• শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ০৭:৪৩ অপরাহ্ন
Headline

লাভজনক এনসিটি বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দিতে তোড়জোড়

Reporter Name / ৭ Time View
Update : শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের সবচেয়ে লাভজনক নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব দুবাইভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-এর হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে সরকারের ভেতরে বড় ধরনের নীতিগত সংশয় ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। এই দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে (চবক) একটি কড়া আলটিমেটাম দিয়েছে। গত ৪ জুন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়েছে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চলমান আলোচনা হয় দ্রুত চূড়ান্ত করতে হবে, অন্যথায় পুরো চুক্তি প্রক্রিয়া অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে নির্মিত এবং বর্তমানে রেকর্ড পরিমাণ মুনাফায় থাকা এই টার্মিনালটি বিদেশী অপারেটরের কাছে ১৫ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে বন্দর সংশ্লিষ্টদের মাঝেই এখন নানা প্রশ্ন উঠছে।

মন্ত্রণালয়ের আলটিমেটাম ও আইনি সমীকরণ

নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন-১ অধিশাখা থেকে পাঠানো এই নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, পিপিপি (পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ) এবং জিটুজি (গভর্নমেন্ট টু গভর্মেন্ট) ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে আলোচনা অনির্দিষ্টকাল ঝুলিয়ে রাখা যাবে না। এর আগে গত ১৮ মে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এই প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে ministry বা মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠি দিয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে সিনিয়র সহকারী সচিব ফারজানা হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠিতে দ্রুত নিষ্পত্তির তাগিদ দেওয়া হয়।

পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ আইন ২০১৫ এবং জিটুজি পার্টনারশিপ নীতিমালা ২০১৭ অনুযায়ী এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর আগে বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি মূল্যায়ন কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিলে পিপিপি কর্তৃপক্ষ জানায়, জিটুজি প্রকল্পের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্রের মূল্যায়ন কমিটির বিধান প্রযোজ্য নয়। গত বছরের ৪ এপ্রিল দুই পক্ষের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) অনুচ্ছেদ ৪.৬ অনুযায়ী, যেকোনো পক্ষ চাইলে যেকোনো সময় এই আলোচনা থেকে সম্পূর্ণ সরে আসতে পারবে। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পুরো চাপ এখন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ওপর এসে পড়েছে।

দুবাইতে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও নতুন শর্তাবলী

চলতি বছরের ৮ এপ্রিল দুবাইতে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের প্ল্যাটফর্ম সভায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষ থেকে বেশ কিছু নতুন শর্ত ও পর্যালোচনার দাবি তোলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এনসিটি পরিচালনার ক্ষেত্রে এর প্রকৃত রাজস্ব, সার্বিক ব্যয় এবং বর্তমান জনবল কাঠামোর বিষয়ে আরও বেশি স্বচ্ছতা দাবি করেছে। একই সাথে, প্রস্তাবিত ১৫ বছরের কনসেশন (ইজারা) মেয়াদ পুনর্বিবেচনা এবং টার্মিনালের আধুনিকায়নে তাদের সম্ভাব্য বিনিয়োগের সুরক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।

এই সভায় বাংলাদেশের পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এবং ডিপি ওয়ার্ল্ড গ্রুপের প্রধান নির্বাহী যুবরাজ নারায়ণসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে, আরএফপির (রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল) নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যেই এই দরকষাকষি শেষ করতে হবে এবং প্রয়োজনে ডিপি ওয়ার্ল্ড একটি সংশোধিত প্রস্তাব জমা দেবে। উল্লেখ্য, প্রায় সাত বছর আগে ডিপি ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশে ১ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছিল, যা তারা এখন আরও সম্প্রসারিত করতে চায়।

নৌবাহিনীর অধীনে এনসিটির রেকর্ড সাফল্য

can বিদেশী অপারেটরের হাতে এনসিটি তুলে দেওয়ার এই আলোচনা যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই টার্মিনালটি পরিচালনায় একের পর এক সাফল্যের নতুন রেকর্ড গড়ছে দেশীয় ব্যবস্থাপনা। সদ্যসমাপ্ত মে মাসে এনসিটিতে মোট ১ লাখ ২৬ হাজার ৪৯৬ টিইইউ (টুয়েন্টি ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট) কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা এই টার্মিনালের ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড। এর আগে গত ২০২৫ সালের অক্টোবরে ১ লাখ ২৫ হাজার ৫ดูก৩ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের রেকর্ড হয়েছিল, যা এবার ভেঙে গেছে। বর্তমানে দৈনিক গড়ে ৪ হাজার ৮১ টিইইউ কনটেইনার সফলভাবে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে।

২০০৭ সালে আংশিক এবং ২০১৫ সালে পুরোদমে চালু হওয়া এই টার্মিনালটি দেশের সবচেয়ে বড় রাজস্বের উৎস। ২০২৩ সাল পর্যন্ত সাইফ পাওয়ারটেক এটি পরিচালনা করলেও, গত বছরের ৭ জুলাই থেকে এর দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান ‘চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেড’। তাদের অধীনে টার্মিনালটির কর্মদক্ষতা ও রাজস্ব আয় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর সচিব সৈয়দ রেফায়াত হামিম জানান, আধুনিক ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনা ও দ্রুত জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানামার কারণে এই ঐতিহাসিক অর্জন সম্ভব হয়েছে, যা দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।

স্বার্থের সংঘাত ও বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় টাকায় নির্মিত এবং বর্তমানে দেশের সবচেয়ে লাভজনক একটি সচল অবকাঠামোকে কেন বিদেশী প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন বন্দর বিশেষজ্ঞরা। এই প্রকল্পের মূল সিদ্ধান্তটি নিয়েছিল ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৩ সালের মার্চ মাসে। চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক পর্ষদ সদস্য মো. জাফর আলম এই বিষয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, যেসব ‘গ্রিনফিল্ড’ বা নতুন প্রকল্পে সরকারের কোনো নিজস্ব বিনিয়োগ নেই, সেখানে আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত করা অত্যন্ত যৌক্তিক। কিন্তু এনসিটির মতো একটি ‘ব্রাউনফিল্ড’ বা তৈরি প্রজেক্ট, যা বর্তমানে নৌবাহিনীর অধীনে দেশীয় সক্ষমতায় সর্বোচ্চ লাভজনকভাবে চলছে এবং যার শতভাগ রাজস্ব দেশের ভেতরেই থাকছে, সেটি দীর্ঘমেয়াদে বিদেশী কোম্পানির হাতে ছেড়ে দেওয়া কতটা দেশের স্বার্থের পক্ষে যাবে—তা নিয়ে পুনরায় ভাবার অবকাশ রয়েছে।

নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমও সম্প্রতি বন্দর পরিদর্শনে এসে স্বীকার করেছেন যে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবে যেমন ইতিবাচক সম্ভাবনা রয়েছে, ঠিক তেমনি কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে, যার জন্য অত্যন্ত সতর্ক পর্যালোচনার প্রয়োজন। এখন দেখার বিষয়, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের এই প্রধান টার্মিনালটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জাতীয় স্বার্থকে কতখানি প্রাধান্য দেয়।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category