• বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:০২ অপরাহ্ন

কর্মস্থলে ডে কেয়ার কেন জরুরি: ৪টি অভিজ্ঞতা

বাদল সৈয়দ / ১ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

আমার এক পরিচিত মেয়ে। একটি খুব নামকরা প্রতিষ্ঠানে কাজ করে। কয়েকদিন আগে তার মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষ হয়েছে। এখন অফিসে জয়েন করতে হবে। সে পড়েছে মারাত্মক সমস্যায়। তার ছয় মাসের শিশুকে দেখে রাখার মতো আপন কেউ বাসায় নেই। কাউকে এনে রাখাও সম্ভব নয়।
শেষ পর্যন্ত অনেক খুঁজে সে একজন হেল্পিং হ্যান্ড জোগাড় করল। কিন্তু সে কাঁদতে কাঁদতে অফিসে যায়। মেয়ের চিন্তায় সারাক্ষণ অস্থির থাকে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এরকম অস্থির থেকে, সন্তানের জন্য দুঃশ্চিন্তায় থেকে মেয়েটি কি আসলে তার কাজে মনোযোগ দিতে পারছে? প্রতিষ্ঠানটি কি তার কাছ থেকে সেরা আউটপুট পাচ্ছে?
আমার ধারণা, পাচ্ছে না। কারণ বাচ্চার চিন্তায় মেয়েটির পক্ষে কাজে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া কঠিন।
এ অভিজ্ঞতা অনেক কর্মজীবী মায়ের প্রতিদিন হয়।
অথচ বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অফিসে ডে কেয়ার সেন্টার স্থাপন করা খুব কঠিন ব্যাপার নয়।
কর্মস্থলে একটি ডে কেয়ার সেন্টার কর্মজীবী মা এবং তাদের নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কী উপকার করতে পারে তা চারটি অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি।
১) আনন্দের শুরু লিফটে
আমি অফিসে ঢোকার পর সবচেয়ে আনন্দময় মুহূর্ত হলো, লিফটে কিছু উচ্ছল শিশু ও তাদের মায়েদের দেখা। এই বাচ্চারা যাচ্ছে ডে কেয়ার সেন্টারে। মায়েরা সেখানে তাদের রেখে কাজে যান। সেন্টারটিতে শিশুদের দেখাশোনার জন্য সার্বক্ষণিক কর্মী আছেন।
ডে কেয়ার সেন্টার করার আগে ও পরে একই মহিলা সহকর্মীদের দেখার অভিজ্ঞতা আমার আছে। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, এখন তাঁদের কাছ থেকে আমরা আগের চাইতে অনেক বেশি আউটপুট পাচ্ছি। কারণ তাঁরা বাচ্চার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থেকে কাজে মনোযোগ দিতে পারছেন।
বলে রাখা ভালো, এ সেন্টারটি স্থাপনে আমার কোনো অবদান নেই।
২) লসটা আসলে কার?
আমি কিছুদিন আগে একটি ছোট প্রতিষ্ঠানে একজন কর্মীকে যোগ দিতে দেখেছি- যিনি আগে অনেক নামি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। আমি তাঁকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, ‘এখানে ডে কেয়ার সেন্টার আছে, আগেরটিতে ছিল না। এ কোম্পানি তুলনামূলকভাবে ছোট। কিন্তু আমার বাচ্চা নিরাপদে আছে, হাতের কাছে আছে, এটিই আমার প্রাপ্তি। প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড নেমের চাইতে একজন মায়ের কাছে সন্তানের ব্যাপারে স্বস্তি অনেক গুরুত্বপূর্ণ।‘
মেয়েটি কাজেকর্মে খুবই ভালো। তার আগের প্রতিষ্ঠান ডে কেয়ার সেন্টার না থাকায় এ রকম ভালো একজন কর্মী হারিয়েছে। তা হলে লসটা আসলে কার? ভালো কর্মীর শূন্যতা পূরণ খুব কঠিন।
৩) মৌলভীবাজারের ছোট্ট আহনাফ-
২০১৭ সালে সিলেট বিভাগে ট্যাক্স কমিশনার হিসেবে কাজ করার সময় আমি খেয়াল করলাম, মৌলভীবাজার জেলার পারফরম্যান্স ভালো নয়। সেখানে একজন নারী কর্মকর্তা দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর পারফরম্যান্স আগে খুব ভালো ছিল কিন্তু হঠাৎ তা খারাপ হতে লাগল। কেউ কেউ বললেন, তাঁকে বদলি করে সেখানে অন্য অফিসার পাঠাতে।
আমি চিন্তা করলাম, অফিসারকে বদলি করা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। তাছাড়া, তাঁর স্বামী মৌলভীবাজারে একটি চা বাগানে চাকরি করেন। বদলি করলে পরিবারটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তার চেয়ে বরং আমার ভাবা উচিত, একজন ভালো অফিসারের মান হঠাৎ কেন কমে গেলো?
খোঁজ নিয়ে জানলাম, তিনি কয়েক মাস বয়সী শিশুপুত্রকে বাড়িতে রেখে অফিসে আসায় খুব চিন্তিত থাকেন। তাই কাজে আগের মতো মনোযোগ দিতে পারেন না।
ভদ্রমহিলাকে বদলি না করে মৌলভীবাজার অফিসে ছোট্ট একটি ডে কেয়ার সেন্টার তৈরি করলাম। সেটির প্রথম অতিথি হলো সেই অফিসারের শিশুপুত্র আহনাফ। সেন্টারটির নামও রাখা হলো তার নামানুসারে। আহনাফ ডে কেয়ার সেন্টার।
আমাদের খরচ হয়েছিল নামমাত্র। কিন্তু সেই অফিসারের কাজের মান আগের চাইতেও বেড়ে গিয়েছিল। এখনো তিনি সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন।
৪) মায়ের কাছে ফেরা-
গতকাল অফিস থেকে ফেরার সময় লিফটে দুজন মহিলা সহকর্মী ছিলেন। লিফট দোতলায় থামল। সেখানে দুজন শিশু অপেক্ষা করছিল। তারা লাফ দিয়ে লিফটের ভেতরে থাকা মায়েদের বুকে ঝাঁপ দিলো। ভদ্রমহিলা দুজনের মুখেও আনন্দ এবং স্বস্তি জ্বলজ্বল করছে।
ডে কেয়ার সেন্টার শুধুমাত্র সুবিধা নয়- এটি এমন একটি বিনিয়োগ যা কর্মী এবং প্রতিষ্ঠান দুটোকেই দিন শেষে লাভবান করে। এটি আমার কথা নয়- বিভিন্ন গবেষণার কথা।
সমস্যা হচ্ছে, ব্যাপারটি অনেকেই আমলে নেন না। অথচ কর্মী মানে লাভের অঙ্ক বাড়ানোর রোবট নন। মানুষ!
#আসুন মায়া ছড়াই


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category