দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে নদ-নদীর পানি ধীরগতিতে কমতে শুরু করলেও কমেনি উপদ্রুত মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ। পানি যত নামছে, চোখের সামনে ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ফসলি জমি এবং মৎস্য খাতের ক্ষয়ক্ষতির এক প্রলয়ংকরী ও ধ্বংসাত্মক চিত্র। দেশের বিস্তীর্ণ জনপদে বন্যার পানির নিচে দীর্ঘদিন তলিয়ে থাকা হাজার হাজার ঘরবাড়ি কাঁচা মাটির মতো ধসে পড়ছে, যার ফলে গৃহহীন হয়ে পড়েছে লাখো পরিবার। এদিকে চিলতে একটু স্বস্তির মাঝেই নতুন করে বড় ধরনের বিপদের মেঘ জমছে ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী নদীগুলোতে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যে আগামী কয়েক দিনে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের যে বিশেষ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, তা দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোর জন্য নতুন করে এক চরম আকস্মিক বন্যার শঙ্কা তৈরি করেছে, যা মাঠপর্যায়ের প্রশাসনকে ফের উদ্বেগে ফেলেছে।
সরকারি সর্বশেষ পরিসংখ্যান এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার তথ্য অনুযায়ী, দেশের অন্তত আটটি জেলার ৫৯টি উপজেলার ৩৬৮টি ইউনিয়ন এবং ১২টি পৌরসভা এই প্রলয়ংকরী বন্যায় সম্পূর্ণ লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯৪১টি অসহায় পরিবার। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে মানবহানির ক্ষেত্রে; এ পর্যন্ত বন্যা ও ভয়াবহ পাহাড়ধসের কারণে ৫৬ জন নাগরিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে, যাদের একটি বড় অংশই পাহাড়ি অঞ্চলে মাটি চাপায় প্রাণ হারিয়েছেন। পানি কমার এই মরণকামড়ে এখন দুর্গত এলাকাগুলোতে তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠেছে বিশুদ্ধ খাওয়ার পানির সংকট। নলকূপগুলো বন্যার নোংরা পানিতে ডুবে থাকায় এবং চারপাশের পচা পানি থেকে ডায়রিয়া, জন্ডিসসহ বিভিন্ন মারাত্মক পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র খতিয়ে দেখলে জানা যায়, নেত্রকোনার সোমেশ্বরী নদীর কলমাকান্দা পয়েন্টে পানির উচ্চতা ইতিমধ্যে বিপদসীমা অতিক্রম করে প্রবল বেগে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে যে, নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা, ময়মনসিংহের ধোবাউড়া ও হালুয়াঘাট এবং শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলা নতুন করে প্লাবিত হওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ময়মনসিংহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম হাসনাইন মাহমুদ জানিয়েছেন, বর্তমানে মেঘালয়ের বৃষ্টিপাতের ওপর সবকিছু নির্ভর করছে। সেখানে নতুন করে ঢল নামলে শেরপুরের ভোগাই এবং নেত্রকোনার সোমেশ্বরী নদীতে পানির প্রবাহ অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাবে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় সীমান্তবর্তী অঞ্চলের নদীতীরবর্তী সাধারণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পর্যটন নগরী কক্সবাজার ও সংলগ্ন পেকুয়া ও চকরিয়া এলাকায় গত দুই দিন বৃষ্টি না হওয়ায় পানি কিছুটা কমলেও মাতামুহুরী নদীর অববাহিকায় এখনো লাখো মানুষ চরম জলাবদ্ধতার মধ্যে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বহু গ্রামে সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকায় এখনো নৌকাই একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্গতদের অভিযোগ, সরকারি খাতার চেয়ে বাস্তবে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট অনেক বেশি প্রকট। তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, পুলিশ ও বিজিবির বিশেষ সহায়তায় প্রত্যন্ত অঞ্চলে ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম গতিশীল করা হয়েছে। পাহাড়ি জেলা বান্দরবানের চিত্র আরও বেশি ভয়াবহ। সেখান থেকে পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার পর স্পষ্ট হয়েছে যে, প্রায় ১২ হাজার ৫০০ পরিবার তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়েছে। বর্তমানেও ৬৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২ হাজার ৫৮২ জন মানুষ চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। এখানে পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে এবং গ্রামীণ সড়ক ও সেতুগুলো চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
অনুরূপ চিত্র দেখা গেছে রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি, বরকল ও দুর্গম বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নে। বৃষ্টিপাত কমায় পানি নামলেও বহু কাঁচা ঘরবাড়ি মাটির সাথে মিশে গেছে। জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফি জানিয়েছেন, এখনো ৪৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩ হাজার ৪৮৭ জন মানুষ অবস্থান করছেন। দুর্গতদের জন্য জরুরি চিকিৎসাসেবায় প্রতিটি ইউনিয়নে বিশেষ মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের তিস্তা অববাহিকার নীলফামারীর ডিমলার ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপদসীমার নিচে নামলেও তিস্তার তীব্র স্রোতের কারণে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে, যা নদীপাড়ের মানুষের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। এছাড়া নওগাঁর রানীনগর ও আত্রাই উপজেলায় পাহাড়ি ঢলে প্রায় ৮০০ বিঘা জমির উঠতি ফসল সম্পূর্ণ পচে নষ্ট হয়ে গেছে এবং ৬০টি পুকুরের প্রায় ৪৫ লাখ টাকার মাছ বানের পানিতে ভেসে গেছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে পুরোপুরি পঙ্গু করে দিয়েছে।
এই চরম জাতীয় দুর্যোগের মুখে সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের বেশ কিছু বড় উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত জরুরি সভা শেষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা নগদ অর্থ, ৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল এবং পর্যাপ্ত শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ ত্রাণ তহবিল থেকে প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত জেলার জন্য অতিরিক্ত ২০ লাখ টাকা করে জরুরি থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দুর্গম ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন পাহাড়ি এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করতে এবং তাদের কাছে শুকনো খাবার পৌঁছে দিতে বেসামরিক প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি ও কোস্টগার্ডের বিশেষ দল নিয়োজিত করা হয়েছে। দুর্গম অঞ্চলের জন্য স্পিডবোট ও রাবার বোটের সংখ্যা আরও বাড়ানো হয়েছে।
বন্যা পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদি ধকল সামলাতে সরকার একটি সমন্বিত পুনর্বাসন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে মন্ত্রী জানান। এই মহাপরিকল্পনার অধীনে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) যৌথভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বড় সড়ক ও সেতুগুলো দ্রুত মেরামতের কাজ শুরু করবে। আর গ্রামীণ কাঁচা রাস্তাঘাট মেরামতের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। এছাড়া বন্যাকবলিত দরিদ্র মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে অতি দ্রুত বিশেষ ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি’ বা ওএমএস চালু করা হবে। মন্ত্রী স্বীকার করেন যে, চলতি বছরের সবচেয়ে প্রলয়ংকরী ও দীর্ঘস্থায়ী বন্যাটি দেখা দিয়েছে চট্টগ্রাম ও এর আশপাশের অববাহিকায়। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং জেলা প্রশাসকদের সাথে একাধিক জরুরি বৈঠক করেছেন এবং তাঁরই বিশেষ নির্দেশনায় ত্রাণমন্ত্রী আজ থেকে সরাসরি বন্যাকবলিত অঞ্চলগুলো পরিদর্শনে যাচ্ছেন, যাতে মাঠপর্যায়ের পুনর্বাসন কার্যক্রমের শতভাগ স্বচ্ছতা ও গতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত