সাধারণত জুন মাস মানেই বাংলাদেশে বর্ষার আগমনী বার্তা। এই সময়ে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামবে, খাল-বিল কানায় কানায় পূর্ণ হবে এবং গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহ শেষে প্রকৃতিতে একটা স্নিগ্ধতা নেমে আসবে—এটাই আমাদের চিরচেনা আবহাওয়া। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম প্রভাবে প্রকৃতির সেই চিরায়ত রূপ এখন আর চোখে পড়ছে না। ভরা বর্ষা মৌসুমেও দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বৃষ্টির দেখা নেই, উল্টো ৪১টি জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে অস্বস্তিকর মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার তাপপ্রবাহ। আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, আগামী আগস্ট মাস পর্যন্ত স্বাভাবিকের চেয়ে বৃষ্টিপাত কম হতে পারে এবং এর ফলে দেশজুড়ে একাধিক তাপপ্রবাহ বা হিটওয়েভের সৃষ্টি হতে পারে।
আবহাওয়ার এই খামখেয়ালি আচরণের প্রধান কারণ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর ফলে ঋতুচক্রের স্বাভাবিক আচরণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশের ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের অধিকাংশ জেলাসহ মোট ৪১টি জেলায় গরমের তীব্রতা বিরাজ করছে। যদিও শুক্রবার নাগাদ তাপমাত্রা সামান্য কমার একটি পূর্বাভাস রয়েছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এই অস্বস্তিকর গরম থেকে সহসাই মুক্তির কোনো সুখবর নেই।
আবহাওয়াবিদ ড. মো. বজলুর রশিদ জানিয়েছেন, দেশের বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আগের বছরগুলোতে মার্চ-এপ্রিল মাসে যে পরিমাণ গরম বা তাপপ্রবাহ দেখা যেত, এবার তা ছিল না। উল্টো এপ্রিলে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৬ শতাংশ এবং মে মাসে প্রায় ৭ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রাক-বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টি হলেও, মূল বর্ষা মৌসুমে (জুন থেকে আগস্ট) এখন বৃষ্টির চরম ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। টানা কয়েকদিন বৃষ্টি না হলেই তাপমাত্রা হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, চলতি জুন মাসেই আরও অন্তত তিন থেকে চারটি হিটওয়েভ আঘাত হানতে পারে এবং এই ধারা জুলাই-আগস্টেও অব্যাহত থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছে শহরাঞ্চলের মানুষ। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যত্রতত্র কংক্রিটের বহুতল ভবন নির্মাণ এবং পর্যাপ্ত গাছপালার অভাবে শহরগুলো এখন একেকটি ‘হিট আইল্যান্ডে’ পরিণত হয়েছে। ফলে দিনের বেলায় যে পরিমাণ গরম অনুভূত হয়, রাতের বেলাতেও ইট-পাথরের ভবনগুলো তাপ ধরে রাখায় সেই গরমের রেশ কাটতে চায় না।
এদিকে, এই বিরূপ আবহাওয়ার কারণে জনস্বাস্থ্যে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত গরমের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে হিট স্ট্রোক, তীব্র পানিশূন্যতা এবং মাথা ঘোরার মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ পরামর্শ দিয়েছেন, একান্ত প্রয়োজন ছাড়া তীব্র রোদে বাইরে বের না হওয়াই উত্তম। বাইরে বের হলে অবশ্যই ছাতা ব্যবহার করতে হবে এবং প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। ঘামের কারণে শরীর থেকে লবণ বেরিয়ে যায় বলে পানির সাথে সামান্য লবণ বা খাওয়ার স্যালাইন মিশিয়ে পান করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এছাড়া রাস্তার পাশের খোলা শরবত বা জুস পান করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে, কারণ এগুলো ডায়রিয়া বা পেটের অন্যান্য পীড়া সৃষ্টি করতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের মানদণ্ড অনুযায়ী, তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে তাকে মৃদু তাপপ্রবাহ বলা হয়। এছাড়া ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রিকে মাঝারি, ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রিকে তীব্র এবং ৪২ ডিগ্রির ওপরে উঠলে তাকে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ হিসেবে গণ্য করা হয়। সবশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাব অনুযায়ী, নীলফামারীর সৈয়দপুরে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর সর্বনিম্ন ছিল সিলেটে ২৩.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রকৃতির এই চরমভাবাপন্ন আচরণ মোকাবিলায় এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ও সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।