• শনিবার, ২০ জুন ২০২৬, ০৬:৩২ অপরাহ্ন
Headline
২৫ এবং ৪০ এর প্রেমের সাতটি পার্থক্য এবং আজম খানের গান দেশে হামের তাণ্ডব: ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ৮৮৭ তরুণীকে বারে নিয়ে যৌন হয়রানির অভিযোগ এনসিপি নেতার বিরুদ্ধে ভিনিসিয়াস কুনহা জাদুতে বিশ্বকাপে ব্রাজিলের রাজকীয় প্রত্যাবর্তন ফুটপাতে হকার শৃঙ্খলার নতুন উদ্যোগেও কাটছে না রাজধানীর সংকট মায়ের কোল ছেড়ে অনাথ আশ্রমে দিতে বলা সেই পূজাই আজকের বলিউড তারকা ঐতিহ্যবাহী দলীয় রাজনীতি থেকে মুখ ফেরাচ্ছে তরুণরা ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনে বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ টাকার রেকর্ড অবমূল্যায়ন: বহুমুখী সংকটে দেশের অর্থনীতি রাজধানীর আতঙ্কের জনপদ মোহাম্মদপুর

ঐতিহ্যবাহী দলীয় রাজনীতি থেকে মুখ ফেরাচ্ছে তরুণরা

Reporter Name / ১ Time View
Update : শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর মাত্র কয়েক মাস পার হয়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্থবিরতা, অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থান, পুরোনো শাসন ব্যবস্থার নাটকীয় পতন এবং একটি সম্পূর্ণ নতুন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এই ঐতিহাসিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন গণ-আন্দোলনের পর এটিই ছিল দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচন, যার কারণে স্বাভাবিকভাবেই এই নির্বাচনকে ঘিরে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে এক বিশাল কৌতূহল ও উদ্দীপনা বিরাজ করছিল। নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়েছে এবং সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে নির্বাচন-উত্তর এই নতুন বাংলাদেশে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং নজিরবিহীন একটি সামাজিক চিত্র এখন নীতি-নির্ধারক ও বিশ্লেষকদের মাঝে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আর সেটি হলো—নতুন ভোটার তথা তরুণ প্রজন্মের একটি বিশাল অংশের প্রচলিত দলীয় রাজনীতির প্রতি তীব্র অনীহা, উদাসীনতা ও গভীর দূরত্ব।

নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এই জাতীয় নির্বাচনে মোট ভোটারের মধ্যে প্রায় সাড়ে চার কোটি ভোটারই ছিলেন একদম তরুণ এবং নতুন। নির্বাচনের আগে কমিশন থেকে শুরু করে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এই তরুণ সমাজকে দেশের ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মূল ‘আলোকবর্তিকা’ বা প্রধান শক্তি হিসেবে অবিহিত করেছিল। তবে ভোটের আগে এবং পরে দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং শহরাঞ্চলের সাধারণ তরুণদের সাথে নিবিড়ভাবে কথা বলে এক আশঙ্কাজনক চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে। দেখা গেছে, তরুণদের একটি সিংহভাগ অংশ সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি বা দলীয় কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হতে সম্পূর্ণ অনিচ্ছা প্রকাশ করছে। তারা সাধারণ চায়ের টেবিল থেকে শুরু করে বন্ধুমহলে দেশের রাজনীতি ও নীতিনির্ধারণ নিয়ে গভীর আলোচনা ও সমালোচনা করছে ঠিকই, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিজেদের জোরালো স্বাধীন মতামত প্রকাশ করছে; কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের কর্মী, সমর্থক কিংবা ঝাণ্ডাধারী হিসেবে নিজেদের আত্মপ্রকাশ করতে তারা সাফ অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।

চায়ের টেবিল থেকে সামাজিক মাধ্যম: আদর্শের চেয়ে ফলের প্রত্যাশা

নির্বাচন-উত্তর সময়ে ফেসবুক, ইউটিউব এবং টিকটকের মতো জনপ্রিয় গ্লোবাল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর ট্রেন্ড ও কথোপকথন গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে তরুণদের এই পরিবর্তিত মনস্তত্ত্ব খুব সহজেই অনুধাবন করা যায়। বর্তমানে তরুণদের আলোচনার মূল কেন্দ্রে কোনো রাজনৈতিক দলের গুণগান বা দলীয় মতাদর্শের অন্ধ উপাসনা নেই। বরং সেখানে স্থান পাচ্ছে মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, লাগামহীন দ্রব্যমূল্য ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিক সংস্কার, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ, খুন ও ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের দ্রুত বিচার এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ। তরুণদের বিভিন্ন ফেসবুক পোস্ট, পাবলিক কমেন্ট এবং গ্রুপ ডিসকাশনে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, তারা এখন আর কোনো দলের চটকদার স্লোগান বা রাজনৈতিক মতাদর্শের অন্ধ ভক্ত হতে রাজি নয়। তারা এখন মূলত দলগুলোর অর্থনৈতিক নীতি এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব ফলাফল দেখতে চায়।

