• শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ১০:৪৬ অপরাহ্ন

 কর্মী ও নেতৃত্বের ঘাটতিতে ব্যাহত পৌরসেবা

Reporter Name / ৩ Time View
Update : শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬

দেশের স্থানীয় সরকার কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো পৌরসভা, যা শহর অঞ্চলের নাগরিকদের দৈনন্দিন নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে সরাসরি কাজ করে。 কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অধিকাংশ পৌরসভা এক অভূতপূর্ব ও দ্বিমুখী সংকটে নিমজ্জিত হয়েছে। একদিকে গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের (মেয়র ও কাউন্সিলর) অনুপস্থিতি, অন্যদিকে তীব্র জনবল সংকট—এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে ভেঙে পড়েছে গ্রামীণ ও মফস্বল শহরের নাগরিক সেবামূলক কার্যক্রম। রাস্তাঘাট রক্ষণাবেক্ষণ, বর্জ্য অপসারণ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার মতো জরুরি কাজের পাশাপাশি জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিকত্ব বা ট্রেড লাইসেন্সের মতো অতি প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সেবা পেতেও এখন সাধারণ মানুষকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ সরকারি দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চরম ঘাটতি থাকায় নাগরিকদের এসব ক্ষোভ ও অভিযোগ শোনার মতোও কেউ থাকছে না।

পৌর প্রশাসন ও নাগরিক ভোগান্তির এই করুণ চিত্রের সবচেয়ে বাস্তব উদাহরণ সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর পৌরসভা। সেখানকার বাসুদেব বাড়ি এলাকার স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সুবল দেব গত কয়েক মাস ধরে প্রতি সপ্তাহে নিয়মিত পুরসভায় যাতায়াত করছেন তার এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধানের জন্য。 কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, প্রতিবারই তিনি সেখানে গিয়ে তার অভিযোগটি নথিভুক্ত করার মতো কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তার দেখা পাচ্ছেন না। সামান্য বৃষ্টিতেই ওই এলাকার রাস্তাগুলো হাঁটু পানিতে তলিয়ে যায় এবং দিনের পর দিন সেই নোংরা পানি জমে থাকলেও ড্রেনেজ ব্যবস্থার বেহাল দশার কারণে পৌরসভা কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না। সুবল দেবের এই চরম ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও হতাশা আসলে দেশের ৩২৯টি পৌরসভার সাধারণ নাগরিকদের দৈনন্দিন যন্ত্রণারই একটি খণ্ডচিত্র মাত্র।

এই সংকটের মূল গোড়াপত্তন হয় ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর। স্থানীয় সরকার বিভাগের (এলজিডি) বিশেষ আদেশে দেশের ৩২৩টি পৌরসভার নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের একযোগে পদ থেকে অপসারণ করা হয় এবং বাকিগুলোতে থাকা প্রশাসকদেরও সরিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সংশোধিত অধ্যাদেশের আওতায় স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং সহকারী কমিশনারদের (ভূমি) সাময়িকভাবে পৌরসভার ‘প্রশাসক’ হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তব সমস্যা হলো, এই সরকারি কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই নিজ নিজ মূল দপ্তরের প্রশাসনিক গুরুদায়িত্ব একাই পালন করছেন। ফলে তারা সপ্তাহের অধিকাংশ সময় পৌরসভার কার্যালয়ে সশরীরে উপস্থিত থেকে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। একজন নির্বাচিত মেয়রের মতো সার্বক্ষণিক সময় দেওয়া আমলাদের পক্ষে সম্ভব না হওয়ায় ফাইল অনুমোদন এবং উন্নয়ন প্রকল্প তদারকির গতি মারাত্মকভাবে ধীর হয়ে পড়েছে।

এই প্রশাসনিক শূন্যতার সাথে যুক্ত হয়েছে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক বা জনবল সংকট। বাংলাদেশ পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএসএ) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের পৌরসভাগুলোতে অনুমোদিত প্রায় ৫০ হাজার পদের মধ্যে ৩১,১৪২টি পদই বর্তমানে সম্পূর্ণ শূন্য বা খালি পড়ে রয়েছে。 এর মধ্যে নীতিনির্ধারণ, বাজেট প্রণয়ন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার জন্য দায়বদ্ধ গ্রেড-১ এবং গ্রেড-২ পর্যায়ের শীর্ষ পদ খালি রয়েছে ১,৯১২টি。 প্রশাসনিক কাজ ও কর আদায়ের সাথে যুক্ত গ্রেড-৩ এবং রাস্তা পরিষ্কার, ড্রেন সংস্কার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো মাঠের কাজের জন্য নির্ধারিত গ্রেড-৪ পর্যায়ের শূন্য পদের সংখ্যা ২৯ হাজারের বেশি。 ফলে বাধ্য হয়ে বিদ্যমান অল্পসংখ্যক কর্মচারীদের কাঁধে একাধিক অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপানো হয়েছে。 কোথাও অ্যাকাউন্ট্যান্ট বা হিসাবরক্ষককে সামলাতে হচ্ছে পুরো প্রশাসনিক ফাইল, আবার কোনো কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে একসাথে কয়েকটি পৌরসভার অতিরিক্ত দায়িত্ব তদারকি করতে হচ্ছে。 এর ফলে কোনো কাজই আর শতভাগ সুচারুভাবে সম্পন্ন হচ্ছে না।

