তীব্র গ্যাস সংকট ও বিদ্যুৎ সরবরাহের চরম অনির্ভরযোগ্যতার কারণে দেশের সামগ্রিক শিল্পোৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নজিরবিহীন বিপর্যয় নেমে এসেছে। জ্বালানির এই দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি এখন আর কেবল ভারী ও বৃহৎ শিল্পের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং ওষুধ, টেক্সটাইল, ডাইং, সিরামিক, চিনি পরিশোধন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি কুটির শিল্পসহ প্রায় প্রতিটি উৎপাদনশীল ও সেবা খাতে এর বিধ্বংসী প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে। ফলস্বরূপ জাতীয় পর্যায়ে উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধির গতি আশঙ্কাজনকভাবে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৮৬ শতাংশে, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরে ছিল ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ। চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, হবিগঞ্জ ও ময়মনসিংহসহ দেশের প্রধান প্রধান শিল্পাঞ্চলে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র অভাবে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকার বিপুল উৎপাদন ক্ষতি হচ্ছে। এর বাইরে নতুন গ্যাস সংযোগ না পেয়ে অন্তত ১ হাজার ৮৫৭টি কারখানার আবেদন দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে, যার ফলে আটকে গেছে দেশের প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার নতুন শিল্প বিনিয়োগ।
রাজধানীর গুলশানে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চ্যালেঞ্জ: ব্যবসার পরিবেশের জন্য নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠকে দেশের জ্বালানি ও শিল্প খাতের এই ভয়াবহ চিত্র বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ এবং এমসিসিআই যৌথভাবে অস্ট্রেলিয়া সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেডের সহযোগিতায় এই নীতি-নির্ধারণী আলোচনার আয়োজন করে। এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমানের সভাপতিত্বে এবং পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতা, শিল্পোদ্যোক্তা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা অংশ নিয়ে শিল্প রক্ষায় অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, বিগত চার বছরে দেশে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। চার বছর আগে যেখানে জ্বালানি আমদানির হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ, তা বর্তমানে লাফিয়ে দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ৫ শতাংশে। ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে কোনো ধরনের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সরবরাহ বিঘ্ন তৈরি হলেই তার প্রত্যক্ষ ও মারাত্মক আঘাত এসে পড়ছে দেশীয় অর্থনীতি ও শিল্পাঞ্চলের ওপর। এই বৈদেশিক নির্ভরতার সবচেয়ে করুণ পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোকে, যেখানে গ্যাস না পেয়ে একের পর এক উৎপাদন ইউনিট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশের স্থানীয় কাপড়ের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ জোগান দেওয়া নরসিংদী অঞ্চলের ৩ হাজার টেক্সটাইল ও ডাইং মিলের মধ্যে তিন শতাধিক কারখানা গ্যাস সংকটে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি অনেক কারখানা চরম নিরুপায় হয়ে বয়লার চালু রাখতে কয়লা ও কাঠ পোড়ানোর মতো আদিম ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিচ্ছে। অন্যদিকে বৃহৎ শিল্প এলাকা গাজীপুরে গ্যাসের দৈনিক ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে অর্ধেকেরও কম, মাত্র ২৫০ থেকে ২৭০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর ফলে ওই অঞ্চলের প্রায় ২২ শতাংশ কারখানা স্থায়ী বা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। নারায়ণগঞ্জের ১ হাজার ৮৫০টি শিল্প ইউনিটের মধ্যে প্রায় ৯০০টি কারখানা অর্থাৎ মোট কারখানার অর্ধেকই এখন সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়। একইভাবে ময়মনসিংহে গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোতে উৎপাদন নেমে এসেছে অর্ধেকে এবং হবিগঞ্জে গ্যাস না থাকায় ১৭১টি কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রতিদিন ১ হাজার কোটি টাকারও বেশি ক্ষতি গুনছে। সার্বিকভাবে জাতীয় পর্যায়ে নিটওয়্যার ও ডাইং খাতের উৎপাদন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ না থাকা, ঘন ঘন লোডশেডিং এবং ডিজেল জেনারেটরের মতো বিকল্প জ্বালানির অতিরিক্ত খরচের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বিদেশি ক্রেতাদের কাছে নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় রপ্তানি আদেশ বাতিলের মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, বর্তমান এই অচলাবস্থা আসলে কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধানের চরম ব্যর্থতার ফসল। তিনি রপ্তানিমুখী খাতকে বাঁচাতে জরুরি ভিত্তিতে একটি পৃথক ‘শিল্প জ্বালানি নীতি’ প্রণয়নের জোর দাবি জানান।
লাফার্জহোলসিমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী শিল্প বিনিয়োগের সুরক্ষা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমানযোগ্য জ্বালানি নীতিমালার ওপর জোর দেন। তিনি আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা তৈরির আহ্বান জানান। অন্যদিকে বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মঈনুল ইসলাম সতর্ক করে বলেন যে, সিরামিক শিল্পে গ্যাস নিছক জ্বালানি নয়, এটি পণ্যের কাঁচামাল বা অন্যতম প্রধান উপাদান। দীর্ঘদিন গ্যাস না থাকলে কেবল কারখানাই বন্ধ হবে না, বরং লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান ও হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, বর্তমান সংকট কেবল গ্যাস বা কয়লা সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন জাতীয় অর্থনীতি ও নীতিগত ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি অভ্যন্তরীণ জ্বালানি অনুসন্ধান জোরদার করা, নবায়নযোগ্য সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের প্রসার ঘটানো, অপচয় রোধ এবং বাস্তবসম্মত মূল্য নির্ধারণের পরামর্শ দেন।
সামগ্রিক বিপর্যয় থেকে উত্তরণের জন্য গোলটেবিল বৈঠকে অংশগ্রহণকারী উদ্যোক্তারা রপ্তানিমুখী শিল্প ও প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ বরাদ্দে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান। একই সাথে কারখানাগুলোকে আগাম উৎপাদন পরিকল্পনা সাজানোর সুযোগ করে দিতে একটি সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য লোডশেডিং সূচি প্রকাশের সুপারিশ করা হয়। জ্বালানি নিরাপত্তা পুনরুদ্ধার ও দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ ছাড়া এই গভীর অর্থনৈতিক ক্ষতি সামাল দেওয়া অসম্ভব বলেই মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা।
তথ্যসূত্র:যুগান্তর