• শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ১০:৫২ অপরাহ্ন

ব্যয়সংকোচন নীতি থেকে সরকারের সরে আসার নতুন সিদ্ধান্ত

Reporter Name / ৩ Time View
Update : শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারি ব্যয়ে মিতব্যয়িতা বা সংকোচনমূলক নীতি (অস্টেরিটি মেজার্স) আর সম্প্রসারণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর ফলে সরকারি কোষাগারের অর্থায়নে আমলা ও সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ এবং সুদমুক্ত গাড়ি ঋণ পাওয়ার ওপর যে দীর্ঘদিনের কঠোর বিধিনিষেধ ছিল, তা বড়লাট বা নির্বাহী আদেশে তুলে নেওয়া হচ্ছে। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এই নীতি প্রত্যাহারের ফলে অনুন্নয়ন বাজেটের আওতায় নতুন যানবাহন, নৌযান ও উড়োজাহাজ ক্রয় এবং নতুন ভূমি বা জমি অধিগ্রহণের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিল, তা পুরোপুরি উঠে যাচ্ছে। গত ২০২৬ সালের ৫ই এপ্রিল অর্থ বিভাগ থেকে জারিকৃত সংশোধিত ব্যয়সংকোচন নীতিমালার মেয়াদ সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ দিন অর্থাৎ ৩০শে জুন পর্যন্ত বহাল ছিল। তবে নতুন অর্থবছর শুরু হলেও সরকারের নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে এই ব্যয়সংকোচন নীতিমালা পুনরায় জারি বা কার্যকর করার বিষয়ে এখন পর্যন্ত নতুন কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি এবং এই সাশ্রয়ী নীতি আনুষ্ঠানিকভাবে ফুরিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলেছে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স লিমিটেডের একটি মেগা ক্রয়ের মধ্য দিয়ে。 গত ১লা মে বিমান বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত বোয়িং কোম্পানির সাথে ৩.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি বিশাল চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার অধীনে সংস্থাটি নতুন ১৪টি উড়োজাহাজ বা বিমান সংগ্রহ করবে。 অথচ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর চাপ কমাতে এই ধরনের বড় ও বিলাসী ক্রয়প্রক্রিয়া দীর্ঘ দিন ধরে স্থগিত রাখা হয়েছিল। মূলত, এই মিতব্যয়িতা নীতির সূচনা হয়েছিল বিগত জুলাই বিপ্লবের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাত ধরে, যারা ২০২৫ সালের ৮ই জুলাই প্রথম এই সংক্রান্ত একটি কড়া প্রজ্ঞাপন জারি করেছিলেন। তৎকালীন পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, কোষাগারের তীব্র আর্থিক শূন্যতা এবং রাজস্ব ঘাটতির চাপ সামাল দিতেই মূলত অপ্রয়োজনীয় সরকারি খরচ ছাঁটাইয়ের এই বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল。

পরবর্তীতে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর এই নীতিমালায় কিছুটা সংশোধন আনা হয়েছিল。 বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যে হঠাৎ করে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের সরবরাহ চেইন মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়ে এবং এর নেতিবাচক ঢেউ সারা বিশ্বে আছড়ে পড়ে。 বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের এমন এক ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল যে, বিভিন্ন দেশে পেট্রোল পাম্পগুলোর সামনে সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়。 সেই বৈশ্বিক বাস্তবতার নিরিখে ২০২৬ সালের ৫ই এপ্রিল বিএনপি সরকার সাশ্রয়ী নীতিমালায় নতুন কিছু ধারা যুক্ত করে; যার মধ্যে বিদ্যুৎ ও পেট্রোলিয়াম জ্বালানি খাতের বরাদ্দ এক ধাক্কায় ৩০ শতাংশ কর্তন এবং নতুন কম্পিউটার ও কম্পিউটার সামগ্রী ক্রয়ের জন্য বরাদ্দকৃত তহবিল সম্পূর্ণ স্থগিত রাখার মতো কড়া সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের এই ব্যয়সংকোচন নীতি থেকে সম্পূর্ণ সরে আসার সিদ্ধান্তকে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদেরা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিপজ্জনক বলে মনে করছেন। তারা সতর্ক করে বলেছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি এখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল নয় এবং রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হওয়ার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে。 এমন এক টাইট বা সংকটাপূর্ণ রাজস্ব পরিস্থিতিতে সরকারি ব্যয় এক লাফে এতটা বাড়িয়ে দিলে বাজেট বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। তাছাড়া আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির যে টানাপোড়েন এবং আকস্মিক অভিঘাত বা ‘এক্সোজেনাস শক’, তা থেকে বাংলাদেশ এখনও পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি。 পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মাসরুর রিয়াজ এই বিষয়ে বলেন, চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আদায় অনেক কম হতে পারে, যার ফলে সরকারের সামগ্রিক রাজস্ব কাঠামো বড় ধরনের দীর্ঘমেয়াদি চাপে পড়বে。

