দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং অপরাধীদের দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ করতে সরকার এবার কঠোর এবং অভিনব এক কৌশল গ্রহণ করতে যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট শীর্ষ কর্তাদের ধারাবাহিক আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, পুরনো ও নতুন সব ধরনের সন্ত্রাসীদের সামাজিকভাবে এবং আর্থিকভাবে পঙ্গু করে দিতে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সাময়িক বা স্থায়ীভাবে ‘ব্লক’ করা হবে। শুধু তাই নয়, যেসব স্বজন অপরাধীদের এসব কাজে সহায়তা করবেন বা অবৈধ সম্পদের সুবিধাভোগী হবেন, তাদের এনআইডিও এই ব্লক প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হবে। এই নির্দেশনার ভিত্তিতে ইতিমধ্যে দেশজুড়ে পুলিশ সুপার ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা (ওসি) গোয়েন্দা সোর্সের মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের প্রোফাইল ও এনআইডির তথ্য সংগ্রহের কাজ পুরোদমে শুরু করেছেন।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, একজন অপরাধীর এনআইডি ব্লক করে দেওয়া হলে সেটি তার জন্য একটি বড় ধরনের ডিজিটাল ও সামাজিক শাস্তিতে পরিণত হবে। এনআইডি নিষ্ক্রিয় হয়ে গেলে ওই ব্যক্তি নতুন কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবেন না এবং বিদ্যমান অ্যাকাউন্টগুলোও অচল হয়ে পড়বে। পাসপোর্ট তৈরি বা নবায়নের পথ বন্ধ হয়ে যাবে, যার ফলে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া বা সেখানে অবস্থান করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। এছাড়া নিজের বা বেনামে কোনো জমি বা সম্পত্তি কেনাবেচা করে তা রেজিস্ট্রেশন করা বা মোবাইল সিম কেনা ও ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (যেমন- বিকাশ, নগদ) ব্যবহার করাও তাদের জন্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, বিগত সরকারের আমলে সুবিধাভোগী শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকেই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর আত্মগোপনে চলে গেছেন। তাদের এই শূন্যস্থান পূরণ করতে এখন উদীয়মান ও নতুন সন্ত্রাসীরা মাঠে নেমেছে এবং তারা চাঁদাবাজি, খুন, জমি দখল থেকে শুরু করে মাদক বাণিজ্যের মতো অপকর্মে নিজেদের যুক্ত করছে। পাশাপাশি পলাতক ও কারামুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরাও এই নতুনদের ব্যবহার করে অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনা বৈঠকে নতুন এবং বিশেষ করে ভাসমান অপরাধীদের দৌরাত্ম্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ঢাকার মহাখালী, জুরাইন, গোপীবাগের টিটিপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকার বস্তিগুলো এসব ভাসমান অপরাধীদের প্রধান আস্তানা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এরা এক স্থানে অপরাধ করে দ্রুত অন্য স্থানে পালিয়ে যায় বলে এদের ধরা পুলিশের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীসহ সারা দেশে অন্তত শতাধিক স্পটকে ভাসমান অপরাধের জোন হিসেবে চিহ্নিত করে সেখানে নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, কোনো সন্ত্রাসী বা তাদের আশ্রয়দাতাদের ছাড় দেওয়া হবে না এবং অপরাধীদের তালিকা প্রতিনিয়ত হালনাগাদ করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মিলে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করেছে, যারা শীর্ষ সন্ত্রাসী, অর্থ পাচারকারী এবং এদের গডফাদার বা রাঘববোয়ালদের তালিকা তৈরি করছে।
এই উদ্যোগের সবচেয়ে কঠোর দিক হলো, অপরাধীদের পাশাপাশি তাদের আত্মীয়দেরও ছাড় না দেওয়া। গোয়েন্দা রিপোর্টে উঠে এসেছে যে, বড় অপরাধীরা সাধারণত নিজেদের নামে সম্পদ রাখে না, বরং পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পত্তি কিনে বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তাদের অপরাধের অর্থ বৈধ করার চেষ্টা করে। যদি সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় যে, কোনো আত্মীয় অপরাধের টাকায় সুবিধা নিচ্ছেন বা সহায়তা করছেন, তবে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের এনআইডিও লক করে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের এক কর্তাব্যক্তি। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সন্ত্রাসীদের এনআইডি ব্লকের এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল এবং স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই বিশাল প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে পরিচালনা করতে নির্বাচন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক, পাসপোর্ট অধিদপ্তর এবং বিটিআরসির ডাটাবেজ একযোগে ব্যবহার করা হবে।
তবে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেজন্য স্থানীয় পুলিশ, জেলা প্রশাসন এবং কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে তিন স্তরের ভেরিফিকেশন বা যাচাই-বাছাই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু গ্রেপ্তার বা মামলা নয়, এনআইডি ব্লকের এই ডিজিটাল অস্ত্রই পারে অপরাধীদের আর্থিক মেরুদণ্ড পুরোপুরি ভেঙে দিতে।
তথ্যসূত্র: দেশ রূপান্তর