চলতি ফুটবল বিশ্বকাপে শিরোপার অন্যতম দাবিদার পরাশক্তি স্পেনের নিশ্চিত জয় আটকে দিয়ে ইতিহাস গড়েছে আফ্রিকার পুঁচকে দেশ কেপ ভার্দে। বিশ্বকাপে নিজেদের অভিষেক ম্যাচেই এমন অবিশ্বাস্য অঘটন ঘটানোর নেপথ্য নায়ক দলটির ৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহা। আটলান্টার মাঠে ম্যাচজুড়ে ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম সেরা দল স্পেন একের পর এক আক্রমণ চালালেও প্রতিবারই চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়ান এই বর্ষীয়ান গোলরক্ষক। স্পেনের বিশ্বখ্যাত ফরোয়ার্ডদের সব শট রুখে দিয়ে ম্যাচটি গোলশূন্য ড্রয়ে শেষ করেন তিনি।
ম্যাচ শেষে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ভোজিনহা নিজের আবেগ আর ধরে রাখতে পারেননি। রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই মাঠের ভেতর হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন তিনি। কিছুক্ষণ পর দু’হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এমনকি ম্যাচসেরার (ম্যান অব দ্য ম্যাচ) পুরস্কার হাতে নেওয়ার সময়ও তাঁর চোখ দিয়ে অনবরত জল ঝরছিল। তবে ভোজিনহার সেই কান্না কেবলই একটি ঐতিহাসিক ড্রয়ের আনন্দ বা ব্যক্তিগত আবেগের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; বরং এর পেছনে লুকিয়ে ছিল এক বুক কষ্ট আর অনেক না পাওয়ার গল্প।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে নিজের কান্নার আসল কারণ জানাতে গিয়ে আবেগঘন কণ্ঠে ভোজিনহা বলেন, “ম্যাচের পর আমি নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি, কেঁদে ফেলেছিলাম। কারণ, ছোটবেলায় আমি আমার দাদা-দাদির কাছে পরম স্নেহে বড় হয়েছি। আজ আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহাসিক দিনে তাঁরা আমার খেলা দেখার জন্য এই গ্যালারিতে বেঁচে থাকতে পারলেন না; কয়েক বছর আগেই তাঁরা মারা গেছেন। এমনকি আমার জন্মদাত্রী মা-ও আজ গ্যালারিতে উপস্থিত থাকতে পারেননি। ভিসা-সংক্রান্ত চরম জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে সময়মতো মায়ের জন্য সবকিছু করা সম্ভব হয়নি।” ফুটবল বিশ্বকাপের মতো এত বড় মঞ্চে ইতিহাস গড়ার দিনেও পরিবারের কাউকে পাশে না পাওয়ার এই শূন্যতাই মূলত কাঁদিয়েছে এই আফ্রিকান নায়ককে।
ভোজিনহার এই মানবিক গল্প ও মাঠের লড়াকু পারফরম্যান্স ছুঁয়ে গেছে গোটা ফুটবল বিশ্বকে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির ফুটবল বিশ্লেষক ও সাবেক স্কটিশ উইঙ্গার প্যাট নেভিন বলেন, “পুরো ম্যাচজুড়ে একা আলো ছড়িয়েছেন ভোজিনহা। ৪০ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে বিশ্বমঞ্চে তিনি মাঠে যা দেখালেন, তা স্রেফ অবিশ্বাস্য। ম্যাচ শেষে মাঠের সব ক্যামেরা ছিল তাঁর দিকে। সতীর্থরা আঙুল তুলে বারবার বিশ্বকে দেখিয়ে দিচ্ছিলেন যে, এই ব্যক্তিটিই তাঁদের রূপকথার প্রকৃত নায়ক।”
সাবেক ইংলিশ ডিফেন্ডার লি ডিক্সনও প্রশংসায় ভাসিয়েছেন কেপ ভার্দের এই গোলরক্ষককে। আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, “আমি সত্যি এই ম্যাচটি দেখে ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি। এই ঐতিহাসিক একটি পয়েন্ট কেপ ভার্দের প্রাপ্যই ছিল। আজকের রাতটা সম্পূর্ণ তাদের। ভোজিনহাকে ওভাবে কাঁদতে দেখে আমার নিজেরই কান্না চলে আসছিল।”
মাঠের পারফরম্যান্স ও জীবনের বাস্তব কষ্টকে ছাপিয়ে ভোজিনহা এখন বিশ্বজুড়ে কোটি ফুটবলপ্রেমীর মন জয় করে নিয়েছেন। ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে ইনস্টাগ্রামে তাঁর ফলোয়ার সংখ্যা ছিল মাত্র ৫০ হাজার। কিন্তু স্পেনের বিপক্ষে দুর্দান্ত কিছু সেভ করার পর ম্যাচ চলাকালীন কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাঁর অ্যাকাউন্টে যোগ হয় ৩ লাখেরও বেশি নতুন ফলোয়ার। আর ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর সেই ফলোয়ারের স্রোত রীতিমতো সুনামিতে রূপ নেয়। রাতারাতি ১১ লাখ পার করে বর্তমানে তাঁর ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৯ লাখে! কেপ ভার্দের মতো একটি ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রের ফুটবলারের জন্য যা স্রেফ অভাবনীয় ও অলৌকিক ঘটনা।
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, বিশ্বকাপে খেলতে আসার আগে এবং বর্তমানেও ভোজিনহা কোনো পেশাদার ক্লাবের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ নন, অর্থাৎ তিনি একজন ফ্রি-এজেন্ট। তবে ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপের এই অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের পর খুব শিগগিরই ইউরোপ বা আমেরিকার নামিদামি কোনো বড় ক্লাব থেকে মোটা অঙ্কের ও আকর্ষণীয় বেতনের প্রস্তাব পেতে যাচ্ছেন ৪০ বছর বয়সী এই কেপ ভার্দিয়ান প্রাচীর।