এই বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী রাকিব হাসান নিজের ক্ষোভ ও প্রত্যাশার কথা ব্যক্ত করে জানান, তরুণ সমাজ এখন পুরোনো এবং নতুন—উভয় পক্ষের শাসন ও কার্যক্রম গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তারা এখন আর রাজনীতিকদের কাছ থেকে কোনো ফাঁকা বুলি বা অবাস্তব প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না, বরং মাঠপর্যায়ে কাজের প্রকৃত বাস্তবায়ন দেখতে চায়। একই ধরনের সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসানের কণ্ঠেও। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, তরুণরা মূলত রাজনীতিকে সামগ্রিকভাবে ঘৃণা করে না, বরং তারা বর্তমানের প্রচলিত নোংরা, দখলদারিত্ব ও লেজুড়বৃত্তির রাজনীতিকে তীব্রভাবে অপছন্দ করে। অন্যদিকে, ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী আরিফ রায়হান নিজের ব্যক্তিগত ও চারপাশের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, নির্বাচনের আগে প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলই বেকারত্ব দূরীকরণ ও বিপুল পরিমাণ চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এমনকি জাতীয় বাজেটেও বড় অংকের ঘোষণা ছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো, তাদের নিজেদের ব্যাচের অর্ধেক শিক্ষার্থীই শিক্ষাজীবন শেষ করে এখনো পুরোপুরি বেকার বসে আছেন। এই ধরনের চরম বাস্তবতার কারণেই মূলত প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর থেকে তরুণদের দীর্ঘদিনের জমানো আস্থা এক লহমায় ধসে গেছে।

রাজনীতিবিমুখতার পেছনে প্রধান তিনটি মনস্তাত্ত্বিক কারণ

রাজনৈতিক গবেষক ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, দেশের নতুন প্রজন্মের এই গভীর রাজনীতিবিমুখতা বা অনীহার পেছনে মূলত তিনটি সুনির্দিষ্ট ও কাঠামোগত কারণ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে:

  • দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হতাশা ও অবিশ্বাস: গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে ধরনের তীব্র সংঘাত, পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি এবং চরম অবিশ্বাসের পরিবেশ বজায় ছিল, এই তরুণরা মূলত সেই আবহের মধ্যেই বেড়ে উঠেছে। তাদের অবচেতন মনে রাজনীতির সমার্থক শব্দ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে সহিংসতা, ক্ষমতার অন্ধ দ্বন্দ্ব, ক্যাডার রাজনীতি কিংবা প্রতিপক্ষকে নির্মমভাবে দমনের কুৎসিত চিত্র। ফলে, রাজনীতি যে সমাজ বা রাষ্ট্রের ইতিবাচক পরিবর্তনের একটি বড় হাতিয়ার হতে পারে, তা তারা সহজে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে পারছে না।

  • অর্থনৈতিক তীব্র চাপ এবং বেকারত্ব: বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে বের হওয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত চাকরি না পাওয়া, সরকারি ও বেসরকারি নিয়োগপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং তীব্র অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তরুণদের মনে গভীর ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার বাইরে থাকার সময় কর্মসংস্থানের হাজারো আশার বাণী শোনালেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন না মেলায় তরুণরা নিজেদের চরমভাবে প্রতারিত মনে করছে।

  • সোশ্যাল মিডিয়া ও বিকল্প তথ্যের প্রভাব: অতীতে তরুণদের রাজনৈতিক তথ্যের একমাত্র প্রধান উৎস ছিল দলগুলোর নিজস্ব প্রচারণা কিংবা রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত ঐতিহ্যবাহী গণমাধ্যম। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের প্রধান তথ্যসূত্র হলো ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো উন্মুক্ত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। এখানে তারা খুব সহজেই প্রচলিত ব্যবস্থার বিকল্প রাজনৈতিক চিন্তা, আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থা এবং দলগুলোর কর্মকাণ্ডের গঠনমূলক চুলচেরা সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছে। এই ডিজিটাল সচেতনা তাদের কোনো দলের প্রতি অন্ধ সমর্থন দেওয়ার পরিবর্তে প্রতিটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলতে শেখাচ্ছে।

