দীর্ঘ একশত দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও তীব্র উত্তেজনার পর অবশেষে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনতে একটি ঐতিহাসিক প্রাথমিক চুক্তিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এই সমঝোতার খবরে দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে স্বস্তির হাওয়া বইতে শুরু করেছে, স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যও।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই শান্তি চুক্তির রূপরেখা, শর্তাবলি এবং যুদ্ধ পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে ওয়াশিংটন, তেহরান এবং মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের পক্ষ থেকে যে সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, তা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
এই সমঝোতা প্রক্রিয়ায় প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, চুক্তির প্রাথমিক শর্ত অনুযায়ী উভয় পক্ষই অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে সব ধরনের সামরিক ও আকাশসীমা অভিযান বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে।
উভয় পক্ষ নিশ্চিত করেছে যে, যুদ্ধ অবসানের এই ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক (MoU) আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হবে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদী জানিয়েছেন, দুই দেশের প্রতিনিধিদের স্বাক্ষরের পরপরই এই সমঝোতা স্মারকের সব নথিপত্র বিশ্ববাসীর সামনে উন্মুক্ত করা হবে। চুক্তি সই হওয়ার সাথে সাথেই বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় খুলে দেওয়া হবে এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার শুরু হবে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি ও স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আগামী ৬০ দিন ধরে উভয় পক্ষ আলোচনা চালিয়ে যাবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, আগামী শুক্রবার থেকেই হরমুজ প্রণালি পুনরায় আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক যানের জন্য উন্মুক্ত হবে এবং তিনি মার্কিন নৌবাহিনীকে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, চুক্তি অনুযায়ী এই প্রণালিটি “সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য” সম্পূর্ণ নিরাপদ ও উন্মুক্ত থাকবে। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ‘ফার্স নিউজ এজেন্সি’ জানিয়েছে, এই সমঝোতার আওতায় ওমানের সাথে যৌথ সমন্বয় করে ইরানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এই আন্তর্জাতিক প্রণালির সামুদ্রিক যান চলাচল ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
কূটনৈতিক আলোচনার সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। এই চুক্তির আওতায় ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে পরমাণু অস্ত্র তৈরি বা অর্জন না করার বিষয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পুনরায় অঙ্গীকার করেছে। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চূড়ান্ত ও স্থায়ী চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তেহরান তাদের সব ধরনের পারমাণবিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখবে; যার মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কিংবা নতুন পারমাণবিক স্থাপনার সম্প্রসারণ না করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ভবিষ্যতের একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির আওতায় ইরান তাদের দেশের ভেতরে থাকা উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতকে তরলীকৃত (Dilute) করতে পারবে বলে ওয়াশিংটন নীতিগত সম্মতি দিয়েছে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক উপকরণগুলো তাড়াহুড়ো করে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন নেই, পরিস্থিতি সম্পূর্ণ শান্ত হলে যুক্তরাষ্ট্র তা উদ্ধার করবে। তবে ট্রাম্প সাফ জানিয়েছেন, যেকোনো চূড়ান্ত চুক্তির আওতায় ইরানের ওপর একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ব্যবস্থা (Inspection System) চালু করা হবে। অন্যদিকে মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের সাথে যেকোনো চূড়ান্ত চুক্তি কার্যকর করতে হলে তা অবশ্যই মার্কিন কংগ্রেসের সুনির্দিষ্ট পর্যালোচনা এবং অনুমোদন পেতে হবে।
আর্থিক প্রভাব ও নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী ৬০ দিনের আলোচনা চলাকালীন বা চূড়ান্ত চুক্তিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত ইরানের ওপর নতুন করে কোনো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করার বিষয়ে রাজি হয়েছে হোয়াইট হাউস। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট একটি মেয়াদের জন্য ইরানের ওপর থেকে তেল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে এবং চূড়ান্ত চুক্তির পর সম্মত সময়সূচী অনুযায়ী মার্কিন ও জাতিসংঘের সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা একযোগে প্রত্যাহার করা হবে।
সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হিসেবে, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সরাসরি নগদ অর্থ স্থানান্তর, আঞ্চলিক দেশগুলোর মাঝে বাণিজ্যিক সহযোগিতা এবং বিশেষ আর্থিক ক্রেডিট লাইনের মাধ্যমে বিদেশে আটকে থাকা ইরানের জব্দকৃত প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের বিশাল সম্পদ মুক্ত করে দেওয়ার বিষয়ে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া, ওয়াশিংটন তার আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলের জন্য একটি বিশেষ ‘পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা’ তৈরি করবে, যা আগামী ৬০ দিনের মধ্যে তেহরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানকে সরাসরি কোনো নগদ অর্থ বা ক্যাশ দেওয়া হবে না, তবে তাদের ওপর থেকে সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হতে পারে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ নিশ্চিত করেছেন যে, সামরিক অভিযান বন্ধের এই আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তের মধ্যে লেবাননও পুরোপুরি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিবালয় জানিয়েছে, লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের সব যুদ্ধক্ষেত্রে সোমবার রাত থেকেই স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধ কার্যকর হবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জোর দিয়ে বলেছেন, লেবাননে ইসরায়েলি বিমান ও স্থল হামলা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে এবং এই রূপরেখা চুক্তি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের।
তবে এই শান্তি চুক্তির মাঝেও কিছুটা ভিন্ন সুর শোনা গেছে তেল আবিবের পক্ষ থেকে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানিয়েছেন, এই চুক্তি সত্ত্বেও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী লেবানন, সিরিয়া এবং গাজায় তাদের দখল করা ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ (Security Zones) গুলোতে নিজেদের সামরিক অবস্থান বজায় রাখবে এবং প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের কাছে এই বিষয়টি পরিষ্কার করে দিয়েছেন।
অবশ্য সমঝোতা স্মারক ঘোষণার আগে ট্রাম্প দৃঢ়তার সাথে বলেছিলেন, তিনি লেবাননসহ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনবেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, লেবাননে আর কোনো ইসরায়েলি হামলা হওয়া উচিত নয় এবং একইভাবে ইসরায়েলের ওপর ইরান-সমর্থিত লেবানিজ প্রতিরোধ গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকেও আর কোনো রকেট বা ড্রোন হামলা চালানো যাবে না। আগামী দিনগুলোতে ইসরায়েলের এই অনড় অবস্থান চুক্তির বাস্তবায়নকে কতটুকু ঝুঁকিতে ফেলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।