সভ্যতার চরম শিখরে আজ মানবজাতি বসবাস করছে। একদিকে আমরা মহাকাশে অত্যাধুনিক কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠাচ্ছি, মঙ্গল গ্রহে মানুষের বসতি গড়ার স্বপ্ন দেখছি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে জীবনের প্রতিটি জটিল হিসাব-নিকাশ মুহূর্তের মধ্যে সমাধান করছি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতিতে মানুষের আয়ু বেড়েছে, প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পৃথিবী পরিণত হয়েছে একটি ছোট গ্লোবাল ভিলেজে। অন্যদিকে, ঠিক একই সময়ে এই আধুনিক পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ জানে না তাদের আগামী বেলার আহার আদৌ জুটবে কি না। এটি আধুনিক মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় এবং নির্মম একটি বৈপরীত্য। নোবেলজয়ী খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের সেই বিখ্যাত ও কালজয়ী তত্ত্বটি আজ বড় বেশি প্রাসঙ্গিক—দুর্ভিক্ষ কখনোই খাদ্যের চরম অভাবের কারণে ঘটে না, বরং এটি ঘটে খাদ্যের অসম ও ত্রুটিপূর্ণ বণ্টনের কারণে। আধুনিক পৃথিবীর চারপাশের বাস্তবতার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকালে এই তত্ত্বের নির্মম সত্যতা সহজেই উপলব্ধি করা যায়। পৃথিবীতে বর্তমানে যে পরিমাণ খাদ্য উৎপাদিত হয়, তা বর্তমান বৈশ্বিক জনসংখ্যার সার্বিক চাহিদা মেটানোর পরও অর্ধেকের বেশি উদ্বৃত্ত থাকার কথা। অথচ ক্ষুধার যন্ত্রণায় ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর হার কোনোভাবেই কমছে না। একদল মানুষ যখন বেঁচে থাকার জন্য এক টুকরো রুটির সন্ধানে আবর্জনার স্তূপে হাহাকার করছে, তখন অন্য একদল বিত্তবান মানুষ অতিরিক্ত ক্যালরি পুড়িয়ে ওজন কমানোর জন্য লাখ লাখ টাকা ব্যয় করছে। এই চরম বৈষম্যের পৃথিবীতে আসলে খাদ্যের কোনো অভাব নেই, অভাব রয়েছে কেবল মানুষের মানবিকতা এবং সুষম বণ্টন ব্যবস্থার।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে রীতিমতো শিউরে উঠতে হয়। পৃথিবীতে খাদ্য উৎপাদন নিয়ে কোনো সংকট নেই, বরং সবচেয়ে বড় সংকট হলো সেই উৎপাদিত খাদ্যের পাহাড়সম অপচয় নিয়ে। তথ্যমতে, ২০২৫ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী প্রায় ১১২ কোটি টন খাবার স্রেফ ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়েছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর বড় বড় সুপারশপ, বিলাসবহুল রেস্তোরাঁ এবং বিয়ের মতো জমকালো সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে প্রতিদিন হাজার হাজার টন সতেজ ও পুষ্টিকর খাবার নষ্ট করা হয়। খাদ্য অপচয়ের এই লজ্জাজনক বৈশ্বিক তালিকায় সবার শীর্ষে অবস্থান করছে অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীন, যারা বছরে প্রায় ১০৯ মিলিয়ন টনেরও বেশি খাবার আবর্জনায় ফেলে দেয়। এর ঠিক পরেই রয়েছে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মতো জনবহুল রাষ্ট্র, যাদের নিজেদের ভূখণ্ডেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় একটি দরিদ্র জনগোষ্ঠী প্রতিদিন না খেয়ে ঘুমাতে যায়।
মাথাপিছু খাদ্য অপচয়ের হিসাবটি আরও বেশি বিস্ময়কর ও হতাশাজনক। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে মাথাপিছু খাদ্য অপচয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে পর্যটন নির্ভর দেশ মালদ্বীপ। দেশটিতে একজন মানুষ বছরে গড়ে প্রায় ২০৭ কেজি খাবার নষ্ট করে থাকেন। আমাদের বাংলাদেশের চিত্রটিও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। এখানেও একজন মানুষ বছরে গড়ে ৬৫ কেজি খাবার ডাস্টবিনে ফেলেন। নেপালে এই অপচয়ের পরিমাণ ৯৩ কেজি এবং পাকিস্তানে তা ১৩০ কেজি। পরিসংখ্যানগুলো দেখলে মনে হয়, বিশ্বজুড়ে যেন খাবার নষ্ট করার এক অলিখিত ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। এই বিপুল পরিমাণ অপচয় করা খাবার যদি সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও বণ্টন করা যেত, তবে পৃথিবীর একজন মানুষকেও হয়তো ক্ষুধার জ্বালায় প্রাণ হারাতে হতো না।
