আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও নজিরবিহীন পদক্ষেপে, যুদ্ধক্ষেত্র এবং সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে পদ্ধতিগতভাবে যৌন সহিংসতা চালানোর গুরুতর অভিযোগে রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করেছে জাতিসংঘ। বৈশ্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্তকে একটি বিশাল বাঁক ও কঠোর অবস্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরাইলের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন নিজেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সামনে এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। জাতিসংঘের মতো একটি বৈশ্বিক সর্বোচ্চ সংস্থা যখন কোনো রাষ্ট্রকে এমন একটি গুরুতর অপরাধের দায়ে কালো তালিকাভুক্ত করে, তখন তা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গভীর প্রভাব বিস্তার করে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। এই ঘোষণার পর থেকেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
জাতিসংঘের এই পদক্ষেপের কথা স্বীকার করার পাশাপাশি রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন এই বৈশ্বিক সংস্থার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ বলে আখ্যায়িত করে এর কড়া নিন্দা জানিয়েছেন। ড্যানন তাঁর বক্তব্যে বারবার প্রমাণের চেষ্টা করেছেন যে, জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্তটি মাঠপর্যায়ের প্রকৃত বাস্তবতার সাথে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর মতে, ইসরাইলকে আন্তর্জাতিকভাবে কোণঠাসা করার একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই কালো তালিকায় তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, একটি সার্বভৌম ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলের নিজস্ব আইনি কাঠামো রয়েছে এবং এই ধরনের অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতিসংঘ এবং ইসরাইলের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কে চরম অবনতি ঘটেছে। ইসরাইলের অন্যতম প্রধান এবং প্রভাবশালী পত্রিকা ‘দ্য জেরুজালেম পোস্ট’-এর প্রকাশিত একটি বিশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, রাষ্ট্র হিসেবে কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার এই চরম অবমাননাকর সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রতিবাদস্বরূপ ইসরাইল সরকার একটি বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সংবাদমাধ্যমটির তথ্যমতে, ইসরাইল আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের কার্যালয়ের সঙ্গে তাদের সমস্ত ধরনের দাপ্তরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। সম্পর্ক স্থগিতের এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, ইসরাইল জাতিসংঘের এই পদক্ষেপকে কতটা ক্ষোভের সাথে গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক মহলে এই সম্পর্ক স্থগিতের ঘটনাটি আগামী দিনে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন কার্যক্রমে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের মতো একটি সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক ফোরাম থেকে এমন একটি কঠোর সিদ্ধান্ত হুট করে আসেনি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সময়ের পুঞ্জীভূত অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ধারাবাহিক উদ্বেগ। মূলত ২০২৩ সালের অক্টোবর মাস থেকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে এবং সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ওপর ইসরাইলি বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত ধর্ষণ এবং অন্যান্য নানা ধরনের ভয়াবহ যৌন সহিংসতার একাধিক সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আন্তর্জাতিক মহলে উত্থাপিত হতে থাকে। বিশ্বের স্বনামধন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং ‘মিডল ইস্ট আই’-এর মতো প্রভাবশালী বহু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এসব অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে বেশ কিছু গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো যৌন নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র এবং নথিপত্র অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক মহলে এসব প্রতিবেদন নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ও তোলপাড় সৃষ্টি হওয়ার পরই জাতিসংঘ বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেয় এবং পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে শেষ পর্যন্ত এই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণে বাধ্য হয়।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে ‘দ্য জেরুজালেম পোস্ট’ পত্রিকাই সর্বপ্রথম ইসরাইলের এই কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার চাঞ্চল্যকর খবরটি বিশ্বের সামনে প্রকাশ করে। পত্রিকাটির বিস্তারিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, ২০২৬ সালের জন্য প্রণীত জাতিসংঘের এই চূড়ান্ত কালো তালিকায় সুনির্দিষ্টভাবে ইসরাইলি কারা কর্তৃপক্ষ বা ইসরাইলি প্রিজন সার্ভিস (আইপিএস)-কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর কারাগারে চলা অমানবিক নির্যাতন এবং যৌন সহিংসতার অভিযোগের প্রেক্ষিতেই মূলত আইপিএস-কে এই তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বিষয়টি এখানেই শেষ নয়; জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, কেবল আইপিএস নয়, বরং ইসরাইলের অন্যান্য সরকারি ও সামরিক সংস্থাগুলোকেও ভবিষ্যতের সম্ভাব্য কালো তালিকাভুক্তির জন্য অত্যন্ত কঠোর নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে। এর অর্থ হলো, আগামী দিনে ইসরাইলের অন্যান্য বাহিনী বা সংস্থাগুলোও জাতিসংঘের এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়তে পারে, যদি তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়া যায়।
সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের বিরুদ্ধে নিজের ক্ষোভ উগরে দিয়ে রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন বলেন, এই তালিকাভুক্তির মাধ্যমে জাতিসংঘ মহাসচিব মূলত একটি রাষ্ট্রকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সমকক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপ ও ক্ষোভের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, এই সিদ্ধান্তের ফলে ইসরাইলকে এখন আনুষ্ঠানিকভাবে হামাস, আইএসআইএস (ইসলামিক স্টেট) এবং বিশ্বের অন্যান্য সবচেয়ে জঘন্য ও নিষ্ঠুর সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সঙ্গে একই তালিকায় স্থান দেওয়া হলো। ড্যানন দাবি করেন, একটি রাষ্ট্রকে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সঙ্গে এক কাতারে ফেলে জাতিসংঘ তার নিজস্ব সীমারেখা ও নিরপেক্ষতার জায়গা অতিক্রম করেছে। তিনি এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে জাতিসংঘের ‘অবশিষ্ট বিশ্বস্ততার পূর্ণ পতন’ হিসেবে বর্ণনা করেন। একই সঙ্গে তিনি এটিকে জাতিসংঘের চরম ‘নৈতিক অবমাননা’ ও স্খলন বলেও অভিহিত করেন, যা সংস্থাটির মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক বলে তিনি মন্তব্য করেন।
প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ্য, ইসরাইলকে যে তালিকাটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, সেটি মূলত সংঘাত-সম্পর্কিত যৌন সহিংসতা বা কনফ্লিক্ট-রিলেটেড সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স (সিআরএসভি) নিয়ে প্রণীত জাতিসংঘ মহাসচিবের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক প্রতিবেদনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বৈশ্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে এই প্রতিবেদনটিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও তাৎপর্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই বিশেষ তালিকার মূল উদ্দেশ্য হলো, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান সশস্ত্র সংঘাতের সময় নিরীহ মানুষের ওপর যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ধর্ষণ এবং অন্যান্য গুরুতর যৌন সহিংসতা ঘটানোর সঙ্গে জড়িত বা সন্দেহভাজন রাষ্ট্র ও অরাষ্ট্রীয় পক্ষগুলোকে আন্তর্জাতিকভাবে চিহ্নিত করা। এর মাধ্যমে সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে বাধ্য করা এবং জবাবদিহিতার আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়। ইসরাইলকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে জাতিসংঘ মূলত এই বার্তাই দিল যে, সংঘাতে জড়িত কোনো পক্ষই জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নয়।