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার দেশের স্থবির হয়ে পড়া অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার বিশাল ব্যয়ের বিপরীতে ৬.৯৫ লাখ কোটি টাকার একটি বিশাল রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে。 বিগত কয়েক বছর ধরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়ে যাওয়ার পেছনে প্রধানত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, দেশের অভ্যন্তরীণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট এবং অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের ১৮ মাসজুড়ে চলমান অর্থনৈতিক মন্দা সরাসরি দায়ী ছিল。 বর্তমান সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে যে গভীর ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা এখনও প্রশমিত হয়নি বলে জানিয়েছেন ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী。 বিশ্বের মোট দৈনিক জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশই এই সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা ইরান বিগত পাঁচ মাস ধরে প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ বা অবরুদ্ধ করে রেখেছে。 আন্তর্জাতিক এই অবরোধের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম হু হু করে বাড়ছে。

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের এই লাগামহীন উর্ধ্বগতির কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। গত ২২শে জুন জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান যে, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় চলতি বছরের মার্চ থেকে ১১ই জুনের মধ্যে বিপিসি আনুমানিক ১৭,০৩৯ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের লোকসান গুনেছে。 এই বিপুল পরিমাণ ভর্তুকির চাপ কমাতে বর্তমান সরকার বাধ্য হয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে বিদ্যুৎ ও সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করেছে。 এর আগে গত ৩রা জুন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে বলেছিলেন যে, নতুন এই বর্ধিত ট্যারিফ রেট বা মূল্যহারের কারণে সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের প্রায় ১৪,০০০ কোটি টাকার ভর্তুকি সাশ্রয় হবে。 তা সত্ত্বেও, বিদায়ী অর্থবছরে সরকারের সামগ্রিক ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪১,০০০ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কে。

ঐতিহাসিক তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারও ২০২২ সালের জুলাই মাসে জ্বালানি সাশ্রয়ে এক বিশেষ অস্টেরিটি নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল。 সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই ব্যয়সংকোচন নীতিমালার সফল বাস্তবায়নের ফলে সরকার তার প্রাক্কলিত ব্যয়ের প্রায় ২৫ শতাংশ, অর্থাৎ ৫,৫০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ সাশ্রয় করতে সক্ষম হয়েছিল。 জনস্বাস্থ্য ও সামষ্টিক অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ মুস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের মতো একটি আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে কোনোভাবেই এই ব্যয়সংকোচন নীতি থেকে হাত গুটিয়ে নেওয়া সমীচীন হবে না。 বরং বর্তমান অর্থবছরে মিতব্যয়িতার এই নীতিকে আরও কঠোরভাবে জোরদার ও শক্তিশালী করা উচিত ছিল। সাময়িক স্বস্তির জন্য আমলাদের বিদেশ ভ্রমণ বা গাড়ি কেনার অবারিত সুযোগ দেওয়া হলে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা ও মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তথ্যসূত্র: নিউ এজ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category