পৃথিবীতে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় এবং প্রত্যক্ষ কারণ হলো যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাত। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের মোট ক্ষুধার্ত মানুষের প্রায় ৭০ শতাংশই এমন সব যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে বসবাস করে, যেখানে প্রতিদিন বারুদ আর রক্তের হোলিখেলা চলে। যুদ্ধ মানে কেবল দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি বা বোমাবর্ষণ নয়; যুদ্ধের প্রকৃত অর্থ হলো কৃষকের স্বপ্নের সোনালি ফসলের মাঠ পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া, খাদ্য সরবরাহের প্রধান সড়কগুলো অবরুদ্ধ থাকা এবং সাধারণ মানুষের কাছে ত্রাণবাহী ট্রাক পৌঁছাতে না দেওয়া। বর্তমান বিশ্বে গাজা এবং সুদানের অমানবিক পরিস্থিতি এর সবচেয়ে বড় ও নিকৃষ্ট উদাহরণ। এসব অঞ্চলে ক্ষুধাকে এখন আর কেবল পেটের সমস্যা হিসেবে দেখা হয় না, বরং এটিকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিপক্ষ শক্তিকে ভাতে মারার এই অমানবিক কৌশল আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে বড় মানবাধিকার লঙ্ঘন। গুলি করে মানুষ হত্যা করা যেমন চরম অপরাধ, ঠিক তেমনি ত্রাণের পথ আটকে সাধারণ মানুষকে না খাইয়ে মারাও সমতুল্য অপরাধ, শুধু পার্থক্য হলো দ্বিতীয়টিতে বুলেটের মতো কোনো শব্দ হয় না।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার চলমান প্রলয়ংকরী যুদ্ধ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আধুনিক বিশ্বের সংঘাত কেবল আর নির্দিষ্ট কোনো দেশের ভৌগোলিক সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকে না। ইউক্রেন ও রাশিয়া বিশ্ববাজারে গম, বার্লি, সূর্যমুখী তেল এবং রাসায়নিক সারের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে খাদ্যশস্যের সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। এর প্রভাব গিয়ে পড়েছে হাজার মাইল দূরের আফ্রিকার কোনো এক প্রান্তিক কৃষকের ওপর। সারের দাম রাতারাতি কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় সেই কৃষকের পক্ষে আর জমিতে ফসল ফলানো সম্ভব হয়নি। এভাবেই ভূ-রাজনীতির নোংরা খেলায় প্রতিনিয়ত বলি হচ্ছে তৃতীয় বিশ্বের সাধারণ মানুষ।
আধুনিক সভ্যতার মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন আজ বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তার জন্য এক বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এখন আর ষড়ঋতুর স্বাভাবিক চক্র দেখা যায় না। কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা কৃষকের ফসলের মাঠকে মরুভূমিতে পরিণত করছে, তো কোথাও আকস্মিক বন্যা ও প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় চোখের পলকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল। আফ্রিকার অনেক দেশ একসময় কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের চরম বৈরিতায় তাদের সেই অগ্রগতি আজ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। সবচেয়ে বড় পরিহাসের বিষয় হলো, যেসব উন্নত দেশ জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার মুনাফা লুটছে এবং পৃথিবীকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে, তারাই আবার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে দাঁড়িয়ে মানবতার বড় বড় বুলি আওড়ায়। প্রকৃতি যেন আজ মানুষের লোভের চরম প্রতিশোধ নিচ্ছে।
অন্যদিকে, চরম দারিদ্র্য এবং বৈশ্বিক বাজার ব্যবস্থার কাঠামোগত ত্রুটি ক্ষুধার এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। অর্থনীতিবিদরা বিষয়টিকে ‘অ্যাক্সেস’ বা ক্রয়ক্ষমতার সংকট হিসেবে আখ্যায়িত করেন। বাজারের দোকানে থরে থরে চাল, ডাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার সাজানো থাকলেও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের পকেটে তা কেনার মতো অর্থ থাকে না। পুঁজিপতি ও অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে গুদামে লাখ লাখ টন খাদ্য মজুত করে রাখে কেবল বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর জন্য। খাদ্য এখন আর মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার বা মানবাধিকার হিসেবে গণ্য হয় না, এটি পরিণত হয়েছে মুনাফা লোটার অন্যতম প্রধান পণ্যে। যার অর্থ আছে, সে খাবার পাবে; আর যার নেই, তাকে ক্ষুধার যন্ত্রণায় ধুঁকে মরতে হবে—এটাই যেন বর্তমান বাজার অর্থনীতির অলিখিত ও নিষ্ঠুর নিয়ম। এর সাথে যুক্ত হয়েছে দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা, যেখানে অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে খাবার পৌঁছানোই এক অসাধ্য সাধন।
