পাবনার পদ্মাপারের দেশের একমাত্র রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে মূল চালিকাশক্তির চূড়ান্ত প্রস্তুতি ও যান্ত্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজটি এখন শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। আগামী মাসের মধ্যেই এই মেগা প্রকল্প থেকে প্রথম দফায় পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরাসরি জাতীয় সঞ্চালন লাইনে যুক্ত করার জোর প্রস্তুতি পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে বাণিজ্যিক বা পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় যাওয়ার আগে বাস্তবায়িত প্রতিটি ধাপের কারিগরি ফলাফল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করবে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। তাদের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পাওয়ার পরেই চুল্লির মূল কার্যক্রম পরিচালনা করার সবুজ সংকেত মিলবে, যা দেশের জ্বালানি খাতের জন্য এক বিশাল মাইলফলক হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
মন্ত্রণালয় ও প্রকল্প পরিচালনাকারী সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ইউনিটের মূল চুল্লিপাত্রে পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম লোডিং করার জটিল এবং স্পর্শকাতর কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যালোচনার অধীনে থাকা যান্ত্রিক পরীক্ষাগুলোতে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেলে চুল্লির অভ্যন্তরে সুনিয়ন্ত্রিত নিউক্লিয়ার ফিশন বা বিভাজন বিক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করা হবে। এই পারমাণবিক বিক্রিয়ার ফলে যে প্রচণ্ড উত্তাপ তৈরি হবে, তা দিয়ে পানি ফুটিয়ে উচ্চচাপের বাষ্প তৈরি করা হবে। পরবর্তীতে সেই বাষ্পের মাধ্যমে বিশাল টারবাইন ঘুরিয়ে প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে। এই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার সফল সমাপ্তি ঘটলে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী বিশ্ব দরবারের ৩৩তম দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করবে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞ এবং অর্থ-বিশ্লেষকরা এই অর্জনকে বড় করে দেখলেও প্রকল্পটির দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের হিসাব মতে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি একক ইউনিট যদি নির্ধারিত সময়ে পূর্ণ ক্ষমতায় চালু করা যেত, তবে কেবল তরল ও জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি হ্রাস করেই দেশের বছরে প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব হতো। কিন্তু নানা প্রশাসনিক, বৈশ্বিক ও কারিগরি জটিলতায় এই জাতীয় প্রকল্পটি প্রায় সাড়ে তিন বছর পিছিয়ে গেছে, যা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। এত বড় অংকের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ হাতছাড়া হওয়া দেশের অর্থনৈতিক চাপের সময়ে একটি বড় ক্ষতি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
অবশ্য রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে চলমান বছরের শেষভাগ অর্থাৎ ডিসেম্বরের মধ্যেই প্রথম ইউনিট থেকে বাণিজ্যিকভাবে পূর্ণমাত্রায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বা পরিকল্পনা তাদের রয়েছে। তবে এই খাতের টেকনিক্যাল বিশেষজ্ঞ এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট অনেকেই মনে করছেন যে পারমাণবিক নিরাপত্তার মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় জড়িত থাকায় কেবল নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডারের হিসাব দিয়ে এটি মূল্যায়ন করা কঠিন। পরবর্তী মাত্র ৫ মাসের সংক্ষিপ্ত সময়সীমার মধ্যে সকল নিরাপত্তা অনুমোদন এবং জটিল যান্ত্রিক সমীকরণ পেরিয়ে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়া কিছুটা কষ্টসাধ্য বা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। নিরাপত্তা বিধান বজায় রেখে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়াই এখন রূপপুরের প্রধান লক্ষ্য।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো