রাতে পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পরও সকালে বিছানা ছেড়ে উঠতে চরম অনিচ্ছা এবং দিনজুড়ে ক্রমাগত ক্লান্তি ও ঘুম ঘুম ভাব এখন অনেকেরই একটি পরিচিত স্বাস্থ্য সমস্যা। ব্যস্ত ও মানসিক চাপে ভরা আধুনিক জীবনযাপন, অনিয়মিত ঘুমের অভ্যাস কিংবা অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রমকে আমরা সচরাচর এই অলসতা বা অবসাদের মূল কারণ হিসেবে ধরে নিই। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও পুষ্টিবিদদের মতে, এই সমস্যাটিকে কেবল সাধারণ আলস্য বা সাময়িক ক্লান্তি ভেবে অবহেলা করা একদম উচিত নয়। কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঘুম পাওয়া বা শরীর রিচার্জ না হওয়ার এই দীর্ঘস্থায়ী অনুভূতিটি বস্তুত শরীরের ভেতরের একটি মারাত্মক পুষ্টিঘাটতির গোপন সংকেত হতে পারে, যার মূলে রয়েছে মানবদেহের জন্য অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান ভিটামিন বি১২-এর অভাব।
আমাদের শরীরে লোহিত রক্তকণিকা বা রেড ব্লাড সেল উৎপাদনে ভিটামিন বি১২ অত্যন্ত কেন্দ্রীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই লোহিত রক্তকণিকাগুলোর মূল কাজ হলো রক্তসংবহন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, তন্তু ও কোষে নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়া। যখন শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন বি১২ থাকে না, তখন লোহিত রক্তকণিকা গঠনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া চরমভাবে ব্যাহত হয় এবং রক্তে এর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। কোষগুলোতে প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ফলে শরীরের অভ্যন্তরীণ শক্তি উৎপাদনের স্বাভাবিক গতি থমকে দাঁড়ায়। এর প্রত্যক্ষ ফলস্বরূপ শরীরে তৈরি হয় অকারণ ক্লান্তি, শক্তিহীনতা এবং সারাদিন ধরে ঝিমুনি বা ঢুলুঢুলু অনুভূতি, যা পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরও দূর হতে চায় না।
ভিটামিন বি১২ কেবল রক্তকণিকা বা রক্ত তৈরির কাজেই সীমাবদ্ধ নয়; মানবদেহের ডিএনএ গঠন এবং স্নায়ুতন্ত্রের সংবেদনশীল কার্যকারিতা স্বাভাবিক রাখার পেছনেও এর সক্রিয় অবদান রয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিনের দীর্ঘমেয়াদী অভাব ঘটলে মস্তিষ্ক থেকে শরীরের বিভিন্ন অংশে স্নায়বিক সিগন্যাল বা বার্তা আদান-প্রদান ব্যাহত হতে শুরু করে। ফলে শুধু ক্লান্তিই নয়, বরং মনোযোগের অভাব, কোনো কিছু দ্রুত ভুলে যাওয়া, হাত-পায়ে অবশ ভাব বা ঝিনঝিন করা এবং অতিরিক্ত মানসিক অবসাদ বা বিষণ্নতার মতো গুরুতর জটিল উপসর্গ দেখা দেয়। অনেক সময় শরীরে যখন অভ্যন্তরীণ এই পুষ্টির অভাব তীব্র হতে শুরু করে, তখন অতিরিক্ত ঘুম বা সবসময় ঘুমানোর প্রবল তাড়নাটিই প্রাথমিক সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা দেয়।
ভিটামিন বি১২-এর সংকট থেকে পরবর্তীতে শরীরে রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া দানা বাঁধতে পারে। এই অবস্থায় রক্তের গুণগত মান ও কর্মক্ষমতা এতটাই কমে যায় যে, একজন ব্যক্তি দিনে বা রাতে যতই ঘুমান না কেন, ঘুম থেকে ওঠার পর সতেজ বা প্রাণবন্ত অনুভব করতে পারেন না। মানুষের শরীর নিজে থেকে এই বিশেষ ভিটামিনটি তৈরি বা সংশোধন করতে পারে না, তাই দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার মাধ্যমেই তা সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু আমাদের খাদ্যভ্যাসের ভুলের কারণে অনেকেই এই পুষ্টিহীনতায় ভোগেন। বিশেষ করে যারা সম্পূর্ণ নিরামিষাশী, তারা এই ঘাটতির সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন, কারণ সাধারণ উদ্ভিদজাত খাবারে ভিটামিন বি১২-এর উপস্থিতি প্রায় নগণ্য বললেই চলে।
এ ছাড়া বয়স্ক ব্যক্তি, যাদের পরিপাকতন্ত্রে খাদ্য উপাদানের প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষণ করার ক্ষমতা কমে যায়, কিংবা যারা দীর্ঘকাল ধরে গ্যাস্ট্রিক বা অম্বল কমানোর ওষুধ সেবন করছেন, তারা ভিটামিন বি১২ ঘাটতির উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন। ডায়াবেটিস রোগের চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ সেবনকারীদের ক্ষেত্রেও এই ভিটামিন শোষণে বাধা তৈরি হতে পারে। ভিটামিন বি১২-এর প্রধান খাদ্য উৎস হলো প্রাণিজ প্রোটিন যেমন মাছ, খাসি ও মুরগির মাংস, ডিম, দুধ এবং দই বা ছানার মতো দুগ্ধজাত খাদ্যসামগ্রী। বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছ ও পোলট্রি খাদ্য সামগ্রীতে এই ভিটামিন প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান থাকে।
পুষ্টিবিদদের মতে, যারা খাদ্যাভ্যাসের কারণে নিয়মিত প্রাণিজ খাবার গ্রহণ করতে পারেন না বা একেবারেই গ্রহণ করেন না, তাদের ক্ষেত্রে কৃত্রিম ভিটামিন বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে। তবে বাজারে প্রচলিত যেকোনো সাপ্লিমেন্ট নিজ উদ্যোগে সেবন করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সারাদিন অনবরত ক্লান্তি, ঝিমুনি বা অবসাদ অনুভূত হলে শুরুতেই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে পুষ্টির প্রকৃত মাত্রা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। সঠিক সময়ে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এনে এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি পূরণ করে এই মারাত্মক শারীরিক অবসাদ থেকে দ্রুত মুক্তি পাওয়া সম্ভব।