• শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ১২:২১ পূর্বাহ্ন

দক্ষিণ ইরানে নতুন বিস্ফোরণ, পাল্টাপাল্টি হামলা জোরদার যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের

Reporter Name / ৫ Time View
Update : শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান টানা দ্বিতীয় রাতেও একে অপরের ওপর হামলা চালিয়েছে। এদিকে পর্যবেক্ষকদের মতে, উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, তারা হরমুজ প্রণালীর আশপাশসহ ইরানের ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরানের দাবি, গত দুই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ১৪ জন নিহত হয়েছেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের এলাকাও হামলার শিকার হয়েছে। প্রদেশটির উপ-গভর্নরের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হলেও সর্বশেষ হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো কোনো মন্তব্য করেনি।

এর জবাবে ইরান জানায়, তারা কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। পরে বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, তেহরান কুয়েত, জর্ডান ও ইরাকে আরও হামলা চালিয়েছে।

এদিকে ছয় দিনের শোকানুষ্ঠান শেষে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন সম্পন্ন করতে বিপুল জনসমাগম হয়েছে।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মাশহাদ শহরের রাস্তায় হাজারো মানুষ ইরানের পতাকা হাতে জড়ো হন। অনেককে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার হুমকিসংবলিত প্ল্যাকার্ডও বহন করতে দেখা গেছে।

খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নিহত হন।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সর্বশেষ মার্কিন হামলাকে ‘ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধ’ আখ্যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনকে ‘অশুভ ও মানসিক বিকারগ্রস্ত’ বলে মন্তব্য করেছে।

মন্ত্রণালয় আরও জানায়, তেহরান থেকে মাশহাদে যাওয়া সড়ক সেতু ও রেলপথও হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৮ ও ৯ জুলাই পাঁচটি প্রদেশে মার্কিন হামলায় ১৪ জন নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ৪৭ জন এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

উপসাগরীয় দেশগুলোতেও হামলা
মার্কিন হামলার পর উপসাগরীয় দেশগুলোও ইরানি হামলার খবর দিয়েছে।

বাহরাইনের রাজধানী মানামায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। কুয়েত জানিয়েছে, তারা কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করেছে। কাতার নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করেছে।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) নিশ্চিত করেছে যে, তারা রাতভর কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে। তারা এটিকে ‘চুক্তিভঙ্গকারী আমেরিকার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক জবাবের প্রথম ধাপ’ বলে উল্লেখ করেছে।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ এক্সে লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এখনো শেখেনি যে দমননীতি ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের মূল্য এখন দিতে হয়।’

তিনি আরও লেখেন, ‘স্পষ্ট করে বলছি, তোমরা আঘাত করলে পাল্টা আঘাত পাবে। হরমুজ প্রণালী ইরানের শর্তেই খুলবে, আমেরিকার হুমকিতে নয়।’

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইরানের বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নাবিকদের ওপর হামলার সক্ষমতা আরও দুর্বল করতেই সর্বশেষ অভিযান চালানো হয়েছে।

এক বিবৃতিতে সেন্টকম জানায়, তারা ইরানের ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তু, যার মধ্যে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও উপকূলীয় সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ অবকাঠামোও রয়েছে, সেগুলোতে হামলা চালিয়েছে।

তাদের ভাষায়, ‘এর আগের রাতের সফল হামলার ধারাবাহিকতায় এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে।’

স্বাধীন তেলবাহী জাহাজ মালিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারট্যাঙ্কো-এর মেরিন পরিচালক ফিল বেলচার জানান, দক্ষিণ দিকের রুট ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা এখন এক অঙ্কে নেমে এসেছে।

তার মতে, বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৩০টি জাহাজ চলাচল করছে। এক সপ্তাহ আগেও এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০টি, আর ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি জাহাজ এ পথ ব্যবহার করত।

বিবিসি রেডিও ফোরের টুডে অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের পর শিপিং খাতে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে।

তার ভাষায়, ‘সহিংসতার এই চক্র, ইতিবাচক-নেতিবাচক খবরের ওঠানামা ব্যবসা এবং নাবিক উভয়ের ওপরই বিশাল প্রভাব ফেলছে ‘

বুধবার রাতে ইরানের উপকূলীয় শহর কোনারাক ও চাবাহারসহ বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে বলা হয়, বান্দার আব্বাসে আটটি বিস্ফোরণ হয়েছে। এছাড়া সিরিক ও জাস্ক বন্দরে দুটি করে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের মালিকানা বিরোধে থাকা আবু মুসা দ্বীপেও দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেছে বলে জানানো হয়।

রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, বান্দার আব্বাসে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়।

মার্কিন হামলায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো জানা যায়নি। তবে ইরানি সংবাদমাধ্যম বলছে, চাবাহারে বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং বুশেহরে আইআরজিসির একটি ব্যারাকে আগুন লেগেছে।

ইরানিয়ান স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সি জানায়, চাবাহারের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া তিনটি বিদ্যুৎ লাইনের মধ্যে দুটি দ্রুত সচল করা হয়েছে এবং তৃতীয়টিও শিগগির চালু হবে।

বুধবার সেন্টকম জানায়, আন্তর্জাতিক জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের ‘অযৌক্তিক আগ্রাসনের’ জন্য তেহরানকে জবাবদিহি করতে হবে।

অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান ‘কিছুক্ষণ আগেই ফোন করেছে’ এবং তারা ‘খুব মরিয়া হয়ে সমঝোতা করতে চায়’।

তবে তিনি বলেন, ‘আমি জানি না তারা আদৌ কোনো চুক্তির যোগ্য কি না। আমার সন্দেহ, তারা চুক্তি মানবে না।’

মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, হরমুজ প্রণালীতে তিনটি তেলবাহী জাহাজে হামলার জবাবে তারা শক্তিশালী হামলা চালিয়েছে।

গত ১৭ জুন স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) পর এটিই দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক উত্তেজনা।

ট্রাম্প ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে গত মাসে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি শেষ।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি আর তাদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না। তারা নোংরা মানুষ। তারা অসুস্থ মানসিকতার।’

জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক্সে লেখেন, ‘অশালীনতার জবাব আমরা অশালীনতায় দিই না; আমরা জবাব দিই নির্ভয়ে, সাহসিকতার সঙ্গে কর্মের মাধ্যমে।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ১৪ দফার সমঝোতায় ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, হরমুজ প্রণালীতে নিরাপদ জাহাজ চলাচল এবং ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।

যদিও ওই ৬০ দিনের সময়সীমা এখনো শেষ হয়নি, তবুও ট্রাম্প বলেছেন, তিনি এখন নতুন করে আলোচনাকে ‘সময়ের অপচয়’ বলে মনে করেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category