• মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:২০ অপরাহ্ন
Headline
বার বার প্রত্যাখ্যান হয়েও আজ যিনি সফল অভিনেতা আজারবাইজান থেকে এলএনজি আনতে চায় সকার: পুরোনো পাওনা মেটানোর আগেই নতুন প্রস্তাব উচ্চশিক্ষায় অ্যাকাডেমিক দায়বদ্ধতার সংকট: বিপুল অনুদান পেলেও জমা পড়েনি বহু শিক্ষকের গবেষণার প্রতিবেদন আমাদের মোহিত কামাল ভাই জেলা পরিষদের প্রশাসক-চেয়ারম্যানদের রাষ্ট্রীয় প্রটোকল নিশ্চিতে ডিসিদের নির্দেশ পাবনায় চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে যুবকের মৃত্যু বরিশালের বাকেরগঞ্জে বোমাসদৃশ বস্তুর বিস্ফোরণে দগ্ধ ৩ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কৃতিত্ব এককভাবে কারও নয়: রিজভী স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের নির্দেশনার অপেক্ষায় ইসি: ইসি সচিব প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানেই উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর টেকসই জীবিকা: প্রতিমন্ত্রী

আজারবাইজান থেকে এলএনজি আনতে চায় সকার: পুরোনো পাওনা মেটানোর আগেই নতুন প্রস্তাব

Reporter Name / ১ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

জাতীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের সাথে আজারবাইজানের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সকারের (SOCAR) বড় অংকের আইনি ও আর্থিক বিরোধ আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এই জটিল পরিস্থিতির মাঝেই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে পুনরায় বৃহৎ পরিসরে যুক্ত হওয়ার আকস্মিক আগ্রহ প্রকাশ করেছে বিতর্কিত কোম্পানিটি। দীর্ঘমেয়াদে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ করা, বঙ্গোপসাগরে নতুন ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনাল নির্মাণ এবং খুলনা অঞ্চলের বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার মতো একাধিক মেগা প্রকল্পের লিখিত প্রস্তাব পাঠিয়েছে আজারবাইজানের এই রাষ্ট্রীয় সংস্থা। পুরানো বিতর্ক ও শত শত কোটি টাকার ক্ষতিপূরণের মামলার কোনো সমঝোতা না করেই জ্বালানি বিভাগ এই প্রস্তাব ইতিবাচকভাবে পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়ায় খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের মনে গভীর উদ্বেগ ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রস্তাবের নেপথ্য ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, গত জুনের শুরুর দিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল আজারবাইজান সফরে যায়। সফরকালে ৩ জুন সকারের ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিদের সাথে মন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় প্রাতিষ্ঠানিক বৈঠক করেন। সেই আলোচনার সূত্র ধরে সফরের দু-সপ্তাহের মাথায়, অর্থাৎ ১৫ জুন সকার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে একাধিক প্রকল্পের প্রস্তাব জ্বালানি বিভাগে পৌঁছায়। দপ্তরটি প্রস্তাব পাওয়ার মাত্র দু-দিনের মাথায় বিষয়টি পর্যালোচনার প্রশাসনিক নির্দেশ দেয় এবং জুনের শেষে পেট্রোবাংলাকে সকারের সাথে দীর্ঘমেয়াদী এলএনজি বিক্রয় চুক্তির (এসপিএ) প্রয়োজনীয় খসড়া ও প্রস্তুতি নেওয়ার আনুষ্ঠানিক চিঠি প্রদান করে।

আজারবাইজানি প্রতিষ্ঠানটির মূল প্রস্তাবনার প্রধান অংশজুড়ে রয়েছে সরকারি পর্যায় (জিটুজি) ভিত্তিতে বাংলাদেশকে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে বছরে ৫ লাখ থেকে ১৫ লাখ টন পর্যন্ত এলএনজি সরবরাহ করা, যার মেয়াদ হতে পারে ৫ থেকে ১৫ বছর। তবে এই প্রস্তাবের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে জ্বালানি খাতের ভেতরে নানা বিতর্ক রয়েছে। কারণ, সকার কোনো প্রাথমিক এলএনজি উৎপাদনকারী দেশ বা কোম্পানি নয়; বরং তারা আন্তর্জাতিক খোলা বাজার বা অন্যান্য বিশ্ব উৎস থেকে গ্যাস কিনে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিক্রি করে। বর্তমানে কাতার ও ওমানের মতো সরাসরি উৎপাদক রাষ্ট্রগুলোর সাথে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী এলএনজি চুক্তি রয়েছে। সরাসরি উৎপাদনকারীর বদলে মধ্যস্থতাকারী কোনো ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের সাথে জিটুজি ছায়ায় দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিতে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য কতটা সাশ্রয়ী বা লাভজনক হবে, তা নিয়ে নীতিগত অস্পষ্টতা থেকেই যায়।

