বিশ্বজুড়ে যুদ্ধক্ষেত্রের লড়াই এখন কেবল গোলাবারুদ আর ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে এক ভয়ংকর তথ্যযুদ্ধে রূপ নিয়েছে। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় দীর্ঘ সময় ধরে চলা ধ্বংসযজ্ঞ ও নির্বিচার গণহত্যার ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মারাত্মক ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে ইসরায়েল। এই সংকট সামাল দিতে এবং বিশ্বজুড়ে চ্যাটজিপিটি, ক্লড, পারপ্লেক্সিটি কিংবা জেমিনির মতো জনপ্রিয় এআই চ্যাটবটগুলোর উত্তর নিজেদের পক্ষে প্রভাবিত করতে এক অভিনব ও চরম বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকল্প শুরু করেছে দেশটি। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, এআই অ্যালগরিদম ও আধুনিক ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলোকে কৃত্রিম উপায়ে প্রভাবিত করতে কোটি কোটি ডলারের বিনিময়ে ভুয়া থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ও বহু সাজানো গবেষণামূলক ওয়েবসাইটের এক বিশাল গোপন জাল তৈরি করেছে তেল আবিব।
ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় তথ্য-প্রচার কৌশল বা ‘হাজবারা’ যে বিশ্ববাসীর সামনে সত্য আড়ালের চেষ্টা করছে, তা সম্প্রতি দেশটির প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বক্তব্যেই স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে। দেশটির ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টির শীর্ষ যোগাযোগ কর্মকর্তা এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাবেক প্রেস মুখপাত্র এলি হাজান রাখঢাক না রেখেই ঘোষণা করেছেন যে, বর্তমান যুগে সত্যের কোনো বাস্তব মূল্য নেই। আন্তর্জাতিক মহলের সমালোচনার জবাব দিতে তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে স্বহস্তে ভুয়া খবর তৈরি করছেন এবং ডিজিটাল তথ্যজগৎকে ইসরায়েল-বান্ধব তথ্যের বন্যায় ভাসিয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছেন। এই নির্লজ্জ স্বীকারোক্তিটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাদের সাজানো প্রচারণা নেটওয়ার্কের মূল রূপরেখাকে উন্মোচিত করেছে।
দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধান অনুযায়ী, এই তথ্য জালিয়াতির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ‘হ্যানোভার ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। আপাতদৃষ্টিতে একে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি উচ্চমানের আন্তর্জাতিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান মনে হলেও বাস্তবে এর কোনো আইনি ভিত্তি, প্রাতিষ্ঠানিক ঠিকানা, নিজস্ব গবেষক বা নিয়মিত কর্মী নেই। কোনো স্থায়ী অস্তিত্ব না থাকা সত্ত্বেও গত আগস্ট মাসের মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে এই ভুয়া প্রতিষ্ঠানটির নাম দিয়ে ১২৪টি দীর্ঘ তথাকথিত গবেষণাপত্র প্রকাশ করা হয়, যার সম্মিলিত কলেবর প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শব্দেরও বেশি। এই নিবন্ধগুলোর শিরোনাম ইচ্ছাকৃতভাবে সাধারণ ব্যবহারকারীদের এআই সার্চ প্রম্পটের আদলে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে দখলদারিত্ব, জায়নবাদ, ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন কিংবা গাজায় গণহত্যার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে মানুষ প্রশ্ন করলে চ্যাটবটগুলো সরাসরি এসব বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদর্শন করে।
এই সাজানো গবেষণাপত্রগুলোতে অত্যন্ত চতুরতার সাথে জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক বা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো বৈশ্বিক বিশ্বাসযোগ্য সংস্থার উদ্ধৃতি ও আইনি পরিভাষা জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে গভীর পর্যালোচনায় স্পষ্ট হয় যে, আন্তর্জাতিক আইনের ভাষা ব্যবহার করে আসলে গাজার হত্যাযজ্ঞ নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠিত সত্য ও যুদ্ধাপরাধের প্রমাণকে প্রশ্নবিদ্ধ করাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। ‘রেস’ নামের একটি এআই-নেটিভ কনটেন্ট প্ল্যাটফর্মের প্রযুক্তি এবং নিউইয়র্কভিত্তিক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ‘পাইরো ইনক’-এর মাধ্যমে এই ভুয়া নথিপত্রগুলো তৈরি করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি মূলত ‘এআই স্টোরি অপটিমাইজেশন’ নামক কৌশলের মাধ্যমে কাজ করে, যার মূল লক্ষ্য হলো বড় বড় ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলো কীভাবে তথ্যের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করে তা পর্যালোচনা করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে নিজেদের মিথ্যা তথ্যকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে উপস্থাপন করা।
