পারিবারিক পরিমণ্ডলে বা নিজেদের আত্মীয়দের মধ্যে (যেমন: চাচাতো, মামাতো, খালাতো ও ফুফাতো ভাই-বোন) বিয়ে বা ‘কনসাংগুইনিটি’ (Consanguinity) বিশ্বের অনেক সমাজেই একটি দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক চর্চা। তবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও জিনতত্ত্বের (Genetics) নানামুখী গবেষণা এই প্রথার পেছনে থাকা মারাত্মক কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকিকে ক্রমাগত সামনে নিয়ে আসছে। রক্ত সম্পর্কিত বাবা-মায়ের কারণে সন্তানের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার সবচেয়ে সুস্পষ্ট কারণ হলো অবনতিমূলক জিনগত ব্যাধি (Recessive Genetic Disorders), যার মধ্যে অন্যতম হলো সিস্টিক ফাইব্রোসিস বা সিকেল সেল অ্যানিমিয়া।
জীববিজ্ঞানী গ্রেগর মেন্ডেলের জিনতত্ত্বের সূত্র অনুযায়ী, প্রতিটি মানুষের শরীরে প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের জন্য দুটি জিন থাকে। যখন কোনো ব্যক্তি একটি ত্রুটিপূর্ণ জিন বহন করেন কিন্তু নিজে সুস্থ থাকেন, তাকে ‘ক্যারিয়ার’ বা বাহক বলা হয়। যদি কোনো কারণে সন্তানের বাবা ও মা উভয়েই একই ধরনের অবনতিমূলক বা ত্রুটিপূর্ণ জিন বহন করেন, তবে মেন্ডেলের নিয়ম অনুযায়ী তাদের সন্তানের সেই নির্দিষ্ট বংশগত রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ২৫ শতাংশ বা এক-চতুর্থাংশ থাকে। যেহেতু চাচাতো বা খালাতো ভাই-বোনদের সাধারণ পূর্বপুরুষ (যেমন: দাদা-দাদি বা নানা-নানি) একই হয়ে থাকেন, তাই তাদের ডিএনএ (DNA) এবং ত্রুটিপূর্ণ জিন ভাগাভাগি করার সম্ভাবনা সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রথম সারির চাচাতো ভাই-বোনের সন্তানের অবনতিমূলক রোগে আক্রান্ত হওয়ার জন্মগত ঝুঁকি প্রায় ৬ শতাংশ, যা কোনো আত্মীয়তা নেই এমন সাধারণ দম্পতির ক্ষেত্রে মাত্র ৩ শতাংশ।
যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডফোর্ড শহরে ২০০৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া ১৩ হাজারের বেশি নবজাতকের ওপর পরিচালিত ‘বর্ন ইন ব্র্যাডফোর্ড’ (Born in Bradford) নামক বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ চিকিৎসা গবেষণাটি এই জিনগত প্রভাবের পরিধিকে আরও বিস্তৃতভাবে প্রমাণ করেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের শৈশব, কৈশোর এবং প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার ধাপগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে যে, প্রতি ছয়জন শিশুর মধ্যে একজনের বাবা-মা নিজেদের খালাতো বা চাচাতো ভাই-বোন (যাদের বেশিরভাগই পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত)।
গবেষকরা কেবল নির্দিষ্ট থ্যালাসেমিয়া বা সিকেল সেলের মতো রোগই নয়, বরং শিশুদের ভাষা ও বাকশক্তির বিকাশ, স্কুলের ফলাফল এবং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার হারের ওপর একটি গাণিতিক মডেল (Mathematical Model) ব্যবহার করে গবেষণা চালিয়েছেন। যেখানে পরিবারগুলোর চরম দারিদ্র্য ও বাবা-মায়ের শিক্ষার অভাবের মতো প্রভাবগুলোকে গাণিতিকভাবে বাদ দেওয়ার পরও কাজিনদের সন্তানদের ক্ষেত্রে নিচের চমকপ্রদ ও উদ্বেগজনক তথ্যগুলো উঠে এসেছে:
বাক ও ভাষাগত সমস্যা: দারিদ্র্য নিয়ন্ত্রণ করার পরও দেখা গেছে, রক্ত সম্পর্কিত বাবা-মায়ের সন্তানদের কথা বলা ও ভাষার বিকাশে সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি ১১ শতাংশ, যেখানে সম্পর্কহীন বাবা-মায়ের সন্তানদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৭ শতাংশ।
সরকারি মূল্যায়ন (ভালো পর্যায়): ইংল্যান্ডের সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ৫ বছর বয়সী শিশুদের ‘ভালো পর্যায়ের বিকাশ’ (Good Level of Development) অর্জনের একটি পরীক্ষা নেওয়া হয়। আত্মীয়হীন বাবা-মায়ের সন্তানদের ক্ষেত্রে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার ৬৪ শতাংশ হলেও, কাজিনদের সন্তানদের ক্ষেত্রে তা কমে ৫৪ শতাংশে নেমে আসে।
