• মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ০৫:৫৪ অপরাহ্ন

মিয়ানমারে জান্তার বিমান হামলায় ৭ শতাধিক বেসামরিক নিহত

Reporter Name / ৩ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬

মিয়ানমারে বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনের আগের ও পরের ছয় মাসে দেশটির সামরিক বাহিনীর হাতে অন্তত ৭০২ জন বেসামরিক নাগরিক নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন। গত ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারির শেষ নাগাদ—এই ছয় মাসে জান্তা সরকারের এই বর্বরতার শিকার হয়েছেন দেশটির সাধারণ মানুষ। নিহতদের মধ্যে ১৫৩ জন শিশু এবং ২২৪ জন নারী রয়েছেন। গতকাল সোমবার জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক দপ্তর মিয়ানমারের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করলে এই লোমহর্ষক তথ্য সামনে আসে। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বেসামরিক এলাকাগুলোতে জান্তা বিমানবাহিনীর উপর্যুপরি ও নির্বিচার বিমান হামলাই এককভাবে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর মূল কারণ।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির গণতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেছিল জেনারেল মিন অং হ্লেইংয়ের নেতৃত্বাধীন সামরিক বাহিনী। এরপর থেকেই দেশজুড়ে জান্তাবিরোধী সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। মিয়ানমারের মোট ১৪টি প্রশাসনিক প্রদেশের (৭টি রাজ্য ও ৭টি অঞ্চল) মধ্যে ‘সাগাইং’ অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি রক্তপাত ঘটেছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, কেবল সাগাইংয়েই ১৯১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৩০ জন শিশু এবং ৬০ জন নারী রয়েছেন।

প্রতিবেদনে সাগাইং অঞ্চলের দুটি ভয়াবহ হামলার বিবরণ দেওয়া হয়েছে। গত অক্টোবরে সাগাইংয়ের চাউং-ইউ এলাকায় একটি স্কুলের সামনে বৌদ্ধ উপবাসের সমাপ্তি উদযাপনে জড়ো হওয়া মানুষের ওপর বিমান হামলায় চার শিশুসহ ২৩ জন নিহত হন। সেই সমাবেশে উপস্থিত সাধারণ মানুষ রাজবন্দিদের মুক্তি এবং জান্তা সরকারের বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ ও প্রহসনের নির্বাচন প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানাচ্ছিলেন। এরপর ডিসেম্বরে তাবায়িন অঞ্চলে একটি চায়ের দোকানে বসে ফুটবল ম্যাচ দেখার সময় সামরিক বিমানের বোমা হামলায় আরও ১৯ জন সাধারণ মানুষ প্রাণ হারান।

বিবিসির প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বসবাসরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর জান্তা বাহিনীর নির্যাতন চরম আকার ধারণ করেছে। রোহিঙ্গারা একদিকে হত্যা, নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও পাশবিক যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছে; অন্যদিকে জান্তার হাত থেকে বাঁচতে আরাকান আর্মিতে যোগ দিতে বাধ্য হচ্ছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক এই পরিস্থিতির তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “মিয়ানমারের মানুষ সামরিক বাহিনীর হাতে ইতোমধ্যে চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছে, আর এখন মনে হচ্ছে বৈশ্বিক সম্প্রদায় বা দেশের বাইরের মানুষ তাদের কষ্টের কথা পুরোপুরি ভুলে গেছে।” তিনি জানান, জান্তার নির্বিচার হামলা থেকে বাঁচতে সাধারণ মানুষ স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অর্থ দিয়ে আসছিল। কিন্তু গত জানুয়ারি মাসের নির্বাচনের পর থেকে সাধারণ মানুষের এই একমাত্র প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থাটি ধ্বংস করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে সেনাবাহিনী, যা দেশের ক্ষতকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

গত জানুয়ারিতে মিয়ানমারে একটি একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে আগে থেকেই নির্ধারিত ফলাফল অনুযায়ী সেনাপ্রধান মিন অং হ্লেইং নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। বিবিসি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, এই নির্বাচনে মিয়ানমারের প্রধান ও জনপ্রিয় দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে দেশের একটি বড় অংশের মানুষের ভোট দেওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না। বর্তমানে দেশটির পার্লামেন্ট পুরোপুরি জেনারেলের অনুগতদের দিয়ে পূর্ণ। সেখানে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ২৫ শতাংশ (এক-চতুর্থাংশ) আসন আগে থেকেই সংরক্ষিত ছিল এবং বাকি আসনগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশ জিতেছে সামরিক বাহিনীর নিজস্ব রাজনৈতিক দল ইউএসডিপি (USDP)। মূলত নিজেদের ক্ষমতাকে আইনি বৈধতা দিতেই জান্তা সরকার তাদের নিজেদের মতো করে এই নির্বাচনের ছক সাজিয়েছিল।

 

সূত্র : বিবিসি


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category