শিক্ষাঙ্গনে ‘ট্যাগিং’ সংস্কৃতি ও ছাত্রসংগঠনের আধিপত্যের নতুন লড়াই

নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা এবং হতাশার কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান অভ্যন্তরীণ পরিবেশ। ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা কোনো দলীয় পরিচয় বা ব্যানার ছাড়াই সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের দাবিতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লড়েছিল। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে একটি বড় প্রত্যাশা ছিল যে, নতুন বাংলাদেশে হয়তো ক্যাম্পাসগুলো লেজুড়বৃত্তি, সিট বাণিজ্য, হল দখল ও গ্যাং কালচারের মতো নোংরা ছাত্ররাজনীতি থেকে চিরতরে মুক্তি পাবে। কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তব চিত্র শিক্ষার্থীদের সেই রঙিন আশার গুড়ে বালি ঢেলে দিয়েছে।

বর্তমানে দেশের শীর্ষস্থানীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও নামী কলেজগুলোতে ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথেই ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন (জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল) এবং অন্যান্য প্রভাবশালী ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে ক্যাম্পাস ও আবাসিক হলের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী মারামারি, হল দখল ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এই আধিপত্যের লড়াই ও সহিংসতা সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।

এর চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে নতুন এক মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক অস্ত্রের ব্যবহার, যাকে শিক্ষার্থীরা ‘ট্যাগিং’ বা তকমা দেওয়ার অপসংস্কৃতি হিসেবে অভিহিত করছেন। বর্তমানে ক্যাম্পাসে কোনো সাধারণ শিক্ষার্থী যদি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো ভুল বা অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে কিংবা নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার কোনো ত্রুটি নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে, তবে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে তাকে মুহূর্তের মধ্যে ‘ফ্যাসিস্টদের দোসর’ বা ‘বিগত সরকারের গোপন এজেন্ট’ বলে ট্যাগ করে দেওয়া হচ্ছে। এই সুপরিকল্পিত ট্যাগিং বা লেবেলিংয়ের আড়ালে মূলত চলছে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নেওয়া, জোরপূর্বক আবাসিক হল থেকে বের করে দেওয়া এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো। ফলস্বরূপ, অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের ‘নাগরিক কর্মী’ বা ‘সামাজিক কর্মী’ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলেও, দলীয় ছাত্রসংগঠনগুলোর এই চণ্ডনীতি ও দমনপীড়নের কারণে ক্যাম্পাসে স্বাধীন মতপ্রকাশের স্বাভাবিক জায়গা দিন দিন অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

নতুন বাজেট ২০২৬-২৭: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বিশাল ব্যবধান

জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’ দীর্ঘমেয়াদি প্রতিপাদ্য নিয়ে সংসদে উত্থাপিত ৯ লাখ ৩৮ কোটি টাকার এই বিশাল ও রেকর্ড পরিধির বাজেট নিয়ে দেশের শিক্ষিত তরুণ সমাজের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও প্রত্যাশা ছিল। নতুন সরকার এই বাজেটের মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশজুড়ে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দিলেও সাধারণ তরুণদের মন থেকে সংশয় ও অবিশ্বাস দূর করা সম্ভব হয়নি।

তরুণ সমাজের মূল অভিযোগ হলো, প্রস্তাবিত এই বিশাল বাজেটে যুবসমাজের প্রধান সমস্যা অর্থাৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের জরাজীর্ণ শিক্ষা খাতের গুণগত মানোন্নয়নে যে ধরনের বৈপ্লবিক বরাদ্দ ও আধুনিক পরিকল্পনার প্রয়োজন ছিল, তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। বর্তমানের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের তরুণদের ওপর যে তীব্র অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা নিরসনে বা তাদের স্বস্তি দিতে বাজেটে সুনির্দিষ্ট কোনো অর্থনৈতিক রোডম্যাপ রাখা হয়নি। এমনকি জাতীয় সংসদের নীতি-নির্ধারণী আলোচনাগুলোতেও তরুণদের কর্মসংস্থান, শিক্ষা খাতের আমূল সংস্কার, চাকরির নিয়োগপ্রক্রিয়ায় পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ ও নাগরিক অধিকারের মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে প্রত্যাশিত মাত্রায় কোনো জোরালো আলোচনা বা বিতর্ক হচ্ছে না বলে তরুণ ভোটাররা মনে করছেন।

