• শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ১০:৫০ অপরাহ্ন

সাড়ে পাঁচ বছরে শাহজালালে ৪৭ মণ সোনা জব্দ: নেপথ্যে আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট

Reporter Name / ৩ Time View
Update : শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬

দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করা বাংলাদেশ বিমানলাইন্সের বিজি-১৪৮ ফ্লাইট থেকে প্রায় ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম ওজনের ১৬০টি স্বর্ণের বার জব্দ করেছে শুল্ক গোয়েন্দা, এভসেক ও কাস্টমসের একটি যৌথ দল। সুনির্দিষ্ট গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বিমানের কার্গো হোল্ডে বিশেষ তল্লাশি চালিয়ে এই বিপুল পরিমাণ সোনা উদ্ধার করা হয়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। তবে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, এত বড় একটি আন্তর্জাতিক চোরাচালানের ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। এই ঘটনার মাত্র তিন মাস আগে, গত ২৮শে মার্চ ঠিক একই কায়দায় দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশের বিজি-৩৪৮ ফ্লাইটের টয়লেটের কার্গো কম্পার্টমেন্ট থেকে ১৮ কেজি ওজনের আরেকটি ২৪ ক্যারেটের স্বর্ণের চালান জব্দ করা হয়েছিল। তদন্তকারীরা বলছেন, একই এয়ারলাইনস এবং প্রায় সমপরিমাণ স্বর্ণের এই ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে যে, এর নেপথ্যে বাংলাদেশ বিমানলাইন্সেরই অভ্যন্তরীণ কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী বা শক্তিশালী চক্রের সরাসরি হাত রয়েছে। যদিও বিমান বাংলাদেশের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম স্পষ্ট জানিয়েছেন, কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি এখন আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাকারবারিদের অন্যতম প্রধান করিডোর বা ট্রানজিট রুট হয়ে উঠেছে। ঢাকা কাস্টম হাউসের সরবরাহকৃত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত গত সাড়ে পাঁচ বছরে শতাধিক বিশেষ অভিযানে এই বিমানবন্দর থেকে মোট ১ হাজার ৯০২ কেজি বা প্রায় ৪৭.৫৫ মণ চোরাচালানের স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্ধারিত ২২ ক্যারেটের বর্তমান বাজারদর (প্রতি ভরি ২ লাখ ২৮ হাজার ৫৫৬ টাকা) অনুযায়ী, জব্দকৃত এই বিপুল পরিমাণ সোনার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৬৯৮ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছিল। এরপর ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৫৫ কেজি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪১৭ কেজি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬৯ কেজি এবং চলতি বছরের এ পর্যন্ত সাড়ে ৬৩ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। এই সাড়ে পাঁচ বছরে বিমানবন্দর থানায় ৫৪০টি চোরাচালানের মামলা করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাহক বা মূল হোতারা অধরা থেকে যাওয়ায় মামলার আসামিরা অজ্ঞাতপরিচয়ই রয়ে গেছেন।

অপরাধ বিশ্লেষক ও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, চোরাকারবারিরা শাহজালাল বিমানবন্দরকে বিশেষ টার্গেট করার পেছনে প্রধানত দুবাই সংযোগ কাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই, সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েত থেকে আসা ফ্লাইটগুলোকে ব্যবহার করে প্রায় ৭০টি আন্তর্জাতিক সক্রিয় সিন্ডিকেট এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে, যার মধ্যে বিগত সরকারের আমলে বিদেশে অবস্থানকারী অন্তত এক ডজনেরও বেশি প্রভাবশালী বাংলাদেশির নাম গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই চক্রগুলো বাংলাদেশকে মূলত ভারতের একটি ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে। কারণ, বাংলাদেশে প্রতি ১০ গ্রাম সোনার শুল্কের তুলনায় প্রতিবেশী দেশ ভারতে শুল্কের হার অনেক বেশি, যা চোরাকারবারিদের কাছে এই রুটকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও লাভজনক করে তুলেছে। এছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে সোনার উচ্চ চাহিদা ও কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা তো রয়েছেই। গোয়েন্দারা আশঙ্কা করছেন, প্রতিনিয়ত যেসব চালান ধরা পড়ছে, তা হয়তো হিমশৈলের চূড়ামাত্র; প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে হয়তো এর চেয়েও বড় বড় চালান নিরাপদে বের হয়ে যাচ্ছে, যা চক্রগুলোকে বারবার এই বিমানবন্দর ব্যবহারে উৎসাহিত করছে।

পাচারের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটগুলো প্রতিনিয়ত অভিনব ও অবিশ্বাস্য সব কৌশল অবলম্বন করছে। কখনো তারা বিমানের কেবিন ক্রু, পাইলট, ট্রলিম্যান, ক্লিনার বা বিমানবালাদের ব্যবহার করছে, আবার কখনো সাধারণ যাত্রীবেশী বাহকদের মাধ্যমে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, ইলেকট্রিক মোটর, জুতা, হুইলচেয়ার, বেল্ট, সাবানের কেস, ওষুধের কৌটা, ল্যাপটপের ব্যাটারি কিংবা সরাসরি মলদ্বারে সোনা লুকিয়ে নিয়ে আসছে। এমনকি কাস্টমসের চোখ এড়াতে স্বর্ণের বারের ওপর কালো বা সিলভার রঙের প্রলেপ দিয়ে সাধারণ চেইনের লকেট বানিয়েও পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছে। এই আকাশপথের চোরাচালানে মূল হোতাদের সহযোগী হিসেবে সিভিল এভিয়েশন, শুল্ক বিভাগ, বিমানবন্দরের নিরাপত্তাকর্মী, পুলিশ ও আনসার সদস্যদের একাংশের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। শাহজালাল বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ এবং ঢাকা কাস্টম হাউসের অতিরিক্ত কমিশনার মুহাম্মদ কামরুল হাসান জানিয়েছেন, বর্তমানে স্ক্যানিং ও আন্তঃসংস্থার সমন্বয় আগের চেয়ে অনেক শক্তিশালী করা হয়েছে এবং নজরদারি বিশ্বমানের পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে। তবে এই আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রকে পুরোপুরি নির্মূল করতে হলে কেবল বিমানবন্দরে তল্লাশি বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; বরং সোনা আসার মূল উৎস পয়েন্ট দুবাইসহ সংশ্লিষ্ট বিদেশি কর্তৃপক্ষগুলোর সাথে শক্তিশালী কূটনৈতিক ও আইনি সমন্বয় গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category