চলতি অর্থবছরের (অর্থবছর ২৭) বাজেটে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির ক্রমবর্ধমান চাপ কমানোর লক্ষ্যে প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর থেকে শুল্ক ও কর প্রত্যাহারের মতো বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। চাল, গম, পেঁয়াজ, চিনি, ভোজ্যতেল, মাছ থেকে শুরু করে শিশুখাদ্য, মসলা, খেজুর এমনকি চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহৃত ডায়ালিসিস ফিল্টারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের দাম কমানোর উদ্দেশ্যে এই শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছিল। সরকারের এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের পর ভোক্তারা আশা করেছিলেন যে, অন্তত এবার বাজারের আগুনে কিছুটা হলেও পানি পড়বে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাজেট ঘোষণার পর ইতোমধ্যে প্রায় তিন মাস পার হয়ে গেলেও সাধারণ ক্রেতারা এর কোনো সুফলই পাননি। শুল্ক কমানো সত্ত্বেও বাজারে এই পণ্যগুলো কিনতে গিয়ে ভোক্তাদের আগের মতোই চড়া দাম পরিশোধ করতে হচ্ছে, ক্ষেত্রবিশেষে কিছু পণ্যের দাম উল্টো আরও বেড়ে যাওয়ার মতো হতাশাজনক চিত্রও দেখা যাচ্ছে।
কর ছাড়ের সুফল কেন ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না, সে বিষয়ে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে নানা ধরনের যুক্তি ও গতানুগতিক অজুহাত তুলে ধরা হচ্ছে। বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন যে, বর্তমানে বাজারে যেসব পণ্য বিক্রি হচ্ছে, তার বড় একটি অংশই শুল্ক কমানোর নতুন আইন কার্যকর হওয়ার আগে আমদানি করা হয়েছিল। অর্থাৎ, আগের বেশি শুল্ক দিয়ে আনা পণ্যের মজুত এখনো শেষ হয়নি বলে তারা দাবি করছেন। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, দেশে জ্বালানি খরচের ঊর্ধ্বগতি এবং দুর্বল মুদ্রার কারণে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় শুল্ক ছাড়ের যে সুবিধাটুকু পাওয়ার কথা ছিল, তা অন্যান্য খরচের সঙ্গে কাটাকাটি হয়ে যাচ্ছে বলে দাবি তাদের।
চিকিৎসা খাতের একটি উদাহরণ দিলে এই শুল্ক ছাড়ের সুবিধা থেকে ভোক্তাদের বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। বাজেটে সরকার আমদানি করা ডায়ালিসিস ফিল্টারের ওপর থেকে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং ৫ শতাংশ আগাম আয়কর (এআইটি) সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, এই কর প্রত্যাহারের ফলে কিডনি রোগীদের প্রতি সেশনের ডায়ালিসিস খরচ অন্তত ৮০০ টাকা কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে রোগীরা এই সুবিধা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছেন। মো. আলামিন হোসেন নামের এক ভুক্তভোগী জানান, তিনি গত ছয় মাস ধরে তার মাকে আল বারাকা কিডনি হাসপাতালে ডায়ালিসিসের জন্য নিয়ে যাচ্ছেন, কারণ অন্যান্য জায়গার তুলনায় এটি কিছুটা সাশ্রয়ী। তিনি জানান, ওই হাসপাতালের সর্বনিম্ন প্যাকেজটি ৩ হাজার ৪০০ টাকার হলেও আনুষঙ্গিক অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম মিলিয়ে প্রতি সেশনে প্রায় ৪ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। এ বিষয়ে আল বারাকা কিডনি হাসপাতালের সহকারী ব্যবস্থাপক মো. আজহার গাজীর সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, তারা এখনো নতুন শুল্ক কাঠামোর আওতায় কোনো ফিল্টার কেনেননি। নতুন ও কম দামের ফিল্টার হাতে পাওয়ার পর তারা ডায়ালিসিসের খরচ কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করবেন। স্কয়ার হাসপাতাল, কন্টিনেন্টাল হাসপাতাল এবং ল্যাবএইড হাসপাতালের মতো দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি হাসপাতালগুলোও আমদানি করা ফিল্টারের ওপর থেকে ভ্যাট ও এআইটি প্রত্যাহারের পরও তাদের ডায়ালিসিস ফি এক টাকাও কমায়নি। স্কয়ার হসপিটালস লিমিটেডের চিফ অপারেটিং অফিসার ইউসুফ সিদ্দিক এ বিষয়ে বিস্ময়কর এক তথ্য দিয়ে বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না এবং এ সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক নোটিশও তাদের কাছে পৌঁছায়নি। ল্যাবএইড হাসপাতালের হেড অব অপারেশনস ইফতেখার আহমেদও ঠিক একই ধরনের কথা বলে বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন।
একই ধরনের হতাশাজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে শিশুখাদ্যের বাজারেও। শিশুদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় এসব খাদ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে সরকার এর কাঁচামাল আমদানির ওপর শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বাস্তবে বাজারে শিশুখাদ্যের দাম কমার কোনো লক্ষণই নেই। দেশের শিশুখাদ্যের বাজারের অন্যতম শীর্ষ দুই প্রতিষ্ঠান নেসলে বাংলাদেশ এবং আবুল খায়ের গ্রুপের কাছে শুল্ক কমার পরও কেন দাম কমানো হয়নি, তা জানতে চাওয়া হয়েছিল। নেসলে বাংলাদেশ শুল্ক কমানোর এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, এটি ব্যয় সংকোচন ও ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে। তবে দাম না কমানোর পক্ষে যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, উৎপাদন খাতে জ্বালানি খরচের ঊর্ধ্বগতি, টাকার অবমূল্যায়ন এবং বিশ্ববাজারে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে তারা বহুমুখী চাপের মুখে রয়েছে। অন্যদিকে, শুল্ক ছাড়ের পরও দাম না কমানোর বিষয়ে আবুল খায়ের গ্রুপের কাছে বারবার জানতে চাওয়া হলেও তারা এ বিষয়ে কোনো ধরনের মন্তব্য বা সদুত্তর দিতে রাজি হয়নি।