বিশ্বজুড়ে এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও ক্ষুধার সংকট মোকাবিলার জন্য যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন, তা বৈশ্বিক অর্থনীতির বিশাল সাগরে এক বিন্দু জলের মতো। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি বা ডব্লিউএফপি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, প্রতি বছর মাত্র ৪০ বিলিয়ন ডলার অর্থ সঠিকভাবে বিনিয়োগ ও ব্যয় করতে পারলেই বৈশ্বিক ক্ষুধার এই অমানবিক সংকট পুরোপুরি মোকাবিলা করা সম্ভব। অঙ্কটি শুনতে অনেক বড় মনে হলেও, পৃথিবীর পরাশক্তিগুলোর বার্ষিক সামরিক বাজেটের তুলনায় এটি নিতান্তই নগণ্য। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের এক বছরের মোট সামরিক বাজেটের ৫ শতাংশেরও কম অর্থ দিয়ে পুরো পৃথিবীর ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে এক বছরের জন্য পর্যাপ্ত খাবার তুলে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু বিশ্বনেতারা আজ মানুষের মুখে ভাত তুলে দেওয়ার চেয়ে অস্ত্রের পেছনে, পারমাণবিক বোমার পেছনে এবং ধ্বংসের পেছনে অর্থ ব্যয় করতে অনেক বেশি আগ্রহী। কারণ যুদ্ধাস্ত্র বিক্রি করলে কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর বিলিয়ন ডলার মুনাফা হয়, আর ক্ষুধার্তকে ভাত দিলে রাজনৈতিক সমীকরণের কিছু ভোট ছাড়া আর কিছুই মেলে না। আন্তর্জাতিক সাহায্যও অনেক সময় রাজনীতির জালে আটকে যায়, যেন সাহায্য পাওয়ার জন্যও ক্ষুধার্ত মানুষের পকেটে সঠিক ভূ-রাজনৈতিক পাসপোর্ট থাকতে হয়।
অথচ এই বিশাল বৈশ্বিক সংকটের সমাধান আমাদের হাতের মুঠোয়ই রয়েছে। বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসে প্রান্তিক ও ছোট কৃষকদের হাড়ভাঙা খাটুনির মাধ্যমে। এই ছোট কৃষকদের যদি আধুনিক প্রযুক্তি, সহজ শর্তে ঋণ এবং জলবায়ু সহনশীল উন্নত জাতের বীজ দিয়ে সহায়তা করা যায়, তবে খাদ্য উৎপাদন বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। তাদের বাঁচানো মানেই মূলত বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তাকে বাঁচানো। টেকসই কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একতাবদ্ধ হয়ে খাদ্যকে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার এই জঘন্য প্রবণতা আইনিভাবে বন্ধ করতে হবে। বিশ্বনেতাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, ক্ষুধা কেবল একটি শারীরিক কষ্ট নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শারীরিক ও মানসিকভাবে পঙ্গু করে দেয়। ক্ষুধা মানুষের শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেয়, সমাজে অস্থিরতা ও অপরাধ বাড়ায় এবং ভবিষ্যতের সব সম্ভাবনাকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করে।
গণতন্ত্র, ভৌত কাঠামোর উন্নয়ন আর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বড় বড় সেমিনার একজন ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে সম্পূর্ণ অর্থহীন। তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্য হলো এক প্লেট ভাত। আধুনিক সভ্যতার প্রকৃত সাফল্য কতগুলো আকাশচুম্বী বিলাসবহুল ইমারত নির্মিত হলো কিংবা কতগুলো রোবট আবিষ্কৃত হলো, তার ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে দিনের শেষে কত কম মানুষ রাতে না খেয়ে ঘুমাতে গেল, তার ওপর। বিশ্বনেতাদের আজ সম্পদের পেছনে না ছুটে মানুষের মৌলিক চাহিদার অগ্রাধিকার বদলাতে হবে। কারণ ক্ষুধা কোনো একক দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, এটি সমগ্র মানবজাতির জন্য এক সম্মিলিত লজ্জা।
তথ্যসূত্র: দ্যা প্রেস ২৪