• বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬, ১১:৫৪ অপরাহ্ন

প্রস্তাবিত বাজেটে যেসব পণ্যের দাম বাড়ছে

Reporter Name / ৪ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে দেশীয় শিল্পের বিকাশ, জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহারকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন পণ্যের ওপর শুল্ক ও কর বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর উত্থাপিত এই বাজেটে মূলত আমদানিনির্ভর ও বিলাসবহুল পণ্যগুলোর ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তার পকেটে। দেশীয় শিল্পকে বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতা থেকে সুরক্ষা দেওয়া এবং স্থানীয় উৎপাদনকারীদের উৎসাহিত করার জন্য এই শুল্ক প্রতিরক্ষণ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। তবে এর ফলে শুল্কায়নের তালিকায় থাকা নির্দিষ্ট পণ্যগুলোর আমদানি খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, যা সামগ্রিকভাবে খুচরা বাজারে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে এবং মধ্যবিত্তের ব্যয়ের পরিধিকে প্রভাবিত করবে।

খাদ্য ও কৃষি খাতের প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে নতুন বাজেটে বেশ কিছু জনপ্রিয় খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে আমদানিকৃত কাজুবাদামের বাজার সরাসরি বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকিতে পড়ছে। দেশীয় চাষাবাদ ও প্রক্রিয়াজাত শিল্পকে শক্তিশালী ভিত্তি দিতে অপ্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের আমদানি শুল্ক বিদ্যমান ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একইভাবে প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের আমদানি শুল্কও ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া দেশীয় মৎস্য চাষকে টিকিয়ে রাখতে বিদেশ থেকে আমদানি করা পাঙাশ মাছের ফিলেটের ওপর নতুন করে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সাথে খাদ্য, ওষুধ ও পোশাক শিল্পে ও বিভিন্ন খাতে বহুল ব্যবহৃত মেইজ স্টার্চ বা ভুট্টা দানার আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ হিসেবে এবং ধূমপান নিরুৎসাহিত করতে বরাবরের মতোই প্রস্তাবিত বাজেটে তামাকজাত পণ্যের ওপর বড় অঙ্কের করভার চাপানো হয়েছে। এবার সব স্তরের সিগারেটের ন্যূনতম খুচরা মূল্য ও শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নতুন মূল্য স্তর অনুযায়ী নিম্নস্তরের প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২ টাকা, মধ্যম স্তরে ৯২ টাকা, উচ্চ স্তরে ১৬০ টাকা এবং অতি উচ্চ স্তরের জন্য ২১০ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এর বাইরে আধুনিক তরুণদের মধ্যে প্রচলিত বিকল্প তামাকজাত পণ্য যেমন নিকোটিন পাউচ আমদানিতে খুচরা পর্যায়ে ৪০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং হিটেড টোব্যাকো পণ্যের ওপর ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপের ফলে ধূমপায়ীদের খরচ যেমন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে, তেমনি বাজারে সব ধরনের তামাক ও নিকোটিনযুক্ত বিকল্প পণ্যের সরবরাহ ও ক্রয়ক্ষমতা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে।

পরিবহন ও বিলাসবহুল গৃহস্থালি ইলেকট্রনিক্স পণ্যের ক্ষেত্রেও নতুন বাজেটের ধাক্কা বেশ ভালোভাবেই লাগবে। পরিবেশ দূষণ হ্রাসের বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে মধ্যম সারির তথা ১২০০ থেকে ১৬০০ সিসি ক্ষমতার ইন্টারনাল কম্বাশন ইঞ্জিন বা পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলচালিত গাড়ির মোট করভার বিদ্যমান ১৩২.৩৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫৫.৮৮ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে থাকা এই গাড়িগুলোর দাম বাজারে অনেক বেড়ে যাবে। অন্যদিকে স্থানীয় ইলেকট্রনিক্স শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত সব ধরনের হাউজহোল্ড বা গৃহস্থালি ওয়াশিং মেশিনের ওপর নতুন করে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও দেশীয় মোটর উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে ১২০০ ওয়াটের কম ক্ষমতাসম্পন্ন বিদেশি ডিসি মোটর আমদানির ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ভারী শিল্প, নির্মাণ খাত এবং বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম খাতের সুরক্ষায় এবারের বাজেটে ব্যাপক শুল্ক পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা ১ কেভিএ ক্ষমতা সম্পন্ন ট্রান্সফরমার শিল্পকে শক্তিশালী করতে এই ক্ষমতার বিদেশি ট্রান্সফরমার আমদানির শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার পাশাপাশি নতুন করে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক বসানো হচ্ছে। এছাড়া আবাসন খাতে ব্যবহৃত জিপসাম বোর্ড এবং শিট আমদানিতে ২০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। শিল্পে ব্যবহৃত কপার টিউব আমদানির শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ এবং কপারের তার আমদানিতে নতুন করে ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সাথে কোল্ড-রোল্ড কয়েল ও শিট আমদানিতে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক এবং প্লাস্টিক শিল্পের কাঁচামাল পিভিসি ও পিইটি রেজিনের আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

কাগজ শিল্প ও দেশীয় বাইসাইকেল উৎপাদনকারী খাতের সুরক্ষায় প্রস্তাবিত বাজেটে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। বিদেশি গ্রিজপ্রুফ পেপার এবং গ্লাসিন পেপারের আমদানি শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার পাশাপাশি অতিরিক্ত ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় বাইসাইকেল শিল্পের প্রতিরক্ষণে সাইকেলের যন্ত্রাংশ ‘ফ্রি হুইল’ আমদানির শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করার এবং এর সাথে নতুন করে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক যোগ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি পোশাক খাতের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার আমদানিতে নতুন করে ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেট দেশীয় শিল্পায়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখলেও তাৎক্ষণিকভাবে বাজারে আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়িয়ে সাধারণ ক্রেতাদের জীবনযাত্রার খরচ বাড়িয়ে দেবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category