ইসরায়েলি এই ডিজিটাল কৌশলের ক্ষতিকর প্রভাব দুই ধাপে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রথমত, ব্যবহারকারীরা যখনই মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিয়ে এআইকে প্রশ্ন করেন, অ্যালগরিদমগুলো সার্চ রেজাল্ট হিসেবে এসব সাজানো থিঙ্ক ট্যাঙ্কের রেফারেন্স ব্যবহার করে তেল আবিবের অনুকূলে বিভ্রান্তিকর উত্তর সাজায়। দ্বিতীয়ত এবং সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ইন্টারনেটের উন্মুক্ত ডেটাবেজে এই বিপুল পরিমাণ তৈরি করা উপাত্তের স্তূপ ছড়িয়ে দেওয়ার ফলে ভবিষ্যতে যেসব নতুন প্রজন্মের এআই মডেল প্রশিক্ষণ পাবে, সেগুলোর স্থায়ী মেমোরিতে এই একপাক্ষিক ও অসত্য দৃষ্টিভঙ্গি চিরতরে গেঁথে যাবে। এর ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রযুক্তি ব্যবহারকারীরা জানতেই পারবেন না যে তারা প্রযুক্তির কাছ থেকে নিরপেক্ষ সত্যের বদলে একটি রাষ্ট্রের পরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা গ্রহণ করছেন।
তদন্তে আরও বেরিয়ে এসেছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক নির্বাচনী প্রচার ব্যবস্থাপক ব্র্যাড পারস্কেলের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘ক্লক টাওয়ার এক্স’-এর সঙ্গে ইসরায়েলি সরকারের প্রায় ৪৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের একটি গোপন চুক্তি রয়েছে। এই চুক্তির আওতায় অন্তত ১০টি বিশেষ ওয়েবসাইট বানিয়ে গাজায় নিহত সাংবাদিক এবং ছয় বছর বয়সী নিহত শিশু হিন্দ রাজাবের মতো নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোর সত্যতা নিয়ে পরিকল্পিত সংশয় তৈরি করা হচ্ছিল। এসব তৎপরতা ইসরায়েলের বহুমুখী তথ্য সন্ত্রাসেরই বহিঃপ্রকাশ, যার মধ্যে রয়েছে পেইড ইনফ্লুয়েন্সার নিয়োগ, উগ্র রক্ষণশীল মিডিয়ার পৃষ্ঠপোষকতা, গণ-মেসেজ পাঠানো এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে বিষাক্ত করার ব্যাপক প্রকল্প।
এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢেলে এবং আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার করেও শেষ পর্যন্ত বিশ্ব জনমত নিজেদের অনুকূলে ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে ইসরায়েল। গাজায় নারী ও শিশুদের ওপর চালানো নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞের ছবি ও ভিডিও স্বাধীনভাবে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক স্তরে দেশটির ভাবমূর্তি ইতিহাসের সবচেয়ে তলানিতে পৌঁছেছে। এমনকি ইসরায়েলের সবচেয়ে অন্ধ সমর্থক হিসেবে পরিচিত খোদ যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেও তাদের বিরুদ্ধে তীব্র জনমত তৈরি হয়েছে। পিউ রিসার্চের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৬০ শতাংশ আমেরিকান নাগরিক এখন ইসরায়েলের প্রতি সম্পূর্ণ নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। গ্যালপের ঐতিহাসিক এক জরিপেও দেখা গেছে, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অধিকাংশ সাধারণ আমেরিকান ইসরায়েলিদের তুলনায় মজলুম ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল অবস্থান প্রকাশ করেছেন।
ব্যর্থতার মুখে পড়ে ইসরায়েলি সরকার তাদের জনসংযোগ ও ‘হাজবারা’ বাজেট ১৫০ মিলিয়ন থেকে চার গুণেরও বেশি বাড়িয়ে রেকর্ড ৭৩০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছে। কিন্তু কাড়ি কাড়ি অর্থ ঢালার পরও বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক পরাজয় ঠেকাতে না পারায় খোদ ইসরায়েলি নীতি-নির্ধারক ও গোয়েন্দা মহলের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যেই তীব্র ক্ষোভের জন্ম নিয়েছে। কর্মকর্তাদের অনেকেই স্বীকার করেছেন যে, এআই ও ডিজিটাল প্রোপাগান্ডার পেছনে বিপুল অর্থ অপচয় হলেও বাস্তব পরিস্থিতির কোনো উন্নতি ঘটেনি, বরং এটি তাদের জন্য এক আত্মঘাতী প্রতারণায় পর্যবসিত হয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্লেষক সংস্থাগুলোর মতে, একটি চরম মানবিক অপরাধ ও রাজনৈতিক সংকটকে কেবল ‘যোগাযোগের ত্রুটি’ বা জনসংযোগ কৌশল দিয়ে ঢেকে রাখার মূর্খতাই এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। কোটি কোটি ডলার ঢেলে প্রযুক্তির অ্যালগরিদমকে সাময়িকভাবে হয়তো ধোঁকা দেওয়া সম্ভব, কিন্তু বিশ্ববাসীর জাগ্রত বিবেক এবং সত্যের নির্মম বাস্তবতাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়েও মুছে ফেলা যায় না।