এলএনজি সরবরাহের পাশাপাশি দেশে আরও একটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের জন্য আগ্রহ দেখিয়েছে সকার। দৈনিক ৫০০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতাসম্পন্ন এই ধরনের একটি টার্মিনাল তৈরিতে আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬০ কোটি মার্কিন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় সাত হাজার ৪০০ কোটি টাকারও বেশি। এর আগে ২০২৫ সালের আগস্টেও তারা একই ধরনের একটি প্রস্তাব দিয়েছিল, যা নতুন চিঠিতে পুনরায় বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে। এ ছাড়া, প্রস্তুতকৃত খুলনার রূপসা কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্লান্টের বাণিজ্যিক পরিচালনায় অংশ নেওয়ার বিষয়েও তারা গভীরভাবে আগ্রহী।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ইজাজ হোসেনের মতে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে এলএনজি ট্রানজিট এবং অবকাঠামো নির্মাণের জন্য অসংখ্য বিশ্বখ্যাত ও দক্ষ প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি রয়েছে। ফলে কোনো আন্তর্জাতিক আইনগত বিরোধ বা আর্থিক ঝুঁকি চেপে রেখে একক প্রতিষ্ঠানের প্রতি এমন তড়িঘড়ি আনুগত্য দেখানো জাতীয় স্বার্থের অনুকূল নয়। সকারের সাথে বাংলাদেশের বিবাদের সূত্রপাত মূলত ২০১৭ সালে, যখন বাপেক্সের সাথে ৩৯৯ কোটি টাকার বিনিময়ে তিনটি গ্যাস কূপ খননের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির আওতায় সকার ‘দক্ষিণ সেমুতাং-১’ নামক স্থানে একটি কূপ খনন করে, কিন্তু সেখান থেকে কোনো গ্যাসের সন্ধান মেলেনি। এ কাজের জন্য সকারকে ১৪২ কোটি টাকা পরিশোধও করে বাপেক্স।

সমস্যার জটিলতা বাড়ে ‘বেগমগঞ্জ-৪’ কূপে খননের পূর্বে অতিরিক্ত খরচ ও অগ্রিম অর্থ দাবিকে কেন্দ্র করে। চুক্তির শর্ত বহির্ভূতভাবে সকার কাজ শুরুর প্রস্তুতি বাবদ বাপেক্সের কাছে প্রায় ৭৩ কোটি টাকা অগ্রিম দাবি করে, যা দিতে রাজি হয়নি রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানটি। এর জের ধরে বিল পরিশোধে বিলম্বের অযুহাতে ২০১৯ সালের জুনে সকার একতরফাভাবে চুক্তি বাতিল করে চম্পট দেয় এবং আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে বাপেক্সের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয়। সিঙ্গাপুরের সালিশি আদালত রিগ আটকে রাখা ও সাব-কন্ট্রাক্টরের পাওনা সহ বিভিন্ন খাতে বাপেক্সকে প্রায় ৫২০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দেন। তবে বাপেক্স এই একপেশে রায়ের বিরুদ্ধে ফ্রান্সের আপিল আদালতে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, যা বর্তমানে অনিষ্পন্ন অবস্থায় ঝুলছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাপেক্স ও সকারের মধ্যকার এই বিশাল অংকের ক্ষতিপূরণ মামলা ও আইনি জটিলতা এড়িয়ে হুট করে নতুন ব্যবসা শুরু করার প্রশাসনিক গতিবিধি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল। ক্যাব-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম মনে করেন, আন্তর্জাতিক আদালতের মামলা ঝুলিয়ে রেখে বা পুরানো পাওনা-দেনার হিসাব সুরাহা না করে নতুন চুক্তিতে জড়িয়ে পড়া রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। নতুন কোনো প্রকল্পে হাত দেওয়ার আগে অবশ্যই অতীত বিরোধের একটি সম্মানজনক ও স্থায়ী সমাধান টানা জরুরি, অন্যথায় আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার ও বাণিজ্যিক দরকষাকষির শক্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে।

তথ্যসূত্র: সমকাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category