চিকিৎসক বা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ: কোনো সুনির্দিষ্ট জেনেটিক রোগ নেই এমন কাজিনদের সন্তানেরাও বছরে গড়ে চারবার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য চিকিৎসকের কাছে যান, যা সাধারণ দম্পতির সন্তানদের (বছরে গড়ে ৩ বার) তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি।
গবেষণার প্রধান লেখক অধ্যাপক নিল স্মল বলেন, “কোনো নির্দিষ্ট রোগ না থাকার পরও কনসাংগুইনাস বা রক্ত সম্পর্কীয় শিশুদের মধ্যে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের এই বিস্তৃত প্রবণতা প্রমাণ করে যে, এই জিনগত দুর্বলতা সামগ্রিক ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকেও প্রভাবিত করে।”
ব্র্যাডফোর্ড টিচিংস হাসপাতালের পরামর্শক নিওনেটোলজিস্ট ও গবেষক অধ্যাপক স্যাম ওডি দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করতে গিয়ে বহু মারাত্মক ত্বকের রোগ, মস্তিষ্কজনিত বিকলাঙ্গতা ও পেশিজনিত রোগ পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁর মতে, শুধু কাজিনদের বিয়েই নয়, এর পেছনে ‘এন্ডোগ্যামি’ (Endogamy) বা স্বগোত্রীয় বিবাহ প্রথাও একটি বড় কারণ। এন্ডোগ্যামি হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে মানুষ সাধারণত নিজেদের বংশ, জাতি বা একটি নির্দিষ্ট ছোট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বাইরে বিয়ে করে না (যেমন: বিশ্বব্যাপী আমিশ সম্প্রদায়, কিছু ইহুদি গোষ্ঠী এবং দক্ষিণ এশীয় সমাজ)।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে উঠলে, তাদের অজান্তেই সাধারণ পূর্বপুরুষদের একই ধরনের ক্ষতিকর জিন পুরো কমিউনিটির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে সরাসরি চাচাতো ভাই-বোন না হলেও, একই গোত্রের অপরিচিত দুজনের বিয়ের মাধ্যমেও ওই ক্ষতিগ্রস্ত জিনটি সন্তানের শরীরে সুপ্ত থেকে প্রকাশ্য বা প্রকট (Dominant) হয়ে উঠতে পারে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই প্রথা চলতে থাকলে এর স্বাস্থ্যগত নেতিবাচক প্রভাব আরও সমষ্টিগত, জটিল ও ক্রমবর্ধমান হতে থাকে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে শিশুদের হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, মস্তিষ্ক ও কিডনির গুরুতর জন্মগত ত্রুটি এবং শিশুমৃত্যুর উচ্চ হার দেখা যায়।
শিশুদের এই মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার (যেমন যুক্তরাজ্যের NHS) ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপের কথা বিবেচনা করে ইউরোপের নীতিনির্ধারকেরা এখন নড়েচড়ে বসেছেন। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দুটি দেশ ইতোমধ্যে কাজিনদের মধ্যে বিয়েকে আইনিভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে:
নরওয়ে ও সুইডেন: নরওয়েতে গত বছরই চাচাতো ভাই-বোনের বিয়েকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং সুইডেনও আগামী বছর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে যাচ্ছে।
যুক্তরাজ্য: কনজারভেটিভ পার্টির পার্লামেন্ট সদস্য রিচার্ড হোল্ডেন ব্রিটিশ সংসদে চাচাতো ভাই-বোনের বিয়ে নিষিদ্ধ করার জন্য একটি ব্যক্তিগত বিল উত্থাপন করেছেন। তবে বর্তমান লেবার সরকার এখনই কোনো নিষেধাজ্ঞা না চাপিয়ে ‘জেনেটিক কাউন্সেলিং’ (Genetic Counselling) নীতির ওপর জোর দিচ্ছে, যেখানে গর্ভাবস্থায় বিশেষ স্ক্রিনিং বা পরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া হয়।
আইনি নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি শিক্ষার শক্তি যে কতটা কার্যকর, তা বর্ন ইন ব্র্যাডফোর্ড প্রকল্পের প্রধান গবেষক অধ্যাপক জন রাইটের দেওয়া তথ্যে স্পষ্ট। সঠিক সচেতনতা প্রচারের ফলে ব্র্যাডফোর্ডের পাকিস্তানি মায়েদের মধ্যে কাজিনদের বিয়ের হার ২০০০-এর দশকের ৩৯ শতাংশ থেকে কমে গত দশকের শেষে ২৭ শতাংশে নেমে এসেছে। কঠোর আইনের মাধ্যমে সমাজকে বাধ্য করার চেয়ে তরুণ প্রজন্মকে জিনের এই অদৃশ্য বিজ্ঞান ও ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করে তোলাই এই জন্মগত ব্যাধি থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার সবচেয়ে কার্যকর ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়।