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের পৌরসভাগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এই সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেমন, জগন্নাথপুর পৌরসভায় অনুমোদিত ১৫৬টি পদের বিপরীতে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে কর্মরত আছেন মাত্র ২১ জন কর্মী, যেখানে নির্বাহী প্রকৌশলী ও সচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো বছরের পর বছর শূন্য। সেখানকার পৌর প্রশাসক বরকত উল্লাহ্ স্বীকার করেছেন যে, এই নগণ্য জনবল নিয়ে বিশাল এলাকার সেবা দেওয়া অসম্ভব। তদুপরি, নিজস্ব রাজস্ব আয় না থাকায় বর্তমান কর্মচারীদের বেতন-ভাতাই নিয়মিত পরিশোধ করা যাচ্ছে না। লালমনিরহাট পৌরসভায় ১৯০টি পদের মধ্যে ৯৭টি পদই শূন্য, যার সিংহভাগই গ্রেড-৪ এর পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদ。 ফলে অস্থায়ী দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কোনোমতে মৌলিক সেবাকাজ চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে, পাহাড়ি জেলা বান্দরবান পৌরসভায় ১৭৯টি পদের মধ্যে ১০৯টি পদই খালি এবং কর্মরত ৭০ জনের মধ্যে স্থায়ী স্টাফ মাত্র ২৯ জন। একইভাবে টাঙ্গাইল, শ্রীপুর এবং ১০৭ বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী সুনামগঞ্জ পৌরসভাতেও অনুমোদিত পদের তিন ভাগের দুই ভাগই বর্তমানে শূন্য অবস্থায় পড়ে রয়েছে。

এই প্রাতিষ্ঠানিক পঙ্গুত্বের চূড়ান্ত খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের করদাতা সাধারণ নাগরিকদের। বান্দরবানের বাসিন্দা মংটিং মারমা কিংবা টাঙ্গাইলের আসলাম মিয়ার মতো অসংখ্য ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, একটি সাধারণ নাগরিকত্ব সনদ বা শিশুর জন্মনিবন্ধন করাতে গেলেও এখন দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। টাঙ্গাইল পৌরসভায় তো কোনো মেডিকেল অফিসার বা স্যানিটারি ইন্সপেক্টরই নেই। সুনামগঞ্জের শোলঘরের বাসিন্দা কারী আমজাদ হোসেন তার বাবার মৃত্যু সনদ তুলতে গিয়ে কয়েকবার ফিরে এসেছেন, কারণ তাকে জানানো হয়েছে যে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক সরকারি কাজে বিদেশে থাকায় অন্য কেউ এই সনদ ইস্যু করার আইনি ক্ষমতা রাখেন না। গাজিপুরের শ্রীপুর পৌরসভার বাসিন্দা শুক্কুর আলী অভিযোগ করেন, নাগরিকরা নিয়মিত কর বা ট্যাক্স পরিশোধ করলেও রাস্তার মোড়ে মোড়ে ময়লার স্তূপ জমে থাকে, ড্রেনগুলো উপচে ময়লা পানি রাস্তায় চলে আসে, কিন্তু পৌর কর্তৃপক্ষের বর্জ্য সংগ্রহের কোনো লোকবল নেই।

এই অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে দেশের স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও নীতিনির্ধারকেরা সুনির্দিষ্ট কিছু পরামর্শ দিয়েছেন。 সদ্য বিলুপ্ত স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সদস্য কাজী মারুফুল ইসলাম এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেছেন。 তাঁর মতে, বিগত ২৫ বছরে দেশের অনেক পৌরসভাই কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল。 ফলে তাদের নিজস্ব রাজস্ব আয়ের কোনো উৎস নেই。 ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে জমা দেওয়া কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের প্রায় ২০০টি পৌরসভায় কর্মচারীদের মাসের পর মাস বেতন বকেয়া রয়েছে。 তাই নতুন করে ঢালাও জনবল নিয়োগের আগে এই পৌরসভাগুলোর আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি। প্রয়োজনে কিছু অনুৎপাদনশীল পৌরসভাকে ইউনিয়ন পরিষদে ফিরিয়ে নেওয়া বা কিছু বড় ইউনিয়নকে পৌরসভায় রূপান্তর করার মতো কঠোর কাঠামোগত সংস্কারের দিকে হাঁটতে হবে。

তবে দীর্ঘমেয়াদে এই সংকটের একমাত্র স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান হলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় নেতৃত্বের পুনরুদ্ধার করা。 স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি আশ্বস্ত করেছেন যে, নির্বাচন কমিশন (ইসি) ইতিমধ্যেই দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো যত দ্রুত সম্ভব সম্পন্ন করার লক্ষ্যে ভোটার তালিকা হালনাগাদসহ নানামুখী প্রস্তুতি জোরদার করেছে。 পাশাপাশি স্থানীয় সরকার বিভাগের পৌর উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব নাজমুল হুদা শামীম জানিয়েছেন, জনবল ঘাটতি মেটাতে খুব শিগগিরই বড় ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করার আইনি উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে。 নাগরিক সমাজ মনে করে, আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা কমিয়ে যত দ্রুত সম্ভব জনবল সংকট দূর করা এবং জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে পৌরসভার শাসনভার ফিরিয়ে দেওয়া যাবে, ঠিক তত দ্রুতই দেশের শহর ও মফস্বল অঞ্চলের স্থবির হয়ে পড়া নাগরিক জীবন আবার স্বস্তির আলো ফিরে পাবে।

তথ্যসূত্র: ডেইলি স্টার


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category