জাতীয় মাছ ইলিশের সার্বিক উৎপাদন বৃদ্ধি, আকার বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের জন্য বাজারমূল্য সহনীয় করার লক্ষ্যে নেওয়া ২২৯ কোটি টাকার এক বিশেষ সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প চরম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। ২০২০ সালের জুলাই মাস থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরেই সমাপ্ত হতে যাচ্ছে। তবে প্রকল্পের মেয়াদ শেষে অডিট বা নিরীক্ষা প্রতিবেদনে যে চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সরকারের মূল লক্ষ্য অনুযায়ী ইলিশের উৎপাদন বছরে ৫৩ হাজার টন বাড়ার কথা থাকলেও উল্টো মোট উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে ৭০ হাজার টন কমে গেছে। একই সাথে বাজারে ইলিশের গড় আকার দিন দিন ছোট হয়ে এসেছে এবং দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। অর্থাৎ ২২৯ কোটি টাকা ব্যয়ের পরও প্রকল্পের প্রধান তিনটি লক্ষ্যের একটিও অর্জিত হয়নি, যা রাষ্ট্রীয় ফান্ডের অপচয়ের এক বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায় যে প্রকল্পের ব্যর্থতার প্রধান কারণ ছিল প্রকৃত প্রজনন নিশ্চিত করতে না পারা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা। ইলিশের প্রজনন ও বৃদ্ধির বিশেষ মৌসুমে জেলেরা যেন নদীতে মাছ ধরা থেকে বিরত থাকেন, সে জন্য সরকারি বাজেট থেকে ক্ষতিপূরণ বা সহায়তা ভাতা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে যে প্রতিটি উপকূলীয় ইউনিয়নে মেম্বার, চেয়ারম্যান এবং স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী সিন্ডicates যৌথভাবে ভুয়া জেলেদের তালিকা তৈরি করেছে। ফলে রিকশাচালক, স্থানীয় মুদি দোকানদার এবং বিত্তশালী প্রবাসীদের আত্মীয়স্বজনরা বেআইনিভাবে জেলে কার্ড বাগিয়ে নিয়েছেন। অন্যদিকে বংশানুক্রমে যেসব প্রকৃত দরিদ্র জেলে সাগরে বা নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাঁদের অনেকেই সরকারি এই সহায়তার তালিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। জীবনধারণের বিকল্প উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়ে সেই অসচ্ছল জেলেরা নিষিদ্ধ সময়েও নদীতে মাছ ধরতে নেমেছেন, যার প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ইলিশ প্রজননে।
প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ভেস্তে গেলেও প্রশাসনিক আমলাদের পক্ষ থেকে ব্যর্থতা স্বীকার করার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। উল্টো যুক্ত দেখানো হচ্ছে যে বিচারে ওজনে কম হলেও নদীতে মোট মাছের সংখ্যা বেড়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বা অসচ্ছল জেলেদের ওপর দায় চাপিয়ে ইলিশের মূল সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়। কারণ ইলিশ উৎপাদন কমায় কেবল অবৈধভাবে মাছ ধরাই একমাত্র কারণ নয়; বরং দেশের নদীগুলোর মারাত্মক পানি দূষণ এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদীর টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানার অপরিশোধিত বিষাক্ত রাসায়নিক বর্জ্য অনবরত গিয়ে মিশছে ইলিশের প্রধান বিচরণক্ষেত্র পদ্মা ও মেঘনায়। উপরন্তু, দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকার প্রধান পথগুলোতে একের পর এক ভারী শিল্প ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে ওঠায় সেখানকার ইকোসিস্টেম এবং পানির তাপমাত্রা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অতিরিক্ত দূষণ ও অক্সিজেনের অভাবে অনেক মা ইলিশ ডিম ছাড়ার উপযুক্ত পরিবেশ না পেয়ে মাঝপথ থেকেই সাগরে ফিরে যাচ্ছে অথবা ডিম না ছেড়েই মারা পড়ছে।
নাব্য সংকট ও ভৌগোলিক পরিবর্তনও ইলিশ আসার পথকে অবরুদ্ধ করে তুলছে। উজান থেকে পানি প্রবাহ কমে যাওয়ায় পদ্মা ও তিস্তাসহ বেশ কয়েকটি বড় নদীর তলদেশে পলি জমে অসংখ্য ডুবচর গড়ে উঠেছে। সমুদ্র থেকে ডিম ছাড়ার উদ্দেশ্যে যখন মা ইলিশ লোনা পানি ছেড়ে নদীর মিষ্টি ও প্রবহমান পানির দিকে আসার চেষ্টা করে, তখন এই ডুবচরগুলো বিশাল বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তীব্র স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটতে ভালোবাসা এই সংবেদনশীল মাছটি দিক হারিয়ে বাধ্য হয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারত বা মিয়ানমারের জলসীমার দিকে চলে যায়। এর ফলে নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নাব্যতা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি ছিল, অথচ ২২৯ কোটি টাকার ওই প্রকল্পটিতে কোনো বৈজ্ঞানিক ড্রেজিং ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
একটি বিশাল বাজেট সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ার পরও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ না করে উল্টো প্রকল্পের সময়সীমা বাড়ানো কিংবা সমমানের নতুন আরেকটি প্রকল্প গ্রহণের প্রশাসনিক তৎপরতা চালনা করা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও পরিবেশবাদীরা মনে করছেন, জবাবদিহিতার অভাবে সরকারি অর্থ খরচের ক্ষেত্রে এমন কাণ্ডজ্ঞানহীনতা বারবার ঘটছে। জাতীয় সম্পদ ইলিশ রক্ষা করতে হলে কেবল কাগজে-কলমে প্রকল্প তৈরি না করে নদীর বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে, নদী ও মোহনা নিয়মিত ড্রেজিং করে ইলিশের চলাচলের পথ সুগম করতে হবে এবং ভিজিএফ কার্ড বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে প্রকৃত জেলেদের কাছে রাষ্ট্রীয় সহায়তা পৌঁছাতে হবে। তা না হলে একের পর এক শত শত কোটি টাকার নতুন প্রজেক্ট বাস্তবায়ন হবে, কিন্তু সাধারণ মানুষের খাদ্য তালিকা থেকে সুস্বাদু ইলিশ চিরতরে হারিয়ে যাবে।
তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ মানি