্র ঝুঁকি রয়েছে।

ডা. বেনজির আহমেদ আরও একটি ভয়ংকর বিপদের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, জ্বর বা হামের প্রাথমিক লক্ষণ থাকা কোনো অসুস্থ শিশুকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। কারণ, দেশের প্রান্তিক বা গ্রামীণ অঞ্চলগুলোতে শিশুদের উন্নত চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত পেডিয়াট্রিক আইসিইউ বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তীব্র সংকট রয়েছে। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি এবং গ্রামে সঠিক চিকিৎসার অভাবে অসুস্থ শিশুর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে, যা সরাসরি তার মৃত্যুঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। এই চরম সংকটময় মুহূর্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নীরবতার তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, ঈদের আগেই জনস্বার্থে একটি কঠোর সতর্কতামূলক নির্দেশনা জারি করা উচিত ছিল। তিনি পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের নিয়ে এবারের ঈদে ঢাকার বাইরে ভ্রমণ না করার জন্য অভিভাবকদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানান।

একই ধরনের শঙ্কার কথা জানিয়েছেন রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রখ্যাত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন। তাঁর মতে, দেশে হামের সংক্রমণ এখন একেবারে শীর্ষ পর্যায়ে অবস্থান করছে। ঈদের ছুটিতে স্থান পরিবর্তনের ফলে সুস্থ এবং অসুস্থ শিশুদের মধ্যে যে অবাধ মেলামেশা হবে, তার পরিণতি আমরা আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যেই দেখতে পাব। এই ক্রস-ইনফেকশনের কারণে হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব আরও অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এত বড় একটি বিপদের সামনে দাঁড়িয়েও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কেন জনস্বার্থে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে না, তা নিয়ে তিনি গভীর বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

টিকার কার্যকারিতা নিয়ে অনেকের মনে যে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে, তা স্পষ্ট করেছেন টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম এ বারী। তিনি জানান, টিকা দিলেই যে শিশু শতভাগ সুরক্ষিত, বিষয়টি মোটেও এমন নয়। টিকার কার্যকারিতা নির্ভর করে শিশুর সঠিক বয়স, তার পুষ্টিগত অবস্থা এবং মায়ের শরীর থেকে সে কী পরিমাণ অ্যান্টিবডি পেয়েছে তার ওপর। এবারের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতে ছয় মাস বয়সী শিশুদেরও টিকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, ছয় মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়া হলে তার কার্যকারিতা থাকে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ। নয় মাস বয়সে এই হার দাঁড়ায় ৮৫ শতাংশে এবং ১৫ মাস বয়সে তা প্রায় ৯০ শতাংশ কার্যকর হয়। অর্থাৎ, কর্মসূচির আওতায় টিকা নেওয়া একেবারে ছোট শিশুদের একটি বড় অংশই এখনো অরক্ষিত রয়ে গেছে, যাদের নিয়ে ঈদযাত্রা করাটা চরম বোকামি হতে পারে।

সার্বিক বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান দায়সারা গোছের উত্তর দেন। তিনি জানান, মন্ত্রণালয় থেকে গণজমায়েত এড়িয়ে চলার সাধারণ নির্দেশনা থাকলেও মানুষ তা মানছে না। ঈদকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য কিছু অভ্যন্তরীণ নির্দেশনা দেওয়া হলেও, সাধারণ জনগণের উদ্দেশ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সতর্কবার্তা জারি করা হয়নি। বিস্ময়করভাবে তিনি দাবি করেন যে, জনস্বার্থে প্রচারণার এই বিষয়টি মূলত তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। তবে ঈদযাত্রায় সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কার কথা তিনি স্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, হামের বিস্তারের ঊর্ধ্বগতি কিছুটা থামলেও, গত কয়েক দিন ধরে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার একটি নির্দিষ্ট জায়গায় আটকে আছে। তিনি জ্বর বা হামের উপসর্গ থাকা শিশুদের কোনোভাবেই ঘরের বাইরে না নেওয়ার জন্য অভিভাবকদের অনুরোধ করেছেন।

রাজধানীর প্রধান শিশু হাসপাতালগুলোর দিকে তাকালে হামের এই ভয়াবহতার বাস্তব চিত্র চোখে পড়ে, যা যেকোনো সচেতন মানুষের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেবে। ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে বর্তমানে ৮১ জন শিশু হাম ও এর মারাত্মক উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে। কেবল গত ২৪ ঘণ্টাতেই সেখানে নতুন করে ১৮ জন শিশু ভর্তি হয়েছে এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে একজনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে এ পর্যন্ত শুধু এই একটি হাসপাতালেই ৮৩২ জন শিশু হাম নিয়ে ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে ৩৩টি নিষ্পাপ প্রাণ ঝরে গেছে।

মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের অবস্থাও অত্যন্ত করুণ। সেখানে বর্তমানে ৭২ জন শিশু হাম নিয়ে ভর্তি আছে। শেষ ২৪ ঘণ্টায় আটজন নতুন রোগী আসার পাশাপাশি সেখানেও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই হাসপাতালে হাম ও এর উপসর্গে মারা গেছে ৪৮ জন শিশু। অন্যদিকে, রোগীদের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে মহাখালীর ডিএনসিসি কোভিড হাসপাতালটিকেও ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে বর্তমানে ৪৫৬ জন হাম আক্রান্ত শিশু শয্যাশায়ী। গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে নতুন করে ৯২ জন ভর্তি হয়েছে এবং এক শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত এই হাসপাতালটিতে অবিশ্বাস্যভাবে ৬ হাজার ৪৫ জন হামের রোগী ভর্তি হয়েছে এবং মারা গেছে ৩৫টি শিশু।

ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে গিয়ে আমরা যেন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এমন এক ভয়ংকর ভাইরাসের মুখে ঠেলে না দিই, সে বিষয়ে অভিভাবকদেরই এখন সর্বোচ্চ সচেতনতার পরিচয় দিতে হবে।

তথ্যসূত্র: ঢাকা পোস্ট


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category