রান্নার অন্যতম অনুষঙ্গ মসলার বাজারে শুল্ক ছাড়ের প্রভাব একেবারেই শূন্য। সরকার সব ধরনের মসলার ওপর থেকে ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করলেও দাম তো কমেইনি, বরং ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, বেশ কিছু মসলার দাম উল্টো অনেকটা বেড়ে গেছে। টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, বাজারে আমদানি করা রসুন ও আদার দাম নিম্নমুখী হওয়ার বদলে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখাচ্ছে। এছাড়া তেজপাতার দাম কেজিতে ২০ টাকা এবং এলাচের দাম কেজিতে ১০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির বিষয়ে বাংলাদেশ পাইকারি গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজি মো. এনায়েত উল্লাহ জানান, বর্তমানে দেশের মসলার বাজার মূলত চোরাই পথে আসা অবৈধ পণ্যের দখলে চলে গেছে। বৈধভাবে আমদানি করা মসলার পরিমাণ বাজারে একেবারেই সীমিত। চোরাই পণ্যের কারণে দাম কমা উচিত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারে এর দাম কমানো সম্ভব হচ্ছে না।
খেজুরের বাজারেও কর ছাড়ের কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়েনি। সরকার খেজুরের ওপর থেকে ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক তুলে নিলেও এর দাম কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। একজন খুচরা বিক্রেতা জানিয়েছেন, বাজারে সুক্কারি খেজুরের দাম কমার বদলে উল্টো কেজিতে ৩০০ টাকা থেকে এক লাফে বেড়ে ৫০০ টাকা হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সিরাজুল ইসলাম এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে বাজারে পণ্যটির ঘাটতিকে দায়ী করেছেন। তবে তিনি বলেন, আগস্ট মাস থেকে খেজুরের নতুন মৌসুম শুরু হয়। সেপ্টেম্বরে নতুন সরবরাহ বাজারে এলে দাম কিছুটা কমে আসতে পারে। শুল্ক সুবিধার আওতায় আমদানিকারকরা নতুন চালান পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিছু চালান আসা শুরু হলেও তা বাজারের বিপুল চাহিদার তুলনায় একেবারেই অপর্যাপ্ত।
অন্যদিকে, ওয়াশিং মেশিন, ইলেকট্রিক ওভেন এবং মাইক্রোওয়েভ ওভেন তৈরির অন্যতম প্রধান কাঁচামাল ফ্লোট গ্লাসের ওপর থেকে সরকার ৪৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এত বড় অঙ্কের শুল্ক ছাড়ের পরও এসব ইলেকট্রনিক পণ্যের দাম আগের মতোই রয়ে গেছে। এ বিষয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড ওয়ালটনের ডেপুটি চিফ বিজনেস অফিসার মো. খায়রুল বাশারের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তবে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (মার্কেটিং) কামরুজ্জামান কামাল জানিয়েছেন, কর সুবিধার আওতায় তারা এখনো নতুন কোনো কাঁচামালের চালান হাতে পাননি।
বাজারের এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি নিয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম শফিকুজ্জামান গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, ভোক্তাদের স্বস্তি দেওয়ার জন্যই সরকার শুল্ক ও কর কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু বাজার তদারকিতে চরম ঘাটতি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয়ের অভাবে সাধারণ মানুষ এই সুবিধার ছিটেফোঁটাও পাচ্ছে না। মাঝখান থেকে শুল্ক ছাড় দিয়ে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শুল্ক ছাড়ের এই সুবিধা যাতে প্রকৃত অর্থে দাম কমার মাধ্যমে ভোক্তার দোরগোড়ায় পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে সরকারকে কঠোরভাবে বাজার তদারকি করতে হবে। নিয়মিত অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করা এবং মূল্য পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোকে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. জহিরুল ইসলাম এ বিষয়ে কঠোর বার্তা দিয়ে জানিয়েছেন, ব্যবসায়ীরা যদি শুল্ক ছাড়ের আইন কার্যকর হওয়ার পর পণ্য কিনে থাকেন বা আমদানি করে থাকেন, তবে সেই কমানো শুল্কের সুবিধা অবশ্যই যৌক্তিক মূল্যহ্রাসের মাধ্যমে ভোক্তাদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, সরকারি শুল্ক সুবিধার প্রতিফলন পণ্যের দামে ঠিকমতো পড়ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে তারা বাজার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন এবং প্রয়োজনে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। ব্যবসায়ীরা সরকারের এই নির্দেশনা যথাযথভাবে মেনে চলছেন কি না, তা যাচাই করতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট ভ্যাট ও ট্যাক্স চালানগুলো পরীক্ষা করে দেখবে এবং কোনো অনিয়ম পেলে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।