রাজনৈতিক সংঘাত ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির খতিয়ান

২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের তরুণ সমাজ ও সাধারণ ভোটাররা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেছিলেন যে, নতুন বাংলাদেশে তাদের হয়তো আর রাজনৈতিক সহিংসতা, গুম, খুন ও আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতির মতো পুরোনো ও জঘন্য চিত্রের মুখোমুখি হতে হবে না। কিন্তু নতুন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পরও দেশের রাজনৈতিক মাঠের সহিংসতা ও রক্তপাত পুরোপুরি থামানো যায়নি, যা তরুণদের আরও বেশি রাজনীতিবিমুখ করে তুলছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের নির্ভরযোগ্য তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এই মেয়াদের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে:

  • অক্টোবর ২০২৫ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬: এই মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে দেশজুড়ে নির্বাচনী ও রাজনৈতিক সহিংসতায় ৭০০টিরও বেশি ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে, যেখানে অন্তত ১২ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং ২ হাজার ৬০০ জনেরও বেশি মানুষ গুরুতর আহত হয়েছেন।

  • মার্চ ২০২৬: এই এক মাসেই নির্বাচন-উত্তর সহিংসতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও ১৮ জন ব্যক্তি নিহত হয়েছেন এবং ৯১২ জনেরও বেশি মানুষ মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন।

  • মে ২০২৬: এই মাসেও নতুন করে ৬৪টি রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে ৫ জন নিহত এবং প্রায় ৩০০ জন আহত হয়েছেন।

দেশের সুপরিচিত মানবাধিকার ও সুশাসন সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সাম্প্রতিক এক বিশেষ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সহিংস অপরাধের গ্রাফে অত্যন্ত উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে। এই ১০০ দিনের সংক্ষিপ্ত সময়ে দেশজুড়ে ৬০০-এর বেশি হত্যাকাণ্ড, শতাধিক অপহরণ এবং বহু স্থানে প্রকাশ্য ছিনতাই ও সহিংসতার সুনির্দিষ্ট তথ্য উঠে এসেছে। যদিও এই হত্যাকাণ্ডের সবকটিই সরাসরি রাজনৈতিক কারণে ঘটেনি, তবে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নাগরিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে এটি জনমনে এবং বিশেষ করে তরুণদের মনে নতুন করে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন ও আস্থার সংকট তৈরি করেছে।

নিরাপত্তার এই নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী নাহিদ অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বলেন, বর্তমান সময়ে রাজনীতির চেয়েও বড় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দৈনন্দিন জীবনের চরম নিরাপত্তাহীনতা। প্রতিদিন গণমাধ্যমে একের পর এক খুন ও গুমের খবর শুনলে মনে হয়, রাষ্ট্র সাধারণ নাগরিকদের ন্যূনতম মৌলিক নিরাপত্তা দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক নারী শিক্ষার্থী ফারদিনা জেরিন বলেন, সাধারণ মানুষ ভোট দেয় মূলত নিজেদের ভবিষ্যৎ ও চারপাশের সমাজকে বদলানোর জন্য। কিন্তু সমাজে ঘটে যাওয়া ধর্ষণ, খুন বা সহিংসতার মতো জঘন্য অপরাধগুলোর বিচারপ্রক্রিয়া কতটা দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে হচ্ছে, তা নিয়ে তরুণদের মধ্যে এক তীব্র আস্থাহীনতা ও হতাশা তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাইশা মেহজাবিন নিজের নিরাপত্তা শঙ্কার কথা উল্লেখ করে বলেন, উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পরও ছাত্রীরা নিজেদের নিরাপদ বোধ করতে পারছেন না। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও ধর্ষণ বা যৌন হয়রানির খবর শুনলে মনে হয়, কাগজে-কলমে শুধু কঠোর আইন থাকলেই নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না, এর জন্য প্রয়োজন আইনের নিরপেক্ষ ও দ্রুত প্রয়োগ।

বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা ও ভবিষ্যতের নেতৃত্ব সংকট

বাংলাদেশের রাজনীতির এই জটিল ক্রান্তিকাল এবং এর সাথে তরুণদের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের এই বিপজ্জনক প্রবণতা নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় সমাজবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা গভীর উদ্বেগ ও জরুরি সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহবুব কায়সার এই বিষয়ে বলেন, তরুণদের এই বর্তমান অবস্থান ও মানসিকতা বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য একই সাথে যেমন একটি বড় সুযোগ, ঠিক তেমনি এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।

অধ্যাপক মাহবুব কায়সার তাঁর বিশ্লেষণে উল্লেখ করেন, “বাংলাদেশের তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ এখন আর দলকেন্দ্রিক ঐতিহ্যবাহী ও লেজুড়বৃত্তির রাজনীতিতে কোনোভাবেই আস্থা রাখতে পারছে না। তারা ব্যক্তি বা দলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য প্রদর্শনের পরিবর্তে এখন রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, সুশাসন, সাম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার দেখতে চায়। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তরুণরা যে আমূল রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিল, নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতায় সেই প্রত্যাশার অনেক কিছুই এখনো আলোর মুখ দেখেনি। ফলে তরুণদের অবচেতন মনে এক ধরনের গভীর হতাশা ও তীব্র অনাস্থা তৈরি হচ্ছে। যদি দেশের এই সাড়ে চার কোটি তরুণের একটি বড় অংশ সম্পূর্ণভাবে রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় বা নিজেদের গুটিয়ে রাখে, তবে অদূর ভবিষ্যতে দেশে তীব্র ও ভয়াবহ ‘নেতৃত্বের সংকট’ তৈরি হতে পারে। কারণ একটি কার্যকর গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে এবং রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে তরুণদের সুস্থ ও সক্রিয় রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সম্পূর্ণ অপরিহার্য।”

অন্যদিকে, নতুন সরকারের ১০০ দিনের সামগ্রিক কার্যক্রম, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিয়ে কঠোর ও নিরপেক্ষ সমালোচনা করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেন, “নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনে কিছু ইতিবাচক প্রতীকী উদ্যোগ (যেমন—স্বেচ্ছায় সরকারি প্লট বা শুল্কমুক্ত বিলাসবহুল গাড়ির সুবিধা না নেওয়া, রাষ্ট্রীয় অনাবশ্যক প্রটোকল পরিহার করা) দেখা গেলেও, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, দুর্নীতি দমন এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে সরকারের সুস্পষ্ট কোনো কার্যকর রোডম্যাপের তীব্র অভাব রয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষ গণ-অভ্যুত্থানের পর যে সুশাসনভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রত্যাশা করেছিল, সরকারের বেশ কিছু ধীরগতির পদক্ষেপ এবং ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে তৈরি হওয়া ‘এবার আমাদের পালা’ বা পুরোনো কায়দায় চণ্ডনীতি প্রদর্শনের মানসিকতা সেই আশার সাথে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষ করে মার্চ ও এপ্রিলের মতো সংক্ষিপ্ত সময়ে দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড ও ১৯৬টি অপহরণের মতো লোমহর্ষক ঘটনা এটিই প্রমাণ করে যে, দেশের পলিটিক্যাল চেঞ্জ বা ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ পুরোপুরি দূর করতে পারেনি এই নতুন সরকার।”

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক বিশেষ নির্বাচনী বিশ্লেষণেও বাংলাদেশের এই তরুণদের অবমূল্যায়নের চিত্রটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বৈশ্বিক দরবারে উঠে এসেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জেন-জি (Gen-Z) বা নতুন প্রজন্মের ভোটারদের সবচেয়ে বড় এবং মূল প্রত্যাশা ছিল—দলীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরির সুবর্ণ সুযোগ, দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ নিয়োগ ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় সুশাসন এবং স্বাধীনভাবে ভয়হীন চিত্তে মতপ্রকাশের অধিকার। কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও দেশে কর্মসংস্থান সংকটের কোনো সমাধান না হওয়া, সাধারণ বাজারে দ্রব্যমূল্যের তীব্র অর্থনৈতিক চাপ বজায় থাকা এবং শিক্ষাঙ্গনসহ সর্বত্র রাজনৈতিক সংঘাতের চেনা ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকায় তরুণদের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে এক বিশাল ও বিপজ্জনক ব্যবধান রয়ে গেছে।

এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সন্ধানে তরুণরা

দেশের শীর্ষ নীতিনির্ধারক ও সমাজবিজ্ঞানীদের গভীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশের তরুণ সমাজের মনস্তত্ত্বে ‘রাজনীতিবিমুখতা’ এবং ‘রাজনৈতিক সচেতনতা’—এই দুটি আপাত বিপরীতমুখী প্রবণতা একই সাথে সমান্তরালে কাজ করছে। অতীতে বা ঐতিহ্যগতভাবে রাজনীতিবিমুখতা বলতে বোঝাত রাষ্ট্র, সমাজ, নির্বাচন বা দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জনগণের এক ধরনের চরম উদাসীনতা ও অজ্ঞতা। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের জেন-জি তরুণেরা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি বা অন্ধ কর্মী হতে অনিচ্ছুক হলেও, তারা রাষ্ট্রীয় নীতি, অর্থনৈতিক বাজেট, মানবাধিকার, পররাষ্ট্রনীতি ও নির্বাচন নিয়ে আগের যেকোনো প্রজন্মের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন ও ক্ষুরধার। তারা কোনো রাজনৈতিক দলের আজ্ঞাবহ গোলাম হতে চায় না, কিন্তু দেশের নীতিনির্ধারণী ও কৌশলগত সিদ্ধান্তগুলোতে নিজেদের যৌক্তিক অংশীদারিত্ব চায়। এটি মূলত বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ধরনের সম্পূর্ণ নতুন এবং ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত দেয়, যেখানে অন্ধ ব্যক্তিপূজা বা দলের চেয়ে ‘পলিসি’ বা রাষ্ট্রীয় নীতি বেশি গুরুত্ব পায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকি এই বিষয়ে বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক ঐতিহাসিক রূপান্তর ও ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে যেমন যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা পুরোনো, ক্ষয়িষ্ণু ও জরাজীর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির খোলস ভাঙার এক তীব্র চেষ্টা চলছে, ঠিক অন্যদিকে দেশের নতুন প্রজন্ম নিজেদের মেধা ও সচেতনতা দিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব কায়দায় একটি জবাবদিহিমূলক অবস্থান তৈরি করছে। তারা এখন আর কোনো রাজনৈতিক দলকে বা নেতাকে অন্ধভাবে নিঃশর্ত সমর্থন দিতে একেবারেই প্রস্তুত নয়, আবার তারা নিজের মাতৃভূমি ও দেশ ছেড়ে সম্পূর্ণভাবে চলেও যেতে চায় না। তাদের চাওয়াগুলো আসলে কোনো আকাশকুসুম কল্পনা নয়, বরং অত্যন্ত সাধারণ, পরিচ্ছন্ন ও যৌক্তিক। তারা দেখতে চায় একটি সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব, সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত ও আধুনিক প্রশাসন, মেধাভিত্তিক কর্মসংস্থান, ক্যাডার ও দখলদারিত্বমুক্ত নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন এবং সর্বোপরি একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা।

২০২৬ সালের বহুলালোচিত সাধারণ নির্বাচন শেষ হয়েছে, গঠিত হয়েছে জনগণের ভোটে নির্বাচিত নতুন সরকার। কিন্তু দেশের সাড়ে চার কোটি নতুন ও তরুণ ভোটারের মনে আন্দোলনের মাঠ থেকে যে মৌলিক ও গুণগত প্রশ্নগুলো জন্ম নিয়েছিল, সেগুলোর সঠিক ও বাস্তব উত্তর নতুন বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক বাস্তবতায় এখনো অধরাই রয়ে গেছে। সামনের দিনগুলোতে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল ও নীতিনির্ধারকেরা যদি তরুণদের এই যৌক্তিক, আধুনিক ও সময়ের দাবির সঠিক উত্তর দিতে না পারে, তবে রাজনীতির প্রতি তরুণদের এই অনাস্থা ও দূরত্ব ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ ও গণ-বিমুখ রূপ নিতে পারে। আর যদি দলগুলো নিজেদের পুরোনো খোলস ভেঙে সময়োপযোগী করে শুধরে নিতে পারে, তবে আজকের এই তথাকথিত ‘দলীয় রাজনীতিবিমুখ’ সচেতন তরুণরাই হয়তো আগামী দিনে বাংলাদেশের ইতিবাচক রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি ও ত্রাতা হয়ে উঠবে।

তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category